কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর রহমত
শরিয়াতে মুহাম্মাদী ﷺ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শরিয়ত। এটি এমন এক বিধান, যার মতো বিধান এর আগে পৃথিবীতে কখনো আসেনি, আর এর ভবিষ্যতেও কখনো আসবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রহমত ও করুণার ধারণাকে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা ও গভীরতার সঙ্গে অনুধাবন করতে পারি না, যতক্ষণ না প্রথমে তার মৌলিক উৎসের দিকে প্রত্যাবর্তন করি। আর সেই উৎস হলো—রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর ওপর অবতীর্ণ পবিত্র ও পূতপবিত্র কিতাব, আল-কুরআন।
রব্বুল আলামিনের এই কিতাব—যা মুসলিমদের জীবনবিধান এবং শরিয়তের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উৎস; এর দিকে দৃষ্টিপাত করলে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো, সূরা তাওবা ব্যতীত কুরআন কারীমের প্রতিটি সূরার সূচনা হয়েছে
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” দিয়ে।
‘বিসমিল্লাহ’-এর সঙ্গে একত্রে এসেছে ‘আর-রাহমান’ ও ‘আর-রাহীম’—এই দুটি গুণবাচক নাম। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই দুই গুণের মাধ্যমেই সূচনা করা ইসলামী শরিয়তে দয়া ও রহমতের মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতি এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
এ কথাও কারো অজানা নয় যে, ‘আর-রাহমান’ ও ‘আর-রাহীম’—এই দুটি নাম অর্থের দিক থেকে পরস্পরের অত্যন্ত নিকটবর্তী। উলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং এই দুই শব্দের পার্থক্য নিয়ে বিভিন্ন মতামত পেশ করেছেন।
চাইলে মহান রব রহমতের গুণের সঙ্গে তাঁর অন্য কোনো গুণও সংযুক্ত করতে পারতেন, যেমন: আল-আযীম, আল-হাকীম, আস্-সামী‘ বা আল-বাসীর।
এমনটাও সম্ভব ছিল যে, রহমতের সঙ্গে এমন কোনো ভিন্নার্থক গুণ যুক্ত করা হতো, যা পাঠকের মনে একধরনের ভারসাম্য সৃষ্টি করত; যাতে দয়া বা রহমতের গুণ অন্যান্য গুণের তুলনায় অতিমাত্রায় প্রাধান্যশীল বলে প্রতিভাত না হতো, যেমন: আল-জাব্বার, আল-মুনতাকিম কিংবা আল-কাহ্হার। কিন্তু কুরআন কারীমের প্রতিটি সূরার সূচনায় এই পরস্পর-সন্নিহিত দুটি গুণকে একসঙ্গে উপস্থিত করা এক গভীর উপলব্ধি ও সুদূরপ্রসারী অনুভূতির জন্ম দেয়।
সে অনুভূতিটি হলো—সব ধরনের মতভেদ ও বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে রহমত অন্যান্য সকল গুণের ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও শ্রেষ্ঠ। দয়া ও করুণার সঙ্গে আচরণ করা এমন এক মৌলিক নীতি, যা কখনো ভঙ্গ হয় না এবং অন্য কোনো নীতির কাছে নতও হয় না। এই অর্থ আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে এ দিক থেকেও যে, কুরআন কারীমের বিন্যাস তাওকীফি—অর্থাৎ মহান রব নিজেই তাঁর নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে নির্দেশ দিয়েছেন কুরআনকে ঠিক সেই বিন্যাসেই সংকলন করতে, যেভাবে আজ তা আমাদের হাতে রয়েছে; যদিও আয়াত ও সূরাগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছিল।
যখন আমরা সূরাগুলোর সূচনার দিকে লক্ষ্য করি, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এই বিন্যাস অনুযায়ী প্রথম সূরা হলো সূরা আল-ফাতিহা, এবং অন্যান্য সূরার মতো এটিও শুরু হয়েছে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” দিয়ে। শুধু তাই নয়, এই সূরার ভেতরেও বারবার ‘আর-রাহমান’ ও ‘আর-রাহীম’—এই দুই গুণের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সুতরাং কুরআন কারীমের সূচনা এই সূরার মাধ্যমে হওয়াটাও এ বিষয়ের ওপর এক সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। এ কথাও সুস্পষ্ট যে, সূরা আল-ফাতিহা এমন এক সূরা, যার তিলাওয়াত প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরয, এবং সে প্রতিদিন তার সালাতের প্রতিটি রাকাআতে এটি পাঠ করে। এর অর্থ হলো—একজন মুসলিম অন্তত প্রতিটি রাকাআতে দুইবার ‘আর-রাহমান’ এবং দুইবার ‘আর-রাহীম’ উচ্চারণ করে; অর্থাৎ মোট চারবার। এভাবে প্রতিটি রাকাআতেই বান্দা চারবার আল্লাহ তাআলার রহমতের উল্লেখ করে।
একজন মুসলিম কেবল তার দৈনিক ১৭ ফরয রাকাআতেই রহমতের গুণের উল্লেখ করে ৬৮ বার। এটি এই মহান গুণ, অর্থাৎ দয়া ও করুণার—মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের এক অত্যন্ত সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। এই গুণের এমন মহিমান্বিত সম্মাননা কেবল কুরআনের সূচনাতেই সীমাবদ্ধ নয়, কেবল সূরাগুলোর শুরুতেই নয়; বরং সমগ্র কুরআনজুড়ে এমন ঘন ঘন ও গভীর পুনরুক্তির মাধ্যমে এসেছে যে, তা প্রতিটি পাঠকের দৃষ্টি অবধারিতভাবে নিজের দিকে আকর্ষণ করে।




















