দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাযযা উপত্যকায় পূর্ণ মাত্রায় গণহত্যা চলছে। বিশ্বশক্তির অন্ধ দৃষ্টি এবং মানবাধিকারের তথাকথিত রক্ষকদের সামনেই অবর্ণনীয় নৃশংসতা ঘটে চলেছে, অথচ এই রক্তপাত বন্ধে অর্থবহ পদক্ষেপ নেওয়ার সদিচ্ছা কেউ দেখায়নি।
গাযযার বাইরেও মুসলিম উচ্ছেদের এই তিক্ত গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটছে অন্য কোথাও; সেটি কোনো অমুসলিম দেশে নয়, বরং এমন একটি রাষ্ট্রে যা অন্যায়ভাবে নিজেকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ বলে দাবি করে এবং একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ হিসেবে গর্ব করে। বাস্তবে এটি জায়নবাদী শাসনের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে, তাদের পদ্ধতিগুলো পুনরুৎপাদন করছে এবং একের পর এক জঘন্য কর্মকাণ্ডের অনুকরণ করছে।
হ্যাঁ, সেই দেশটি হলো পাকিস্তান! এমন এক ভূমি যা বহু বছর ধরে একটি সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের আধিপত্যের অধীনে রয়েছে। এই সামরিক শক্তি পশ্চিমা নির্দেশনা অনুসরণ করে এবং বিদেশি স্বার্থ রক্ষায় কোনো প্রচেষ্টাই বাকি রাখে না, এমনকি যখন সেই নীতিগুলোর ফলে পাকিস্তানের ভেতরেই হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এই একই ধারা এখন খাইবারের তিরাহ অঞ্চলে মঞ্চস্থ হচ্ছে।
উচ্ছেদের সাম্প্রতিকতম ঢেউ শুরু হয়েছে ১০ জানুয়ারি এবং তা ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। আনুমানিক ১২,০০০ পরিবার, যাদের সংখ্যা ৬০,০০০ থেকে ৮০,০০০ এর মধ্যেতাদের ঘরবাড়ি, কৃষিভূমি এবং এমনকি বেঁচে থাকার নূন্যতম উপায়গুলো ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের অনেকেই পেশোয়ার, কোহাট এবং অন্যান্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জেলাগুলোর দিকে পালিয়েছে, আবার বড় একটি অংশ অস্থায়ী ক্যাম্পে রয়ে গেছে যেখানে নেই কোনো মৌলিক পরিষেবা এবং হাড়কাঁপানো শীত থেকে বাঁচার মতো সুরক্ষা। শিশু, নারী এবং বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন; ক্ষুধা, অসুস্থতা এবং আশ্রয়ের অভাব তাদের জন্য নিত্যদিনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও পাকিস্তানের সামরিক জান্তা এই বাস্তুচ্যুতিকে “সাময়িক” বলে বর্ণনা করেছে এবং একে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, তবে স্থানীয় প্রতিবেদন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (যার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদির সাম্প্রতিক মন্তব্যও রয়েছে) ইঙ্গিত দেয় যে, এই পদক্ষেপগুলো মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা পরিচালিত। বনজ সম্পদ এবং সোনা ও তামার খনির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ এবং আইএসআইএস (ISIS)-সহ জঙ্গি সংগঠনগুলোকে পুনর্বাসন করাকে এই অভিযানের নেপথ্য উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি কেবল মানবিক বিপর্যয়ই সৃষ্টি করেনি, বরং ব্যাপক অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিণতিরও জন্ম দিয়েছে। পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি এবং পৈত্রিক জমি হারিয়েছে; বন এবং খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়েছে; উপজাতীয় উত্তেজনা তীব্র হয়েছে; এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রমা ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধনগুলো এখন ক্ষয়ের মুখে, যা পুরো জনগোষ্ঠীর সংহতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই ধরনটি নতুন নয়। ২০১২ এবং ২০১৩ সালের বাস্তুচ্যুতির ঢেউ, সেইসাথে ২০২৪ সালের ঘটনাবলী যার ফলে কুকিখেল উপজাতির হাজার হাজার মানুষ এখনও তাদের ঘরে ফিরতে পারেনি—এসবই একটি পুনরাবৃত্তিমূলক এবং পদ্ধতিগত চক্রের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রাক্তন উপজাতীয় অঞ্চলগুলোতে ৫.৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই এখনও ক্যাম্পে বা অনিশ্চিত ও অনিরাপদ অস্থায়ী বসতিতে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক নীরবতা এবং মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে তিরাহ-র বাস্তুচ্যুতদের দুর্ভোগ বিশ্ববাসীর আড়ালে থাকলেও, মাঠপর্যায়ে পরিবারগুলো প্রতিদিন শীতের তীব্রতা, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব এবং সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে তৈরি হওয়া ভয়ের পরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছে।
এটি এক রূঢ় বাস্তবতা; বিশ্ব রাজনীতি ও ক্ষমতার ছায়ায় মুসলিম উচ্ছেদের আরও একটি প্রতিচ্ছবি। এই মানুষগুলো কোনো দূরবর্তী অধিকৃত ভূমিতে বাস করে না, বরং “ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান” নামধারী একটি দেশের ভেতরেই তারা অবিচার, বৈষম্য এবং প্রকাশ্য ও গোপন বিভিন্ন নীতির শিকার হচ্ছে। সেখানে রাজনৈতিক চালবাজি এবং অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য মানুষের ভূমি ও জীবন—উভয়ই উৎসর্গ করা হচ্ছে।





















