নিশ্চয়ই হযরত নবী আকরাম ﷺ ছিলেন এক অপরিসীম আকর্ষণ ও হৃদয়গ্রাহী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এই মোহনীয়তা ও ব্যক্তিত্বের দীপ্তি তাঁর জন্মলগ্ন থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত সর্বদা তাঁর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল। এই রহস্যের মূল চাবিকাঠি একটাই—তিনি ছিলেন রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে প্রেরিত পবিত্র রাসূল; পাপ ও ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, আর শয়তানের তো নিকট থেকেও কিংবা দূর থেকেও তাঁর ওপর কোনো প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা ছিল না।
হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর জীবন একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—তিনি কেবল একজন নবীই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক, প্রজ্ঞাবান পথপ্রদর্শক এবং অবিচল নেতৃত্বের প্রতীক। এত উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর সঙ্গে ঠিক তাঁদেরই মতো জীবনযাপন করতেন। তাঁদের তুলনায় তাঁর খাবার ছিল না উন্নততর, পানীয় ছিল না বিলাসী, বাসস্থান ছিল না আলাদা কোনো রাজপ্রাসাদ, আর সম্পদেও তিনি কোনো বৈষম্য করতেন না।
তিনি সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর সঙ্গে সর্বত্র কষ্ট ও কঠিন সময় ভাগ করে নিয়েছেন। বরং বহু ক্ষেত্রে ক্ষুধা, ক্লান্তি ও বঞ্চনার সবচেয়ে তীব্র সময়গুলো তিনি তাঁদের চেয়েও বেশি সহ্য করেছেন। তাঁদের সঙ্গে একত্রে অবরোধ সহ্য করেছেন, তাঁদের সঙ্গে হিজরত করেছেন, আর যুদ্ধে তাঁদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন—এমনকি শত্রুর সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থানেও তিনিই থাকতেন।
কোনো যুদ্ধক্ষেত্রেই তাঁকে পশ্চাদপসরণ করতে দেখা যায়নি—না উহুদের ময়দানে, না হুনাইনের প্রান্তরে, না অন্য কোনো কঠিন পরীক্ষার মুহূর্তে। অথচ এর পাশাপাশি শত্রুর মুখোমুখি হয়েও তিনি কখনো প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও ধৈর্যের পথ পরিত্যাগ করেননি। তিনি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে কখনো ক্রোধ প্রকাশ করেননি, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জন্য কখনো যুদ্ধেও অবতীর্ণ হননি। তবে যখন আল্লাহ তাআলার বিধান লঙ্ঘিত হতো, তখন তিনি আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর জন্যই ক্রুদ্ধ হতেন এবং সেই অন্যায়ের যথোচিত প্রতিকার করতেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে অপার দানশীলতায় ভূষিত করেছিলেন। তিনি কখনো কোনো প্রার্থীকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। অগণিত গনিমতের সম্পদ তাঁর হাতে আসত, কিন্তু সেগুলো তিনি নিঃসংকোচে আল্লাহর পথে ব্যয় করে দিতেন। অহংকার ও আত্মগর্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে তিনি অধিকাংশ সময় উম্মতের সাধারণ মানুষের সঙ্গেই কাটাতেন। ধনী-দরিদ্রের মাঝে কোনো ভেদাভেদ করতেন না; বরং দরিদ্রদের সঙ্গেই উঠতেন-বসতেন।
হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন দুর্বল, ইয়াতিম ও মিসকিনদের প্রতি সীমাহীন দয়ালু। তিনি রোগীদের সেবা করতেন, জানাজায় শরিক হতেন, জুমার খুতবা প্রদান করতেন, সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-কে শিক্ষা দিতেন। তিনি নিজে সাহাবাদের ঘরে গিয়ে সাক্ষাৎ করতেন, আবার তাঁরাও এসে তাঁর ঘরে সাক্ষাৎ করতেন। এসব সব অবস্থাতেই তাঁর ঠোঁটে লেগে থাকত মৃদু হাসি, চেহারায় ফুটে উঠত নূরের দীপ্তি, আর মুখমণ্ডল থেকে ঝরে পড়ত প্রশান্ত আনন্দ।
তিনি ছিলেন তাঁর উম্মতের প্রতি পূর্ণ অর্থে করুণাময়। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে যতক্ষণ তা গুনাহের পর্যায়ে না পৌঁছাত, ততক্ষণ তিনি সহজতাকেই অগ্রাধিকার দিতেন। আর যেখানে গুনাহের আশঙ্কা থাকত, সেখান থেকে তিনি সর্বাধিক দূরে থাকতেন। যাঁরা তাঁর ওপর নির্যাতন ও জুলুমের পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছিল, তাঁদেরও তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। আত্মীয়তার বন্ধন তিনি দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতেন—এমনকি যাঁরা সেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, তাঁদের সঙ্গেও তিনি সিলায়ে রাহম বজায় রাখতেন।
তিনি কেবল লেনদেন ও সামাজিক আচরণেই অতুলনীয় ছিলেন না, কেবল চরিত্র ও নৈতিকতায়ই অনন্য ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ রাজনীতিবিদ, প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক এবং মধুরভাষী খতিব। কোনো ছোট বিষয়ই তাঁর দৃষ্টি এড়াত না, আবার কোনো বড় বিষয়ও তাঁর অবহেলার শিকার হতো না। তিনি যখন মজলিসে কথা বলতেন, তখন হতেন জাওয়ামিউল কালিম—অল্প কথায় এমন গভীর ও বিস্তৃত অর্থ প্রকাশ করতেন যে, আলেম ও দার্শনিকরা যুগের পর যুগ ধরে সেগুলোর ব্যাখ্যায় মগ্ন থাকতেন। সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বাধিক হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য কেবল তাঁরই ছিল ﷺ।




















