কখনো কখনো ইতিহাস এত স্পষ্টভাবে এবং এত রক্তের বিনিময়ে তার শিক্ষা লিখে যায় যে, মানুষ যতই চাইুক, সেখান থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে না। ২৪ আসাদ (১৫ আগস্ট) উপলক্ষে আফগানিস্তানের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই একটি মৌলিক প্রশ্ন মনে জাগে: একটি জাতির জন্য স্বাধীনতা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? আর বিদেশিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রক্ষমতার আধিপত্য কেন যেকোনো জীবন্ত সমাজের জন্য প্রাণঘাতী বিষের চেয়ে কম নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়োজন নেই। ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর কুনদুজে সংঘটিত সেই রক্তাক্ত ঘটনাটিই স্মরণ করা যথেষ্ট।
সেই অন্ধকার রাতে, যখন পুরো শহর যুদ্ধের আতঙ্কে গ্রাসিত, তখন মেডিসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (MSF) হাসপাতালটি ছিল নিরপরাধ মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল। কিন্তু যখন একটি মার্কিন AC-130 গানশিপ হাসপাতালটিতে বোমাবর্ষণ শুরু করল, তখন হাসপাতাল ভবনের আন্তর্জাতিক পরিচয়চিহ্ন কিংবা ভবনের প্রতিটি অংশকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া যাবতীয় নথি ও তথ্য কোনোটিই সেটিকে রক্ষা করতে পারল না।
একটানা এক ঘণ্টা ধরে বোমাবর্ষণ চলতে থাকে। অপারেশন থিয়েটারে অচেতন অবস্থায় শুয়ে থাকা রোগীরা জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যান। আর আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের বৃষ্টি থেকে পালানোর চেষ্টা করতে থাকা চিকিৎসকরাও রেহাই পাননি। পরবর্তীতে ৪৭ জন মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনাটিকে কেবল একটি “প্রযুক্তিগত ভুল” হিসেবে বর্ণনা করে বিষয়টি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই বেদনাদায়ক ঘটনাটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা কিংবা সামরিক ব্যর্থতা ছিল না; বরং এটি ছিল সেই বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র, যখন কোনো দেশের ক্ষমতার লাগাম বিদেশিদের হাতে থাকে, তখন পরাধীন জাতির মানুষের রক্ত তাদের কাছে কতটা সস্তা হয়ে যায়। কোনো বিদেশি শক্তি যখন কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, তখন তারা উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের আকর্ষণীয় স্লোগানের আড়ালে নিজেদের স্বার্থকে লুকিয়ে রাখে। আর এই আধিপত্যের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো নিপীড়িত ও পরাধীন জাতির মানুষের মর্যাদা, সম্মান ও মানবাধিকারের মূল্য ক্রমেই তুচ্ছ হয়ে যায়।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়ভাবে এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করে যে, মুসলিম সমাজ তাদের সিদ্ধান্ত, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষেত্রে অমুসলিম কিংবা বিদেশি শক্তির সাহায্য ও সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হবে। কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অন্যের দাসত্ব ও মানসিক পরাধীনতা থেকে মুক্ত করা এবং তাদের সম্মান ও আত্মনির্ভরতার সঙ্গে জীবনযাপনের উপায় করে দেওয়া। বিদেশি রাজনৈতিক শাসন একটি মুসলিম জাতির নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণের অধিকার কেড়ে নেয়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক আধিপত্য তাকে আন্তর্জাতিক বাজার ও ঋণের এমন এক জালে আবদ্ধ করতে পারে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
যতদিন কোনো দেশ তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে না পারে, ততদিন তার ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। ২৪ আসাদ কেবল আমেরিকার পরাজয় ও সামরিক প্রত্যাহারের দিন নয়; এটি সেই ধারণারও বিজয়ের দিন যে, স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। এই দিন আমাদের শিক্ষা দেয়, বিদেশি বাহিনীর ছায়ায় অর্জিত আপাত শান্তি আসলে একটি ক্ষণস্থায়ী মরীচিকা; যার পরিণতি শেষ পর্যন্ত কুনদুজের মতো মর্মান্তিক ঘটনায় গিয়ে ঠেকতে পারে।
প্রকৃত স্বাধীনতার লক্ষ্য কেবল বিদেশি বাহিনীকে বিতাড়িত করা নয়। বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং এমন একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও আত্মনির্ভরশীল ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিদেশি শক্তি পুনরায় হস্তক্ষেপ করার সাহস না পায়। কোনো জাতি অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করে কখনোই প্রকৃত উন্নতি লাভ করতে পারে না। তার অস্তিত্ব ও মর্যাদা নিহিত রয়েছে তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা এবং নিজস্ব আদর্শের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের মধ্যেই।





















