দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান এই অঞ্চলে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করে আসছে। একদিকে তারা নিজেদের শান্তি ও স্থিতিশীলতার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাস্তবে তারা এই অঞ্চলের আগুনের ইন্ধনদাতায় পরিণত হয়েছে। এই বৈরী নীতির শিকড় পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধে প্রোথিত। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীলতার মধ্যে আটকে আছে।
নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষার একটি উপায় হিসেবে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানে কৌশলগত গভীরতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে এসেছে। এই চিন্তার সূত্রপাত শীতল যুদ্ধের সময়, আর পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের মধ্য দিয়ে তা অব্যাহত থাকে। বছরের পর বছর পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু মূল নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। যে কারণে এই নীতি শেষ পর্যন্ত আগুন জ্বালানোর নীতিতে পরিণত হয়েছে, তা হলো আফগানিস্তান ও এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো বিভিন্ন শক্তিকে পাকিস্তানের সমর্থন।
পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছিলেন যে, পাকিস্তান তিন দশক ধরে পশ্চিমাদের হয়ে ‘নোংরা কাজ’ করেছে এবং এর জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করার এই উত্তরাধিকার এখনো পুরো অঞ্চলকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে আরেকটি বিষয় গভীরভাবে জড়িত, তা হলো ঔপনিবেশিক আমলে চাপিয়ে দেওয়া সীমান্ত এবং নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে পাকিস্তানের অস্ত্র ও সহায়তা প্রদান। উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন পশতুন জনগণের ওপর যে ডুরান্ড সীমারেখা চাপিয়ে দিয়েছিল, সেটি আজও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় দুর্বলতা এবং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের একটি অজুহাত হিসেবে রয়ে গেছে। এই দুর্গম ও কঠিন সীমান্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান আরবাকি ও আইএসআইএস-কে-এর মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করেছে এবং আফগানিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে তাদের ব্যবহার করেছে। কিন্তু এই পরস্পরবিরোধী নীতিই এখন পাকিস্তানের জন্য গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, ফলে দেশটি নিজেই সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের অন্যতম হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তানের প্রতি পাকিস্তানের নীতিও নতুন নতুন রূপ ধারণ করেছে। যে দেশ একসময় আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত, তারা এখন ইসলামী আমিরাতের নীতিগত পরিবর্তনে হতাশ হয়ে সীমান্তপথ বন্ধ করা, অভিবাসীদের বহিষ্কার করা এবং এমনকি আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এই সরাসরি সংঘাতই প্রমাণ করে যে পাকিস্তানের নীতি এখন কতটা অচলাবস্থায় পৌঁছে গেছে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানও এর জবাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে এবং ইসলামাবাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ভারতসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের সহযোগিতার ঘোষণা পাকিস্তানকে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
পাকিস্তানের নীতির মূল সমস্যা হলো, তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে দেখে। অন্যদের দুর্বল করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় এবং আফগানিস্তানে সংঘটিত প্রায় প্রতিটি পরিবর্তনকেই ভয়ের চোখে দেখে, এমনকি সেই পরিবর্তন আফগানিস্তানের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থেই হলেও। এই দৃষ্টিভঙ্গির শিকড় পাকিস্তানের নিরাপত্তা-নীতিনির্ধারণের দীর্ঘস্থায়ী একটি সমস্যায় নিহিত, যেখানে পুরো অঞ্চলকে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে প্রতিযোগিতা ও প্রভাব বিস্তারের ময়দান হিসেবে দেখা হয়।
উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী নীতি অনুসরণের জন্য চড়া মূল্য দেওয়ার পরও পাকিস্তান একই পথে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবেশীর ঘরে যে আগুন জ্বালানো হয়, একসময় না একসময় সেই আগুন তার জন্মদাতার ঘরেও পৌঁছে যায়। অস্থিতিশীলতার এই ঘূর্ণাবর্ত থেকে কেউই চিরকাল নিরাপদ থাকতে পারে না।





















