এটি কখনোই নিছক কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না; আর আল্লাহ তাআলার কিতাবে শৃঙ্খলাহীনতা বা বিশৃঙ্খলার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কেননা আল্লাহ তাআলার কিতাব এমন এক মহাগ্রন্থ, যার একটি অক্ষরও বাতিল নয়; বরং প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি হরফ নির্দিষ্ট পরিমাপ ও সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের অধীনেই নাযিল হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা সূরা আন‘আমের এক আয়াতে বলেন,
“তোমাদের প্রতিপালক নিজ সত্তার ওপর রহমত অবধারিত করে নিয়েছেন।”
এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম তাবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন,
“আল্লাহ তাআলা এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন, শাস্তি দিতে তাড়াহুড়া করবেন না এবং তাদের তওবা কবুল করবেন।”
যখন আমরা এ কথার সঙ্গে এ বাস্তবতাও যুক্ত করি যে, আল্লাহ তাআলা রিসালাত ও নবুয়তের উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন—তখন আমরা খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর প্রতিটি কথা ও প্রতিটি কর্মই নিখাদ রহমতেরই প্রকাশ। তিনি ﷺ–এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি এবং প্রতিটি আমল উচ্চতর নৈতিকতার এক জীবন্ত ও বাস্তব দৃষ্টান্ত।
যেমনটি আয়াত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে—রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে, এই রহমত কেবল মুমিনদের জন্য সীমাবদ্ধ নাকি মুমিন ও কাফির উভয়ের জন্য, এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদের আলোচনা শেষে ইমাম তাবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন,
“সঠিক মতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য অভিমত হলো আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ ﷺ–কে সমস্ত জগতের জন্য রহমত করে প্রেরণ করেছেন; চাই তারা মুমিন হোক কিংবা কাফির।”
আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর মাধ্যমে মুমিনকে হিদায়াত দান করেন, তাকে ঈমানের অমূল্য সম্পদে সমৃদ্ধ করেন এবং তার ﷺ আনীত বিধানসমূহের অনুসরণ করার ফলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।
আর কাফিরদের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর মাধ্যমে সেই সব শাস্তি ও বিপর্যয় প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, যা তার ﷺ আগমনের পূর্বে সেই সকল জাতির ওপর অবতীর্ণ হতো, যারা নিজেদের নবীদের অস্বীকার করত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ অন্যান্য নবীদের মতো কোনো নির্দিষ্ট জাতির জন্য প্রেরিত হননি; বরং তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। পূর্ববর্তী নবীদের অবস্থা এমন ছিল না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً
অর্থাৎ—
“পূর্ববর্তী নবীগণ কেবল তাঁদের নিজ নিজ জাতির কাছে প্রেরিত হতেন; আর আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে সমস্ত মানুষের জন্য।”
এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর পক্ষ থেকে এক সুস্পষ্ট ঘোষণা, তাঁর রিসালাত সমগ্র মানবতার জন্য, আর এ কারণেই তিনি সমস্ত জগতের জন্য রহমত।
যখন আমরা এই পূর্ণ প্রেক্ষাপটটি আমাদের চিন্তায় একত্র করি, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর জীবনাচার, বাণী ও কার্যকলাপকে আমরা আরও গভীরভাবে ও যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারি। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু ও পরম করুণাময়, আর রাসূলুল্লাহ ﷺ হলেন এই পৃথিবীর জন্য প্রদত্ত আল্লাহর বিশেষ রহমত।
এই মৌলিক নীতির ভিত্তিতেই রহমত ও মেহরবানির বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর বাণীতে এক সর্বব্যাপী ও সর্বজনীন ব্যাপ্তি লক্ষ করা যায়। যদিও আপনার শব্দসংখ্যা ছিল অল্প, কিন্তু তাতে নিহিত থাকত গভীর ও বিস্ময়কর অর্থ। অলৌকিক সংক্ষিপ্ততার গুণ থাকা সত্ত্বেও, সেই বাণীর আওতায় পৃথিবীর সকল বাসিন্দাই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত।





















