যেকোনো গম্ভীর এবং আইনের শাসন চালিত সমাজে রাষ্ট্র ও একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট থাকে। রাষ্ট্র একটি স্থায়ী ও সর্বব্যাপী সত্তা। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, চূড়ান্ত মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব মহান আল্লাহর, আর জনকল্যাণমূলক কাজকর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে শাসক, বিচারবিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—সবাই রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও শাসনের সেবক মাত্র।
কিন্তু পাকিস্তানের পঁচাত্তর বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, রাষ্ট্র এবং একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার সীমারেখাটি ধীরে ধীরে মুছে ফেলা হয়েছে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তৈরি করা একটি ন্যারেটিভ বা প্রচারণার মাধ্যমে সামরিক বাহিনী নিজেকে রাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আর সেই প্রতারণা টিকিয়ে রাখতে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের এমন এক মিশ্রণ তৈরি করা হয়েছিল, যা পাকিস্তানকে বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক গভীর গর্তে ঠেলে দিয়েছে।
এই সমস্যার ভিত্তিপ্রস্তর তখনই স্থাপিত হয়েছিল, যখন সামরিক শাসক গোষ্ঠী ইসলাম ও দেশপ্রেমের ধারণাকে নিজেদের গায়ে জড়িয়ে একটি সুরক্ষিত দুর্গ গড়ে তুলেছিল। এই নিরাপত্তা মডেলের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো সামরিক বাহিনীর নীতি, বাজেট বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে যেকোনো বৈধ ও সাংবিধানিক সমালোচনাকে একটি প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা হিসেবে দেখা হয় না। এটিকে সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, পাকিস্তানের আদর্শকে অস্বীকার বা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
ফাতিমা জিন্নাহ থেকে শুরু করে আজকের নামী রাজনৈতিক নেতা, সাহসী সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের ক্ষেত্রেও এই চিত্রটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যখনই কোনো স্বাধীন কণ্ঠ রাওয়ালপিন্ডির (সেনা সদরদপ্তর) অগ্রাধিকার কিংবা রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তাদের অবৈধ হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তখনই সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র সেই কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে মাঠে নেমেছে।
এর ফলে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার পথ সচেতনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটিই সেই বিপজ্জনক দুর্বলতা, যা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে বাধ্য করে এবং একের পর এক গুরুতর ভুল করতে উৎসাহ দেয়; কারণ তারা জানে কেউ তাদের প্রশ্ন করতে পারবে না। আর কেউ যদি সাহস করে প্রশ্ন তুলতেও যায়, তবে তাকে চুপ করানোর জন্য বন্দুক আর কামানকেই যথেষ্ট হাতিয়ার মনে করা হয়।
পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর তৈরি করা এই ‘নিরাপত্তা রাষ্ট্র’ (Security State) দেশপ্রেমের সর্বজনীন অর্থকে সংকুচিত ও বিকৃত করে ফেলেছে। এই প্রচারণার অধীনে দেশপ্রেমকে কেবল অস্ত্র, ইউনিফর্ম এবং সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এই মানসিকতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, প্রচণ্ড গরমে ঘাম ঝরিয়ে কর দেওয়া সাধারণ নাগরিক, ক্লাসরুমে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গড়ে তোলা শিক্ষক, কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন বাঁচানো চিকিৎসক কিংবা জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই করা রাজনীতিবিদ—সবার দেশপ্রেমকেই সামরিক এলিটদের তুলনায় সবসময় দ্বিতীয় শ্রেণীর এবং সন্দেহজনক হিসেবে দেখা হয়েছে।
জনগণকে সবসময় চাপের মধ্যে রাখতে পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে একটি স্থায়ী ও কৃত্রিম শত্রুর ভয়কে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য ছিল এটা নিশ্চিত করা, যাতে জনগণ যেন কখনো সস্তা বিদ্যুৎ, মানসম্মত শিক্ষা, সঠিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার দাবি করার সাহস না পায়। এর বদলে তারা যেন সবসময় একটি অবরুদ্ধ মানসিকতার মধ্যে বাঁচে এবং বিশ্বাস করে যে, সামরিক বাহিনী দুর্বল হলে দেশ ভেঙে যাবে।
সেই ভয় মানুষকে কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে এবং শান্তি ও শৃঙ্খলার ব্যানারে তাদের জীবনকে বন্দি করে রেখেছে; অথচ সেই শান্তি ও শৃঙ্খলা কখনই তাদের পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল ছিল দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা, আর দেশের ২৪ কোটি মানুষকে বোঝা এবং সমস্যা মনে করা।
ইতিহাস দেখায় যে, যেসব দেশ ‘নিরাপত্তা রাষ্ট্র’ গড়ে তোলার পরিবর্তে জনকল্যাণ ও মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে, তারা আজ বিশ্বের প্রথম সারিতে রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এবং খোদ চীন এর স্পষ্ট উদাহরণ। তারা প্রথমে তাদের অর্থনীতি গড়ে তুলেছে এবং তারপর প্রতিরক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। এর বিপরীতে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে প্রতিরক্ষা ব্যয়, সামরিক এলিটদের হাউজিং স্কিম এবং বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আজ পাকিস্তান যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি এবং আইএমএফের ঋণের জালে আটকা পড়েছে, তা এই পুরোনো ও ব্যর্থ সামরিক দর্শনেরই সরাসরি ফল।
যতদিন বন্দুকের অগ্রাধিকার থাকবে, ততদিন কলম এবং কারখানা পিছিয়েই থাকবে। আর যতদিন এটি চলবে, ততদিন এই শোচনীয় পরিস্থিতি সামরিক মডেলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবেই থেকে যাবে। ইতিহাসের চাকা এক জায়গায় থেমে থাকে না। রাওয়ালপিন্ডির জন্য দেশপ্রেম ও বিশ্বাসঘাতকতার পুরোনো সার্টিফিকেট বিক্রি করা এবং সেই প্রতারণা টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে! প্রথমটি হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতি যখন মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন সীমান্তের ওপারে থাকা কোনো কাল্পনিক শত্রুর ভয় আর কাজ করে না। আজকের একজন সাধারণ পাকিস্তানি বোঝে যে, তার জীবনের জন্য বড় হুমকি বিদেশি আক্রমণ নয়, বরং দেশের ভেতরের আইন অমান্য, সংবিধান লঙ্ঘন এবং অর্থনৈতিক অযোগ্যতা।
দ্বিতীয়টি হলো প্রযুক্তি ও তথ্যের বিস্তার। সেই সময় আর নেই যখন তথ্য ও প্রচারণার ওপর রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং একটিমাত্র রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বা কয়েকটি বাছাই করা সংবাদপত্রের মাধ্যমে ন্যারেটিভ তৈরি করা হতো। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল যুগ তথ্যের সেই একচেটিয়া অধিকার ভেঙে দিয়েছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম রাওয়ালপিন্ডির নীতি নিয়ে এমন সব গুরুতর ও যৌক্তিক প্রশ্ন তুলছে, যা একসময় রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য হতো।
এখন তারা জানে বাজেট কোথায় যায় এবং বেসামরিক সার্বভৌমত্ব কেন জরুরি। পাকিস্তান আজ তার ইতিহাসের অন্যতম সংবেদনশীল এবং বিপজ্জনক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। জিএইচকিউ-কেই (সামরিক সদরদপ্তর) ক্ষমতার একমাত্র উৎস হতে হবে—সামরিক বাহিনী ও এস্টাবলিশমেন্টের এই জেদ দেশকে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ উপায় হলো এই পুরোনো ও জরাজীর্ণ নিরাপত্তা রাষ্ট্রের কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা এবং একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা।
এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে সামরিক বাহিনী তার আইনি ম্যান্ডেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, বিচারবিভাগ স্বাধীন হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতার চূড়ান্ত ও প্রকৃত উৎস হবে কুরআন ও সুন্নাহ। পাকিস্তানের টিকে থাকা আর বন্দুকের ছায়ায় সম্ভব নয়; এটি নিহিত রয়েছে আইনের শাসন এবং জনগণের অর্থনৈতিক কল্যাণের মধ্যে।





















