পাকিস্তানের সামরিক শাসনব্যবস্থা: নিজের প্রতি অন্ধ, অন্যের ব্যাপারে তীক্ষ্ণদৃষ্টি!

✍🏻 আজমল

যুক্তি ও রাষ্ট্রীয় নীতির বিচারে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য যে, প্রত্যেক রাষ্ট্রের উচিত প্রথমে নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানে মনোনিবেশ করা, এরপর অন্যদের সমস্যার দিকে দৃষ্টি দেওয়া। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিরোধে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী, পরামর্শদাতা কিংবা সমাধান-সহায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। তা হোক যুক্তরাষ্ট্র ও অঞ্চলের কিছু দেশের মধ্যকার উত্তেজনা, কিংবা ইসলামী দেশসমূহের পারস্পরিক মতপার্থক্য প্রশমনের উদ্যোগ—সবখানেই তারা সক্রিয় ভূমিকা পালনের প্রয়াস দেখিয়েছে।

কিন্তু একই সময়ে পাকিস্তানের নিজস্ব বহু অভ্যন্তরীণ সংকট এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তার দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। পাকিস্তান বারবার দাবি করেছে যে, তারা অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা সুদৃঢ় করতে কাজ করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনাতেও অংশগ্রহণ করেছে। নিঃসন্দেহে আঞ্চলিক শান্তির জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। তবে প্রকৃত প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্র নিজেই গুরুতর নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত, তার কি সর্বাগ্রে নিজের গৃহকে সুশৃঙ্খল করার প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত নয়?

পাকিস্তানে নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও জাতিগত অসন্তোষ এখনো জনগণের প্রধান উদ্বেগগুলোর অন্যতম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের পুনঃপুন উত্তেজনা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ। এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করে বহির্মুখী ইস্যুগুলোর প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ কোনো স্থায়ী ও ফলপ্রসূ পরিণতি বয়ে আনতে পারে না।

পাকিস্তানের নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে আফগানিস্তান ইসলামাবাদের নীতির প্রভাব অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অধিকমাত্রায় অনুভব করেছে। উভয় দেশের জনগণ শুধু একই ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ দুটি মুসলিম ও ভ্রাতৃপ্রতিম জাতিই নয়, বরং তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ এই শাসনব্যবস্থাই দুই জাতির মাঝে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব, অবিশ্বাস ও বিভক্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

বহু গবেষক, পাকিস্তানি ধর্মীয় নেতা এবং সম্মানিত জননেতার অভিমত হলো, যদি পাকিস্তান দূরবর্তী সংঘাতগুলোতে ভূমিকা রাখার জন্য যে পরিমাণ প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে, তার সমপরিমাণ প্রয়াস আফগানিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, অনধিকার হস্তক্ষেপ পরিহার এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ নীতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যয় করত, তাহলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার জন্য অনেক বৃহত্তর সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতো।

প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা একই সত্যের দিকে নির্দেশ করে—শান্তির সূচনা নিজ গৃহ থেকেই হয়। যে রাষ্ট্র আঞ্চলিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে চায়, তাকে প্রথমে নিজের সীমানার ভেতরে স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের একটি সফল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে হবে। অন্যথায়, নিজের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রেখে অন্যের সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হওয়া সেই ব্যক্তির ন্যায়, যে সবার ত্রুটি দেখতে পায়, অথচ নিজের ত্রুটির ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধ।

পরিশেষে বলা যায়, অঞ্চলের ভবিষ্যৎ তখনই অধিকতর উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, যখন প্রত্যেক রাষ্ট্র, বিশেষত পাকিস্তান নিজ গৃহের দায়িত্বশীলতা থেকেই যাত্রা শুরু করবে। স্থায়ী শান্তি কেবল স্লোগানের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং তা অর্জিত হয় নীতির আন্তরিক সংস্কার, জনগণের সমস্যার প্রতি দায়িত্বশীল মনোযোগ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে।

Exit mobile version