আফগানিস্তানের উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে দূরদেশ থেকে প্রায়ই এমন সব বক্তব্য শোনা যায়, যেখানে দাবি করা হয়, দেশে পরিবর্তন ও রাজনৈতিক রূপান্তর আসন্ন। এসব কণ্ঠের অধিকাংশই দেশের বাইরে থেকে আসে। সেখানে তারা নিজেদের কখনো ‘প্রতিরোধী ফ্রন্ট’, কখনো ‘বিরোধী শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু দেশের বাইরে বসে তারা যে কথাগুলো বলে, সেগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তানের ভেতরে বাস্তবে যা ঘটছে, তার বিস্তর ফারাক রয়েছে।
ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশের বাইরে যে তৎপরতা গড়ে উঠেছে, তা কোনো গুরুতর রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি প্রচারণানির্ভর তৎপরতা, যা গুজব ছড়ানো, জাতিগত ও মাজহাবি বিভেদকে অতিরঞ্জিত করা এবং রাজনৈতিক বিভাজন উসকে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
এই পরিস্থিতি বুঝতে হলে প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বছরের পর বছর তৎপরতা চালানোর পরও এসব ফ্রন্ট কেন আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি?
এর প্রধান কারণ, তাদের কারোরই বাস্তব জনসমর্থন নেই। তারা সমাজের প্রান্তিক পরিসরে, দেশের বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বহু দূরে, মূলত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্য থেকে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। গণমাধ্যমে নানা বক্তব্য, অতিরঞ্জিত সাক্ষাৎকার ও প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রকৃত অবস্থানের চেয়ে অনেক বড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু আফগানিস্তানের জনগণ এসব ব্যক্তির অতীত নিজেদের চোখে দেখেছে। তারা জানে, এসব ফ্রন্টের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবতা নয়, নিছক মরীচিকা।
ইতিহাসও এর সাক্ষী। এসব ফ্রন্টের অধিকাংশ নেতা ও অনুসারী সেই একই লোক, যারা বিশ বছরের দখলদারিত্বের সময় বিদেশি নির্ভরশীল কাঠামোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিল। দুর্নীতি, আত্মসাৎ ও দেশের সম্পদ লুটের মাধ্যমে তারা জনগণের মনে তিক্ত স্মৃতি রেখে গেছে। হাজারো আফগানের রক্তের বিনিময়ে যারা ক্ষমতার আসনে বসেছিল এবং দেশের জাতীয় সম্পদ নিজেদের ও তাদের বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল, আজ তারাই দেশের বাইরে বসে নিজেদের জনগণের অধিকার রক্ষার প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং সেই একই প্রতারণাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করছে। কিন্তু যে জনগণ তাদের অপরাধের বোঝা বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তারা কি আজ তাদের এসব দাবি বিশ্বাস করবে?
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব ফ্রন্টের অধিকাংশেরই আফগানিস্তানের পরিবর্তনের জন্য কোনো বাস্তব কর্মপরিকল্পনা বা সুস্পষ্ট কৌশল নেই। তাদের কার্যক্রম মূলত অনলাইন বৈঠক করা, বারবার বিবৃতি প্রকাশ করা এবং মাঝেমধ্যে বিদেশি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সমাধান বা গঠনমূলক সমালোচনা উপস্থাপনের পরিবর্তে তারা পুরোনো স্লোগান আওড়ানো এবং বিভাজন উসকে দেওয়াকেই বেশি পছন্দ করে। কেউ জাতিগত অধিকারের কথা বলে, কেউ ধর্মীয় অন্ধকারের কথা বলে, আবার কেউ রাজনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে চিৎকার করে। অথচ দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অভিবাসন কিংবা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে কারও কোনো বাস্তব কর্মসূচি নেই।
তাদের লক্ষ্য আফগানিস্তান পুনর্গঠন করা নয়। তারা জনগণের মধ্যে নিজেদের নাম টিকিয়ে রাখার জন্য একটি অজুহাত খুঁজছে এবং নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি শক্তির কাছ থেকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আফগানিস্তানের জনগণ আজ এসব রাজনৈতিক খেলা আগের চেয়ে অনেক ভালো বোঝে। তারা আগের দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের যন্ত্রণা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুভব করেছে। তারা এটাও জানে, বিদেশে বসবাসকারীদের মুখের মিষ্টি প্রতিশ্রুতি আবারও একই তিক্ত পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি এমন বহু নাম দিয়ে পরিপূর্ণ, যারা একসময় বড় বড় ও প্রতারণাপূর্ণ স্লোগান দিয়ে মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতা ও পলায়নের মাধ্যমে তাদের হতাশা ছাড়া আর কিছু দেয়নি। এ কারণেই আজ আফগানিস্তানে খুব কম মানুষই এসব প্রচারণামূলক ফ্রন্টকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। জনগণ জানে, দেশের মাটিতে যা ঘটছে, তার বাস্তবতা দেশের বাইরে থেকে দেওয়া দাবির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এসব ফ্রন্টের নিজেদের মধ্যেও আরেকটি বড় সমস্যা রয়েছে: অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও গভীর বিভাজন। যারা ঐক্যের কথা বলে, তারাই কখনো একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠন করতে পারেনি। জাতিগত, ভাষাগত, আদর্শিক এমনকি ব্যক্তিগত বিরোধও তাদের বিভক্ত করে রেখেছে। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এমনকি দেশের বাইরে থেকেও, যেখানে তারা চাইলে একসঙ্গে কাজ করতে পারত, সেখানেও তারা তা করতে পারছে না। প্রত্যেক দল নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে এ বিষয়টিই প্রমাণ করে, তারা আজকের আফগানিস্তানের বাস্তবতা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন।
তবে এসব ফ্রন্টের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশের ভেতরে তাদের জনসমর্থনের অভাব। যারা আফগানিস্তানের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও ইসলামী ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়, তারা অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আর ফিরে যেতে চায় না। তারা বুঝতে পেরেছে, দেশের বাইরে বসে থাকা এসব মানুষ জনগণের জন্য পদ ও মর্যাদা খুঁজছে না; তারা নিজেদের জন্য পদ ও মর্যাদা খুঁজছে। জনগণের মধ্যে এই উপলব্ধিই তাদের প্রচারণা ও প্রতারণার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব ফ্রন্টের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন আসলে একটি মরীচিকা ছাড়া কিছু নয়। উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরুভূমিতে পথ চলতে থাকা কোনো পথিক দূরে মরীচিকাকে পানি মনে করে তার দিকে ছুটতে পারে। ঠিক তেমনি কেউ কেউ মনে করে, বিদেশি সমর্থন ও গণমাধ্যমের প্রচারণার মাধ্যমে তারা আবার আফগানিস্তানের পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আফগান জনগণ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন এবং তারা এসব মরীচিকায় প্রতারিত হবে না।
যারা অপরাধ ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে মানুষের মনে অন্ধকার ও তিক্ত স্মৃতি রেখে গেছে, তারা আর জনগণের পক্ষ থেকে কথা বলার দাবি করতে পারে না। অতীতে তারা যা করেছে, তার জবাব তাদের দিতেই হবে।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা এই মাটিতে থেকে এর দুঃখ-কষ্ট সহ্য করছে এবং দেশ পুনর্গঠনের জন্য নিজেদের হৃদয় ও শ্রম নিয়োজিত করেছে। দেশের বাইরে অবস্থানকারীরা যদি সত্যিই পরিবর্তন চায়, তাহলে তাদের প্রচারণা ও গুজব ছড়ানো বন্ধ করে বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ ও অংশগ্রহণের পথ বেছে নিতে হবে। তা না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রচারণামূলক ফ্রন্ট দূর প্রান্তে বসে তাদের রাজনৈতিক খেলা চালিয়ে যাবে, আর দেশের মানুষ খোলা ও সজাগ চোখে তাদের এসব মরীচিকার পাশ দিয়ে এগিয়ে যাবে।





















