রাসূলুল্লাহ ﷺ আলোচনার ক্ষেত্রে সত্যের পথ থেকে সামান্যতমও বিচ্যুত হতেন না; তাঁর কথাবার্তায় কখনো শৈথিল্য দেখা যেত না, আর তিনি কারও প্রতি রুষ্টও হতেন না। তিনি ﷺ সাহাবাদের নিকট সাহায্য চাইতেন এবং তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন, যদিও জ্ঞান-বুদ্ধিতে তিনি ﷺ তাঁদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং মর্যাদায় সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন; তবু তিনি তাঁদের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
কারও মতামত বা প্রস্তাবকে তিনি ﷺ কখনোই নির্বুদ্ধিতা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য করেননি। যে কথাটি উত্তম মনে হতো, তিনি তা হৃদয়ে সংরক্ষণ করতেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর ﷺ সত্য ও মৌলিক মহত্ত্ব এখানেই নিহিত ছিল; জীবনের প্রতিটি অবস্থা ও প্রতিটি মুহূর্তে তিনি সকল প্রশংসনীয় গুণাবলি ও যাবতীয় উৎকর্ষে অলংকৃত ছিলেন। এই গুণাবলি মক্কাতেও তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে, আবার মদীনাতেও।
শান্তির সময়েও এই গুণাবলি দীপ্ত ছিল, যুদ্ধের ময়দানেও ছিল সমানভাবে উজ্জ্বল। এমনকি যখন তিনি ﷺ দেশান্তরিত হয়েছিলেন এবং তাঁর পিছু ধাওয়া চলছিল, কিংবা যখন বিজয় ও কর্তৃত্ব তাঁর হাতে ন্যস্ত ছিল; সব অবস্থাতেই। নিকটতম ও প্রিয় সাহাবাদের সঙ্গে সম্পর্কেও যেমন, তেমনি কঠোরতম শত্রুদের প্রতিও তাঁর আচরণে এই গুণাবলিরই প্রকাশ ঘটেছে।
তাঁর সমগ্র জীবনই এই পবিত্র ও মনোহর শৈলীতে অতিবাহিত হয়েছে। এমনকি শত্রুদের হৃদয়েও তিনি ﷺ তাঁর সাহাবাদের তুলনায় অধিক মর্যাদাবান ছিলেন; তাঁর সম্মুখে তারা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেত। যারা কেবল তাঁর কথা শুনেছিল কিন্তুদেখেনি, তারাও তাঁর ﷺ প্রতি সম্মান, ভক্তি ও মূল্যবোধ পোষণ করত। এমনকি যারা তাঁর যুগে উপস্থিতই ছিল না, এমন বহু কাফিরও তাঁর মর্যাদা ও কদর স্বীকার করেছে।
একজন কবি বলেন,
“মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সঙ্গে তুলনা করার সাহস কার আছে?! মানব-মহত্ত্বের সব মানদণ্ড সামনে রেখে দেখলে এমন কেউ কি পাওয়া যাবে, যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর চেয়ে অধিক মহান প্রতীয়মান হন? আমার জীবনের সর্বোচ্চ সৌভাগ্য এই যে, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সীরাত পূর্ণাঙ্গভাবে অধ্যয়ন করেছি এবং তাতে নিহিত মহত্ত্ব ও চিরন্তনতাকে আবিষ্কার করেছি।”
এই ধারাবাহিক গবেষণায় আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর মহত্ত্বের একটি সীমিত ও সহজ দিক উপস্থাপন করব; আর তা হলো, রহমত ও মেহেরবানির নৈতিকতা। এই রহমত তাঁর প্রতিটি কথা ও প্রতিটি কর্মে এমনভাবে প্রতিফলিত ছিল যে, তাঁর সীরাতের কোনো একটি মুহূর্তও এমন পাওয়া যায় না, যা রহমতশূন্য।
তিনি ﷺ সর্বদিক থেকেই রহমত ও দয়ার আবরণে আবৃত ছিলেন। যুদ্ধ ও সংঘর্ষের পরিস্থিতিতেও, সীমা ও শাস্তি কার্যকরের সময়েও, তিরস্কার ও ভর্ৎসনার মুহূর্তেও; এমনকি এসব সকল অবস্থায়ও কথা ও কাজে রহমতের অনুপস্থিতি ঘটেনি। এই নীতির কোনো ব্যতিক্রম পাওয়া যায় না; কারণ এগুলো এমন সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য, যেখানে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই।



















