শহিদ মুতিউল্লাহ বালুচ রহ. ছিলেন নববি চরিত্রের অধিকারী, ইউসুফি সৌন্দর্যে শোভিত এক সাহসী ও দৃঢ়চেতা যুবক। তিনি জিরগুলের পুত্র এবং ময়দান ওয়ারদাক প্রদেশের নেরখ জেলার ওলাখাইল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ১৩৭৭ হিজরি শামসি সালে তিনি এমন এক দ্বীনদার ও পরহেজগার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যে পরিবার জিহাদ ও শাহাদাতের চেতনায় নিবেদিত ছিল।
তাঁর শিক্ষাজীবন
শৈশবেই তিনি নিজ গ্রামের ইমামের কাছে প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা ও আকিদার পাঠ গ্রহণ শুরু করেন। পবিত্র কুরআনের সৌন্দর্য ও দ্বীনি ইলমের আলো তাঁর অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি শহিদ সাবির বারিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন, যেখানে দ্বীনি শিক্ষা ও জিহাদের প্রশিক্ষণ পাশাপাশি চলত। এ সময় তিনি নিজের গ্রাম ও জেলার পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জন করেন এবং প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পান, দখলদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় অনুচরেরা মুসলমানদের ওপর কীভাবে নির্মমতা ও নির্যাতন চালাচ্ছে।
জিহাদের সূচনা ও তাঁর সংগ্রাম
সমগ্র দেশে দখলদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় অনুচরদের অত্যাচার সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। শহিদ বালুচের পরিবারও এই নিপীড়নের শিকার হয়। স্থানীয় মিলিশিয়ারা বারবার হুমকি দিত এবং তাদের নিজ গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করার ভয় দেখাত। তাঁর আরেক ভাই মাওলভি হুমায়ুন, যিনি হিলাল নামেও পরিচিত ছিলেন, পবিত্র কুরআনের হাফিজ, একজন পরহেজগার মানুষ এবং কাবুলে ইস্তিশহাদি মুজাহিদদের নেতা ছিলেন। তাঁকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হয়। বাগরাম কারাগারে বন্দি থাকাকালে তিনিও মাওলভি হন। এসব কারণে তাঁদের পরিবারের ওপর দুর্ভোগের ঘনঘটা নেমে আসে। প্রজাতন্ত্রের বর্বর লোকেরা মুজাহিদ, দ্বীনদার ও ঈমানদারদের পরিবারের সঙ্গে চরম নিষ্ঠুর আচরণ করত।
তাঁর ভাই বলেন, আমাদের পরিবার ও আমার ভাইয়ের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল। এমন পরিস্থিতিতে ১৩৯১ হিজরি শামসি সালে শহিদ বালুচ জিহাদের ময়দানে, অর্থাৎ লোগার প্রদেশের বাবুল জিহাদে, নিজের ঈমান ও আত্মমর্যাদার পতাকা উড্ডীন করেন। এরপর জীবনের বাকি সময় তিনি জিহাদের উত্তপ্ত পরিখায় কাটান। আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করা এবং নিজের দেশকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যান।
তিনি ছিলেন নেরখ জেলার দান্দ এলাকার প্রথম দিককার সাহসী মুজাহিদদের একজন। নিজের দ্বীন ও দেশকে ভালোবাসতেন, শাহাদাতের জন্য ছিলেন ব্যাকুল, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ছিলেন গভীর অনুরাগী এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন। তিনি ছিলেন পরহেজগার, একনিষ্ঠ, আল্লাহভীরু ও বিনয়ী। অসংখ্য যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের দক্ষতার পাশাপাশি মাইন ব্যবহারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি একটি দলের নেতৃত্ব দিতেন এবং সম্মুখসারির একটি অবস্থানের দায়িত্বেও ছিলেন। নিজ জেলায় বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ উভয় শত্রুর বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এমনকি তাঁর এলাকায় সংঘটিত প্রতিটি আক্রমণ ও অতর্কিত হামলায় তিনি উপস্থিত থাকতেন।
আপনি যদি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবন অধ্যয়ন করেন এবং শহিদ বালুচের জীবন ও আত্মত্যাগের সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন, বালুচও সেই একই পথে চলেছেন এবং সরল পথে অবিচল থেকেছেন।
বালুচ ছিলেন সব ঈমানদারের, বিশেষত তরুণ মুজাহিদদের অত্যন্ত প্রিয়। সবাই তাঁকে ভালোবাসত এবং সম্মান করত।
তিনি লোগার প্রদেশের বাবুস এলাকায় জিহাদ শুরু করেন। এরপর নিজের ধারালো তরবারির অভিযান বিস্তৃত করেন নেরখ জেলা, ময়দান শহর, জালরেজ এবং ময়দান ওয়ারদাক প্রদেশের অন্যান্য এলাকায়। দ্বীনের বিরোধিতা করত এবং দ্বীনের নিদর্শনগুলো নিয়ে উপহাস করত, এমন বহু বর্বর শত্রুকে তিনি জাহান্নামের অতল গহ্বরে পাঠিয়েছেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তাঁর উপস্থিতিতে কোনো গুপ্তচর বা বিশ্বাসঘাতক স্বস্তিতে থাকতে পারত না। তাঁর নাম শুনলেই প্রত্যেক বেঈমান ব্যক্তি ভয়ে কেঁপে উঠত। লেখকের মতে, এটি ছিল তাঁর ঈমান ও তাকওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
দাঈশিদের বিরুদ্ধেও তিনি সাহসিকতা ও নির্ভীকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। সুসংগঠিত অভিযানে তিনি কয়েকবার সঙ্গীদের নিয়ে নানগারহার প্রদেশে গিয়েছিলেন। এমনই একটি অভিযানের ঘটনা তিনি প্রায়ই বর্ণনা করতেন।
“একটি যুদ্ধের সময় দাঈশের একজন খারেজি ঘোষণা করল যে, সে আত্মসমর্পণ করছে। কিন্তু সে যখন আমাদের কাছাকাছি এল, তখন আমাদের লোকদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর চেষ্টা করল। আমরা তাকে গুলি চালাতে দিইনি। সে গুলি করার আগেই আমরা তার মাথায় গুলি করি। তখন আমাদের সঙ্গীরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল, ‘মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লড়াই করা মোটেও সহজ কাজ নয়।’ তত দিনে আমরা দাঈশ খাওয়ারিজদের কাছ থেকে অনেক এলাকা দখল করে নিয়েছিলাম।
দুই দিন পর আমরা যখন আমাদের ঘাঁটির দিকে ফিরে যাচ্ছিলাম, তখন সঙ্গীরা বলল, ‘চলো, গিয়ে দেখে আসি, ওই দাঈশ যোদ্ধার লাশের কী অবস্থা হয়েছে।’ তার মৃতদেহ থেকে দুর্গন্ধ ও পচা গন্ধ বের হচ্ছিল। অথচ আমাদের শহিদ সঙ্গীরা শাহাদাতের পর রণাঙ্গনে মাসের পর মাস রোদে পড়ে থাকতেন, তবু তাঁদের দেহ পচত না কিংবা দুর্গন্ধ ছড়াত না। এই ঘটনা আমাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করেছিল।”
তাঁর সঙ্গীদের স্মৃতিচারণ
মুহাম্মদ আলম মুবাশিরের ভাষায়
মাতিউল্লাহ বালুচ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। পরিস্থিতি যেমনই হোক, তিনি বন্ধুদের সাহস জোগাতেন। অভিযান, যুদ্ধ, অতর্কিত হামলা কিংবা আক্রমণ, সব ক্ষেত্রেই তিনি ধৈর্য, অবিচলতা ও আনুগত্যের কথা বলতেন। তাঁর ঠোঁট সর্বদা আল্লাহর জিকিরে নড়ত। বালুচ ছিলেন প্রকৃত আত্মমর্যাদাবোধ ও সাহসিকতার অধিকারী। আমাদের কাছে তাঁর মর্যাদা ছিল একজন সেনাপতির মতো। তিনি উন্মাদের মতো শাহাদাত কামনা করতেন। দুনিয়া কিংবা দুনিয়ার কোনো কিছুর প্রতিই তাঁর সামান্যতম আসক্তি ছিল না। সমগ্র অঞ্চলে তিনি উত্তম চরিত্রের এক আদর্শ ছিলেন। এ কারণেই আজও তাঁর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে অম্লান রয়েছে।
নাসিবুল্লাহ বালুচের ভাষায়
বীর বালুচ যখন যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে থাকা মুজাহিদ সঙ্গীরা ছাড়া আর কেউ বিষয়টি জানত না। এমনকি তিনি নিজের মাকেও জানাননি যে তিনি আহত হয়েছেন। আমি ও আমার ছোট ভাই ছাড়া কেউ জানত না যে বালুচ আহত হয়েছেন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য নেরখ জেলা থেকে চাক জেলায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তিনি সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিলেন। কিছুদিন পর তিনি আগের মতোই আবার জিহাদে ফিরে যান।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি মাথায় একটি ছোট রুমাল পেঁচিয়ে রাখতেন। গ্রেনেড লঞ্চারের গোলার স্প্লিন্টারের আঘাতে তাঁর মাথা আহত হয়েছিল। অনেক দিন পর একবার আমরা সবাই বাড়িতে একসঙ্গে বসেছিলাম। তখন তাঁর মাথা থেকে রুমালটি কিছুটা সরে যায়। তাঁর মা লক্ষ করেন, যেখানে আঘাত লেগেছিল, সেখানে চুল ছোট করে কাটা। তাঁর মা বললেন, ‘বাবা, তোমার চুল এমন কেন? কোথাও লম্বা, আবার কোথাও ছোট?’
এরপর তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ব্যাপার কী? তোমরা দুজন তো কিছুই বলোনি। আমরা শুনেছি, সে অন্য আহতদের সঙ্গে বাইরে গিয়েছিল। তার মানে সেও তো আহত হয়েছিল।’
বালুচ মাকে বললেন, ‘আমি আহত হইনি। অন্য সঙ্গীরা আহত হয়েছিল, আমি শুধু তাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম।’
তাঁর শাহাদাতের ঘটনা, তাঁর ভাইয়ের নিজের বর্ণনায়
১৩৯৭ হিজরি শামসির ২০ সাওরের রাতটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ভীতিকর। দখলদার বাহিনীর বিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টারের ভয়াবহ বোমাবর্ষণের মধ্য দিয়ে পুরো রাত কেটে যায়। আকাশের নিস্তব্ধতা যখন বোমার বিস্ফোরণে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল, চারদিকে যখন মৃত্যুর ছায়া ছড়িয়ে পড়ছিল এবং প্রিয়জনদের পরিণতি নিয়ে মানুষের হৃদয় কাঁপছিল, রাতটি ছিল ঠিক তেমনই।
তিনি বলেন, আমি ময়দান ওয়ারদাক প্রদেশের বান্দে চাক জেলার সিওয়াকি বাজারে গিয়েছিলাম। বিপ্লবের দিনগুলোতে মুজাহিদরা এই বাজার থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় অনেক কিছু সংগ্রহ করতেন। দীর্ঘ সফরে সারাদিন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখি, বাড়ির উঠান ও কক্ষগুলোতে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছে। বাড়িতে শুধু আমার বড় ভাই ও ছোট ভাতিজা ছিল।
আমরা যখন খেতে বসেছিলাম, তখন মা আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন,
“বালুচ কোথায়? সে কোথায় গেছে?”
আমি বললাম,
“সামনের অবস্থানে আজ তার দায়িত্ব পালনের পালা ছিল। সন্ধ্যায় তার ডিউটি শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু এখনো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।”
মা নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটি সাদা কাপড় বের করলেন। তাতে পবিত্র কালিমা লেখা ছিল, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল।’ তিনি কাপড়টি আমাকে দেখিয়ে বললেন,
“আজ বালুচ যখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল, তখন আমাকে বলেছিল, মা, এই কালিমাটি আপনার কাছে রেখে দিন। আমি শহিদ হলে এটি আমার মাথায় পেঁচিয়ে দেবেন। মা, আপনার সঙ্গে এটাই আমার শেষ দেখা।”
আমি হেসে বললাম,
“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন তাকে এত তাড়াতাড়ি আমাদের কাছ থেকে নিয়ে না যান!”
কিন্তু মা নীরব হয়ে গেলেন। বালুচের কথাগুলো তাঁর হৃদয়ের গভীরে এক অচেনা ভয়ের সঞ্চার করেছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, ছেলের কথাগুলো সত্যিই কি তার শেষ বিদায়বাণী হয়ে উঠবে, নাকি মুহূর্তের আবেগে বলা কিছু কথা মাত্র।
কিন্তু তাকদিরে লেখা ছিল অন্য কিছু। সেই কথাগুলোই শেষ পর্যন্ত মা ও তাঁর ছেলে মাতিউল্লাহ বালুচের শেষ সাক্ষাৎ হয়ে রইল।
তিনি বলেন, আমরা খাওয়া শেষ করলাম। আমার বড় ভাই ডেকে বললেন,
“আহমাদি! জামাতের নামাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি এসো!”
সে সময় আমাদের ছোট ভাই নাসিবুল্লাহ আহমাদি নামে পরিচিত ছিল। মাতিউল্লাহ বালুচের শাহাদাতের পর সে বালুচ নামে পরিচিত হয়।
আমি বড় ভাইয়ের সঙ্গে মসজিদের দিকে রওনা হলাম। পথে তিনি আমাকে বললেন,
“আজ রাতে আকাশে কোনো নজরদারি বিমান দেখা যাচ্ছে না। কোথাও যেয়ো না!”
আমি বললাম,
“এমন পরিস্থিতিতে কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। নামাজের পর আমরা নিজেদের ব্যবস্থা করে নেব।”
আমরা মসজিদে পৌঁছালাম। জামাত শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং লোকেরা নামাজে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমরা সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষও করতে পারিনি, এমন সময় হঠাৎ মাথার ওপর দিয়ে বি-৫২ বিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টারের শব্দ ভেসে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ। বিস্ফোরণের শব্দ রাতের নীরবতা ভেঙে চারদিকে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল।
আমরা নামাজ শেষ করলাম। বোমার বিস্ফোরণের শব্দ ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছিল। আমার বড় ভাই ব্যথা ও উদ্বেগে চিৎকার করে উঠলেন,
“আহ! মনে হচ্ছে, ওদের শহিদ করে দিয়েছে!”
তিনি জানতেন, বালুচ ও তার সঙ্গীরা সম্মুখসারিতে অবস্থান করছে। তাই তাঁর আশঙ্কা হলো, শত্রুরা সম্ভবত তাদের ওপরই হামলা চালিয়েছে।
তখন রাত প্রায় আটটা। চৌদ্দ তারিখের চাঁদের আলো রাতের অন্ধকারের অনেকটাই দূর করে দিয়েছিল। দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। আমি মসজিদ থেকে বের হয়ে পকেট থেকে রেডিও বের করলাম। মুজাহিদদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম। ড্রোন ও হেলিকপ্টারগুলো ক্রমেই কাছে ঘুরছিল। বোমা ও গুলির শব্দ প্রতি মুহূর্তে তীব্রতর হচ্ছিল। মুজাহিদরা সবাই আল্লাহর নাম নিয়ে চিৎকার করছিলেন এবং একে অপরকে জানাচ্ছিলেন যে, পাহারার অবস্থানে থাকা মুজাহিদরা চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়েছেন।
সবাই সম্মুখসারিতে থাকা মুজাহিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের অবস্থা জানতে এবং তাঁদের কণ্ঠস্বর শুনতে চাইছিলেন।
আমি বাড়িতে ফিরে এলাম। আমার উদ্বিগ্ন অবস্থা দেখে মা জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে?”
আমি বললাম,
“মা, আমি জানি না। উপত্যকার নিচের দিকে যুদ্ধ হচ্ছে, কিংবা হয়তো কারও ওপর হামলা হয়েছে।”
মা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“বালুচের ওপর হামলা হয়েছে?”
আমি দ্রুত উত্তর দিলাম,
“না মা। উপত্যকার নিচের দিকে হচ্ছে। ড্রোন, হেলিকপ্টার ও বি-৫২ বিমান প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করছে।”
আমি রেডিও বন্ধ করে দিলাম। ছেলের পরিণতি নিয়ে মাকে আর উদ্বিগ্ন করতে চাইছিলাম না। আমি নামাজের বাকি অংশ শেষ করলাম। মা ঘরে এসে আমার পাশে বসলেন। আমি নামাজ শেষ করে মাথা ঘোরানোর আগেই তিনি আবার বললেন,
“বালুচের সঙ্গে যোগাযোগ করো। ওদের ওপর হামলা হচ্ছে!”
আমি রেডিও মুখের কাছে এনে ডাকলাম,
“বালুচ! শুনতে পাচ্ছ? বালুচ!”
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
“শুনতে পাচ্ছি, আহমাদি। কথা বলার সময় নেই। আলহামদুলিল্লাহ, সবাই ভালো আছে। আমাদের জন্য দোয়া করো!”
এই কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কথা মায়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি আমাকে বললেন,
“দেখলে, ওদের ওপরই হামলা হচ্ছে!”
আমি বললাম,
“না মা, ওদের ওপর নয়।”
আমি ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে গেলাম। অন্যরাও বালুচ ও তার সঙ্গীদের খোঁজখবর নিচ্ছিল। আমরা সম্মুখসারিতে থাকা একজন মুজাহিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। তিনি জানালেন, সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু তখনো বোমাবর্ষণ থামেনি। ড্রোন, হেলিকপ্টার ও বি-৫২ বিমান একের পর এক আঘাত হানছিল।
আমি আবার রেডিওর দিকে মনোযোগ দিলাম। মুজাহিদরা একে অপরকে ডাকছিলেন,
“আমাদের ভাইয়েরা সম্মুখসারিতে রয়েছে, কিছু একটা করো!”
কিন্তু প্রতিটি বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগের ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠছিল। আমার হৃদয়ের এক কোণে ভয় ইতিমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। তবু নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছিলাম, বালুচ ও তার বন্ধুরা হয়তো নিরাপদেই আছে।
আমি আবার ঘরে ফিরে নিজের রাইফেল তুলে নিলাম। বাড়ি থেকে বের হয়ে রাইফেলের জন্য পড়ে থাকা পুরোনো গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে চাচ্ছিলাম, যাতে সেগুলো সম্মুখসারির মুজাহিদদের কাছে নিয়ে গিয়ে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু মা আমার হাত ধরে দৃঢ়ভাবে বললেন,
“আল্লাহর ওয়াস্তে, তুমি যেয়ো না!”
মা যখন আমার হাত ধরেছিলেন, তখন তিনি কেবল ছেলেকে বাড়ি থেকে বের হতে বাধা দিচ্ছিলেন না। সেটি ছিল এক উদ্বিগ্ন মায়ের হৃদয়ের আর্তনাদ, যিনি নিজের হৃদয়ের আরেকটি টুকরোকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চাননি।
আমি তাঁকে বললাম,
“আচ্ছা মা, আমি যাব না। আপনিও বাইরে যাবেন না।”
বোমাবর্ষণ চলতেই থাকল। ড্রোন হামলা ও বি-৫২ বিমানের শব্দ কখনো কাছে আসছিল, কখনো দূরে সরে যাচ্ছিল। বিমানগুলো পরপর দুটি ভারী বোমা মুজাহিদদের ওপর নিক্ষেপ করল। রাতের নীরবতা আবারও ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল।
আমি আবার রেডিওর দিকে মনোযোগ দিলাম। হঠাৎ এক মুজাহিদের কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“আমাদের সঙ্গীরা শহিদ হয়েছেন! কোনো মুজাহিদ নিজের অবস্থান ছেড়ে যাবে না!”
কথাগুলো বজ্রপাতের মতো আমার হৃদয়ে আঘাত করল। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার চিন্তাশক্তি যেন থমকে গেল। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। একদিকে ভাইয়ের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগের আগুন জ্বলছিল, অন্যদিকে মা আমার পাশেই বসে বারবার বালুচের খোঁজ করছিলেন।
মা আবার জানালার দিকে ঝুঁকে বললেন,
“ওদের ডাকো। বালুচ ও তার সঙ্গীদের অবস্থা জিজ্ঞেস করো!”
আমি বললাম,
“মা, তারা নিচে আছে আর ওপর থেকে বোমাবর্ষণ হচ্ছে। এখনো নিশ্চিত কোনো খবর পাওয়া যায়নি। প্রথমে নিচের এলাকায় বোমা ফেলেছে, আর এখন দাদাল উপত্যকায় হামলা চালিয়েছে। বাইরে যাবেন না। ঘরের ভেতরেই থাকুন। কিছু হয়নি।”
কিন্তু মাকে আশ্বস্ত করার জন্যই আমি এসব বলছিলাম। আমার অন্তরে সত্যটা আগুনের মতো জ্বলছিল। কীভাবে মাকে বলতাম, তাঁর হৃদয়ের টুকরা, তাঁর প্রিয় বালুচ হয়তো মৃত্যুর মুখোমুখি? কীভাবে তাঁর ছেলের শাহাদাতের সংবাদ তাঁর কাছ থেকে গোপন রাখতাম, যখন সেই চিন্তাতেই আমার নিজের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল?
আমি রেডিও চালু রেখেও থাকতে পারছিলাম না, আবার এর শব্দগুলো উপেক্ষা করতেও পারছিলাম না। প্রতিটি মুহূর্তে কান পেতে বালুচের কণ্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করছিলাম। আশা করছিলাম, আবারও তার কণ্ঠ শুনতে পাব। সে আবার বলবে, “আহমাদি! সবাই ভালো আছে।”
কিন্তু সেই রাত কেটে গেল আশা ও উদ্বেগের দোলাচলে। এক মুহূর্তে আশার আলোয় হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল, পরক্ষণেই বোমার বিস্ফোরণ সেই আলোকে ভয়ের অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছিল।
রাতটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। একদিকে আমার ভাইয়ের সম্মুখসারিতে হামলা চলছিল, অন্যদিকে মা আমার হাত ধরে রেখেছিলেন, বাইরে যেতে দিচ্ছিলেন না। ভাইকে সাহায্য করার মতো সামর্থ্যও ছিল না, আবার মাকে সত্যটা বলার মতো মনোবলও পাচ্ছিলাম না। হৃদয়ের যন্ত্রণা ঠোঁট পর্যন্ত আসছিল না, আর চোখের উদ্বেগও মায়ের কাছ থেকে লুকানো যাচ্ছিল না।
এভাবেই দখলদারদের ভয়াবহ বোমাবর্ষণের ছায়ায় পুরো রাত কেটে গেল।
অবশেষে সকাল হলো।
রাতের ভয়াবহ শব্দগুলো ভোরের নীরবতায় হারিয়ে গেল। কিন্তু এটি শান্তির নীরবতা ছিল না; বরং এক মহাবিপর্যয় আসন্ন হওয়ার সংকেত ছিল। আমরা ফজরের নামাজ আদায় করে বড় ভাইয়ের সঙ্গে পাহারার অবস্থানের দিকে রওনা হলাম। রাতের বোমাবর্ষণ ও হামলার খবর যে জায়গা থেকে আমাদের কাছে পৌঁছেছিল, আমাদের সমস্ত আশা যে স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, আমরা সেদিকেই এগিয়ে চললাম।
অন্যরা জানাল, সেখানে আমাদের সঙ্গীরা শহিদ হয়েছেন।
আমরাও শহিদদের দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে হৃদস্পন্দন যেন আরও বেড়ে যাচ্ছিল। অসংখ্য প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। বালুচ কি তাঁদের মধ্যে আছে? সে কি নিরাপদে ফিরে এসেছে? আগের রাতে বলা তার শেষ কথাগুলোই কি সত্যিই এই জীবনে তার শেষ কথা ছিল?
আমরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই গ্রামের অন্য মুজাহিদরা, যুবক ও বয়োজ্যেষ্ঠরা, সেখানে এসে গিয়েছিলেন। তাঁরা শহিদদের বহন করে মসজিদের বারান্দায় শুইয়ে রেখেছিলেন।
আমরা কাছে এগিয়ে গেলাম।
শহিদদের মধ্যে সেও শুয়ে ছিল। সেই দীর্ঘদেহী যুবক, যে জিহাদের ভালোবাসায় উন্মত্ত ছিল, যার চোখ ছিল কালো ও আকর্ষণীয়। গতকালই যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মায়ের হাতে একটি সাদা কাপড় তুলে দিয়েছিল, নিজের শাহাদাতের কথা বলেছিল এবং জানিয়েছিল, মায়ের সঙ্গে এটাই তার শেষ দেখা।
হ্যাঁ, মাতিউল্লাহ বালুচও রক্তাক্ত অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেছিল।
সেই রাত, যে রাতে মা ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভারী রাত হয়ে রইল। আগের সন্ধ্যায় যে ছেলে কালিমা লেখা সাদা কাপড়টি মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল, এখন সে মসজিদের বারান্দায় শুয়ে আছে, শাহাদাতের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত।
সেই রাতের কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কথা আবারও আমার মনে ফিরে এল,
“মা, এই কালিমাটি আপনার কাছে রেখে দিন। আমি শহিদ হলে এটি আমার মাথায় পেঁচিয়ে দেবেন।”
আমার মায়ের নীরবতার কথাও মনে পড়ল। ছেলের কথাগুলো শোনার পর তিনি যে নীরবতা বেছে নিয়েছিলেন। হয়তো তাঁর হৃদয় আগেই এই বিচ্ছেদের আগমনী সংকেত অনুভব করেছিল। কিন্তু একজন মায়ের হৃদয়ও চায় না, তাঁর ছেলের নিজের মুখে বলা কথাগুলো সত্য হয়ে উঠুক।
কিন্তু জীবনে কখনো কখনো এমন মুহূর্ত আসে, যখন মানুষের সব আশা তাকদিরের সামনে নীরব হয়ে যায়।
সেই রাতের বোমাবর্ষণ ও হামলার ঝড়ের পর মাতিউল্লাহ বালুচ আর কখনো মায়ের ডাকে সাড়া দিতে পারেনি। যে কণ্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায় তাঁর মা সারা রাত কাটিয়েছিলেন, তা চিরতরে নীরব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর শেষ কথাগুলো, মায়ের হাতে তুলে দেওয়া সাদা কাপড় এবং মসজিদের বারান্দায় শাহাদাতবরণকারী তাঁর দেহের দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে এমন এক স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল, যা কখনো মুছে যাওয়ার নয়।





















