আন্দালুসের কিছু বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি ও যোদ্ধা সম্পর্কে তৎকালীন আলেমদের নিকট করা একটি ইস্তিফতা (ফাতাওয়া-প্রশ্ন) ও তার উত্তর
যখন আন্দালুস ও ইসলামী মাগরিবের প্রতিরক্ষা ও দীনি অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্রুসেডাররা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন কিছু বিবেকহীন মুসলিমও ক্রুসেডারদের বাহিনীতে যোগ দেয়। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করত এবং সেই বীরত্বের জন্য পুরস্কার ও পদক লাভ করত। এসব পদকের মধ্যে লুনুর (Lunor) নামে একটি পদকও ছিল, যার ওপর ক্রুসেডার রাজার প্রতিকৃতি অঙ্কিত থাকত।
এই বিবেকহীন মুসলমানদের সম্পর্কে সে সময়কার আলেমদের নিকট একটি ইস্তিফতা (ফতোয়া-প্রশ্ন) করা হয়। মুহাম্মদ আল-মাহদী তাঁর «النوازل الصغرى»-এর প্রথম খণ্ডের ৪১৪ নম্বর পৃষ্ঠায় তা উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো করা হয়েছিল—
১. এরা কি মুরতাদ (ইসলামত্যাগী) গণ্য হবে, নাকি হবে না? আর যদি আপনারা তাদের মুরতাদ বলেন, তাহলে আমরা তাদের ওপর বিজয়ী হলে কি তাদের তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি হবে না?
২. তাদের স্ত্রীদের বিধান কী? তারাও কি তাদের স্বামীদের একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি তাদের বিধান ভিন্ন হবে?
৩. যদি তাদের স্ত্রীদেরও মুরতাদ বলা হয়, তবে কি তাদের হত্যা করা হবে, নাকি তাদের তাওবার আহ্বান জানানো হবে? নাকি ইবনুল মাজিশূনের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের দাসী বানানো হবে? নাকি বিষয়টি এর বিপরীত?
৪. তাদের সন্তানদের বিধান কী? তাদের সন্তানদেরকে কি যুদ্ধবন্দী বা দাস বানানো আমাদের জন্য বৈধ হবে? আর ইবন বত্তাল যে ইজমা (ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন, মুরতাদের সন্তানদের দাস বানানো যায় না, ইবন ওয়াহব ও অধিকাংশ শাফেয়ি আলেমের মতের আলোকে কি সেই ইজমা অকার্যকর হয়ে যায়?
৫. এরা কি মুরতাদ হিসেবে জন্মগত কাফিরের (আসল কাফিরের) হুকুমে গণ্য হবে, নাকি হবে না?
৬. এসব নতুন ও জটিল (নওয়াযিল) মাসআলা এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়ে ইমাম মালিক (রহ.)-এর সাহাবিগণের, যেমন ইবন ওয়াহব প্রমুখের বর্ণিত মতামতের ওপর আমল করা কি আমাদের জন্য বৈধ হবে, যদিও পরবর্তী যুগের আলেমরা সেগুলোকে প্রসিদ্ধ করেননি?
এরপর ইস্তিফতা ও তার উত্তর নিম্নরূপ উদ্ধৃত করা হয়েছে—
উত্তর:
সম্মানিত জনাব!
«النوازل الصغرى»-তে তাদের মুরতাদ হওয়ার ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট ফতোয়া দেওয়া হয়নি। বরং সেখানে ইবনুল জাওযী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুসারে সেই মতটিই তুলে ধরা হয়েছে, যা এ বিষয়ে ইরতিদাদ (মুরতাদ হওয়া)-কে কেবল আকীদাগত বিকৃতি (اعتقادی خبث)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। এটিই সালাফে সালেহীন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অধিকাংশ মুফাসসির, মুহাদ্দিস এবং চার ইমামের অবস্থান।
───
একইভাবে, ইসলামী মাগরিবের একটি অঞ্চলের কিছু মুসলিম কাফিরদের বিরুদ্ধে একটি জিহাদে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা ফিরে আসার পর সেই অঞ্চলের শাসক তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর শাস্তি আরোপ করে। তাদেরকে রাস্তায় ঘুরিয়ে অপদস্থ করা হয়, ঘোষণা করা হয়—“যে এমন কাজ করবে, তার পরিণতিও এ রকম হবে।” এরপর তাদের হত্যা করা হয়।
পরবর্তীতে ইসলামী মাগরিবের আরেক শাসক এ ঘটনার শরয়ী হুকুম জানার জন্য আলেমদের নিকট ইস্তিফতা পাঠান।
এই ঘটনা «النوازل الصغرى»-এর প্রথম খণ্ডের ৪১০ নম্বর পৃষ্ঠায় মুহাম্মদ আল-মাহদী (রহ.) বর্ণনা করেছেন। সেখানে প্রদত্ত উত্তরের সারাংশ হলো—
যদি এই শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য কেবল এই হয় যে, ওই অত্যাচারী শাসক কাফিরদের ধর্মকে ভালোবাসত এবং সেই প্রেক্ষাপটে তাদের সাহায্য করছিল, তবে এটি সুস্পষ্ট কুফর। এমন শাসকের কুফর সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকে না।
তবে ফতোয়ায় এটিও বলা হয়েছে যে, বাহ্যিকভাবে মুসলিম পরিচয় বহনকারী কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন উদ্দেশ্য আরোপ করা অত্যন্ত দূরবর্তী (অর্থাৎ খুবই দুর্বল সম্ভাবনা)।
নিচে প্রশ্ন ও তার উত্তর উদ্ধৃত করা হয়েছে—
উত্তর:
যদি সে ব্যক্তি আল্লাহর শত্রুদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে এবং তাদের ধর্মের প্রতি ভালোবাসা ও পক্ষপাতিত্বের কারণে জিহাদকারীদের হত্যা করে থাকে, তবে সে ইসলামের বন্ধন নিজের গলা থেকে খুলে ফেলেছে এবং সে মূর্তি ও প্রতিমা-পূজারীদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য হয়েছে।
এরপর শাইখ বানানী (রহ.) বলেন,
আলহামদুলিল্লাহ। সঠিক পথের তাওফীকদাতা একমাত্র আল্লাহ।
যে ব্যক্তি মুসলমানদের সঙ্গে এমন আচরণ করে, তার ফাসিক, জালিম ও অত্যাচারী হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সে দ্বীনের বড় বড় অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত এবং মহাপাপীদের একজন। যে-ই তার ওপর ক্ষমতা অর্জন করবে, তার জন্য আবশ্যক হবে মুসলমানদের ওপর তার অত্যাচার বন্ধ করা।
কারণ, ইবন মাজাহ হাসান সনদে বারা ইবন আযিব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ বলেছেন,
“সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে অন্যায়ভাবে একজন মুমিনকে হত্যা করার চেয়ে হালকা।”
এ হুঁশিয়ারি সাধারণ মুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যার ব্যাপারে। তাহলে যারা সেই মুজাহিদদের হত্যা করে, যারা অন্যান্য মুমিনদের পক্ষ থেকে এই মহান দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের ব্যাপারে শাস্তি কতই না কঠিন!
যদি বলা হয়, এই নিহত মুমিনদের কি কোনো দোষ ছিল, যেহেতু তারা তাদের শাসকের অনুমতি ছাড়া জিহাদে গিয়েছিল? উত্তর হবে—না, তাদের কোনো দোষ ছিল না; কারণ সেই শাসক ছিল একজন অত্যাচারী শাসক। যেমন আল-‘উতবিয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
ইবন ওয়াহব বলেন,
যদি ইমাম ন্যায়পরায়ণ হন, তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া কারও জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বযুদ্ধ বা যুদ্ধ করা বৈধ নয়। কিন্তু যদি তিনি ন্যায়পরায়ণ না হন, তবে তাঁর অনুমতি ছাড়াই যুদ্ধ করা যাবে।
ইবন রুশদ বলেন,
এটাই সঠিক। যদি শাসক ন্যায়পরায়ণ না হন, তাহলে যুদ্ধ বা দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য তার অনুমতি নেওয়া আবশ্যক নয়।
অত্যাচারী শাসক যখন তাদের শহরে ঘুরিয়ে ঘোষণা করেছিল, “এটাই তাদের শাস্তি এবং যারা এমন কাজ করবে তাদেরও একই পরিণতি হবে” তখন এর অর্থ হতে পারে যে, তারা তার অনুমতি ছাড়া জিহাদে গিয়েছিল, অথবা বিশেষ সেই অঞ্চলে জিহাদে গিয়েছিল, কিংবা নির্দিষ্ট সেই মুসলিম গোষ্ঠীর সাহায্যে গিয়েছিল।
এসব সম্ভাবনার যেকোনোটিই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবুও তার এই কাজ কবিরা গুনাহ। আর যার সামর্থ্য আছে, তার ওপর আবশ্যক হবে নিহতদের উত্তরাধিকারীদের জন্য কিসাস কার্যকর করার সুযোগ করে দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُوْمًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهٖ سُلْطٰنًا﴾
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, তার অভিভাবককে আমি প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিয়েছি।”
তবে এই কাজের কারণে সে কাফির হয়ে যাবে না। কারণ, কিবলামুখী (মুসলিম) কেউ কোনো গুনাহের কারণে কাফির হয়ে যায় না, যেমন আর-রিসালাহ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
হ্যাঁ, যদি তার উদ্দেশ্য জিহাদে বাধা দেওয়া হয় কাফিরদের ধর্মের প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের সমর্থনের কারণে, তাহলে তার কুফর হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু বাহ্যিকভাবে মুসলিম পরিচয়ধারী কারও ক্ষেত্রে এমন উদ্দেশ্য আরোপ করা অত্যন্ত দূরবর্তী সম্ভাবনা। সুতরাং তাকে মহাপাপী ও অবাধ্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। তার এবং যারা এই জঘন্য কাজে তার সহযোগিতা করেছে, সবার উপযুক্ত শাস্তি এবং তাদের ওপর কিসাস কার্যকর করা আবশ্যক।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই সর্বাধিক অবগত।





















