মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সহযোগিতা (সহায়তা) করার কিছু বৈধ রূপ:
যদি মুসলমানদের নেতৃত্ব ইসলামের স্বার্থ ও মুসলিম উম্মাহর সামষ্টিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে কোনো চুক্তির ভিত্তিতে কাফিরদের সঙ্গে মুসলমানদের কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহযোগিতা করে, তাহলে তারও কিছু বৈধ রূপ থাকতে পারে।
যেমন, নবী করীম ﷺ একটি চুক্তির ভিত্তিতে হযরত আবু জান্দাল ও আবু বাসীর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে কাফিরদের নিকট ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, কুরাইশের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হয়েছিল, যার শর্ত ছিল কুরাইশের কেউ নতুন মুসলিম হয়ে মদীনায় (আল্লাহ এ নগরীকে আরও আলোকিত ও সম্মানিত করুন) এলে তাকে কুরাইশের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
অনুরূপভাবে, কয়েক বছর আগে আফগানিস্তানের ইসলামি ইমারতের (نصرها الله وأعزها) নেতৃত্ব (আল্লাহ তাদের হেফাজত করুন এবং সাহায্য দান করুন) কাতারের রাজধানী দোহায় আমেরিকার সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ও গৌরবজনক চুক্তি সম্পাদন করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকা ও তার মিত্রবাহিনী চৌদ্দ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করবে এবং ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। এর বিনিময়ে ইসলামি ইমারত (أعزها الله ونصرها) এ ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হবে যে, তারা তাদের ভূখণ্ড কাউকে ব্যবহার করতে দেবে না, যে আমেরিকা ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সেখান থেকে কোনো অভিযান পরিচালনা করবে।
অতএব, এটিও এক অর্থে মুসলমানদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কাফিরদের সঙ্গে সহযোগিতা। তবে যেহেতু এই চুক্তি ইসলাম ও মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থ এবং নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে, তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের সহযোগিতা বৈধ।
যেমন, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) যাদুল মা’আদ-এর ৩য় খণ্ড, ২৬৭ নম্বর পৃষ্ঠায় বলেছেন:
ومنها: أن مصالحة المشركين ببعض ما فيه ضيم على المسلمين جائزة للمصلحة الراجحة، ودفع ما هو شر منه، ففيه دفع أعلى المفسدتين باحتمال أدناهما.
এর কয়েক লাইন পর তিনি আরও বলেন:
ومنها: جواز صلح الكفار على رد من جاء منهم إلى المسلمين وألا يرد من ذهب من المسلمين إليهم، هذا في غير النساء، وأما النساء فلا يجوز اشتراط ردهن إلى الكفار، وهذا موضع النسخ خاصة في هذا العقد بنص القرآن، ولا سبيل إلى دعوى النسخ فى غيره بغير موجب.
───
আল্লামা ইবন আশূর আল-মালিকী (রহিমাহুল্লাহ)
আল্লামা ইবন আশূর আল-মালিকী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীর «التحرير والتنوير»-এ সূরা আলে ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় কাফিরদের সঙ্গে মুওয়ালাত (বন্ধুত্ব/আনুগত্য)-এর বিভিন্ন রূপ ও তার বিধান উল্লেখ করেছেন।
প্রথম রূপ:
যদি কোনো মুসলিম অন্তরে কাফিরদের ধর্মকে পছন্দ করে, তার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং সেই মানসিকতার ভিত্তিতে কাফিরদের কোনো গোষ্ঠীকে ভালোবাসে, যদিও বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলিম বলে, তবে এটি কুফর ও নিফাকের অবস্থা।
দ্বিতীয় রূপ:
যদি কোনো মুসলিম আত্মীয়তা, পারিবারিক সম্পর্ক বা অন্য কোনো দুনিয়াবি কারণে কাফিরদের কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা বা ভালোবাসা রাখে, কিন্তু তাদের কুফরি বিশ্বাসকে ঘৃণা করে; অথচ সেই কাফিররা ইসলামের শত্রু, ইসলামের অবমাননা করে এবং মুসলমানদের কষ্ট দেয়, তাহলে এ কাজ কুফর নয়, তবে এটি কবিরা গুনাহ।
তৃতীয় রূপ:
যদি কোনো মুসলিম এমন কাফিরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা সহযোগিতা করে, যারা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা করে না এবং ইসলামের অবমাননাও করে না; যেমন ইসলামের সূচনাকালে কিছু আরব খ্রিস্টান বা হাবশার অধিবাসী, যারা মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছিল। ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এটি প্রথম দুই অবস্থার মধ্যবর্তী একটি অবস্থা। তবে এটিও নিষিদ্ধ, কারণ অনেক সময় এর মাধ্যমে ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে।
চতুর্থ রূপ:
যদি কোনো মুসলিম কাফিরদের সহায়তা গ্রহণ করে মুসলমানদেরই অন্য একটি গোষ্ঠীর ক্ষতি করা বা তাদের ওপর বিজয় অর্জনের উদ্দেশ্যে, তাহলে এ অবস্থার শরয়ী বিধান বিভিন্ন পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
পঞ্চম রূপ:
যদি মুসলমানরা নিজেদের শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য কোনো কাফির গোষ্ঠীর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, এবং সেই কাফিররাও মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে ও সাহায্যের প্রস্তাব দেয়, তাহলে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ষষ্ঠ রূপ:
যদি কোনো মুসলিম কোনো নির্দিষ্ট কাফিরের সঙ্গে কেবল ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক, উত্তম আচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক অথবা তার কোনো ভালো গুণের কারণে বন্ধুত্ব রাখে, এবং এতে কোনো মুসলিমের ক্ষতি না হয়, তবে এ ধরনের সম্পর্ক বৈধ।
সপ্তম রূপ:
ব্যবসা-বাণিজ্য, চুক্তি, সন্ধি ইত্যাদি দুনিয়াবি লেনদেনের বিধান পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ফিকহের গ্রন্থসমূহে রয়েছে।
অষ্টম রূপ:
যদি কোনো মুসলিম কাফিরদের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ বা নমনীয় আচরণ করে, তবে এটি তাকিয়্যা-র অন্তর্ভুক্ত। কুরআনেও এর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
اِلَّاۤ اَنْ تَتَّقُوْا مِنْهُمْ تُقٰىةً
অর্থাৎ, “তবে যদি তোমরা তাদের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে (বাহ্যিকভাবে) সতর্কতা অবলম্বন করো, তাহলে তা বৈধ।”
এটাই ছিল ইবন আশূর (রহিমাহুল্লাহ)-এর বিস্তারিত আলোচনার সারসংক্ষেপ।
সুতরাং, এই বিস্তৃত আলোচনায় এবং উল্লিখিত সব ধরনের মুওয়ালাত-এর মধ্যে তিনি কেবল প্রথম অবস্থাকেই কুফর ও নিফাক বলেছেন; কারণ সেটি আকীদাগত বিকৃতি ও অন্তর্নিহিত বিশ্বাসগত দূষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্য সব অবস্থাকে তিনি কুফর বলেননি।
───
একইভাবে, আল্লামা ইবন আশূর আল-মালিকী (রহিমাহুল্লাহ) সূরা মায়িদার এ আয়াত—
﴿يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِيْنَ اتَّخَذُوْا دِيْنَكُمْ هُزُوًا وَّلَعِبًا مِّنَ الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ اَوْلِيَآءَ ج وَاتَّقُوا اللّٰهَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ﴾
—এর তাফসীরে বলেন:
وَإِذَا أُرِيدَ بِالْمُوَالَاةِ الْمَنْهِيِّ عَنْهَا الْمُوَالَاةُ التَّامَّةُ بِمَعْنَى الْمُوَافَقَةِ فِي الدِّينِ فَالْأَمْرُ بِالتَّقْوَى، أي الْحَذَرِ مِنَ الْوُقُوعِ فِيمَا نُهُوا عَنْهُ مُعَلَّقٌ بِكَوْنِهِمْ مُؤْمِنِينَ بِوَجْهٍ ظَاهِرٍ. وَالْحَاصِلُ: أَنَّ الْآيَةَ مُفَسَّرَةٌ أَوْ مُؤَوَّلَةٌ عَلَى حَسَبِ مَا تَقَدَّمَ فِي سَالِفَتِهَا ﴿وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ﴾ [الْمَائِدَة: 51].
চলবে…





















