বিশ্বের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক, কূটনৈতিক সাফল্য ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে আফগানিস্তানের অবস্থান
নিরাপত্তা জোরদার করা, শাসনব্যবস্থাকে সুসংহত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথে অগ্রসর হওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণের পর ইসলামী ইমারাতে আফগানিস্তান (আইইএ) একটি সক্রিয় ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতির ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা। কিছু গণমাধ্যম আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দেশ হিসেবে তুলে ধরে যে অপপ্রচার চালায়, তার বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, প্রতিবেশী দেশ ও অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আফগানিস্তানের বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে এবং তা ক্রমেই বাড়ছে। এসব সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনীতি, বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত তা সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্তমানে আফগানিস্তান বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে সক্রিয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক চাপ ও ব্যাংকিং খাতে বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও দেশটির বাণিজ্যের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। আফগানিস্তানের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে প্রধানত কৃষিপণ্য, খনিজ সম্পদ ও হস্তশিল্প রয়েছে, যা আঞ্চলিক বাজার ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য বাজারেও পৌঁছাচ্ছে। অন্যদিকে, বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও আফগানিস্তানের বাজার বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে আকর্ষণীয় রয়ে গেছে। বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছেন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী ইমারাতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আফগানিস্তানের বেসরকারি খাত এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে কয়েক ডজন সমঝোতা স্মারক ও বাণিজ্যিক এবং বিনিয়োগ চুক্তি সম্পাদনের ভিত্তি তৈরি করেছে। এসব চুক্তির আওতায় খনিজ সম্পদ, কৃষি, শিল্প ও পণ্য পরিবহনের মতো খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতি আঞ্চলিক অংশীদারদের উল্লেখযোগ্য আস্থার প্রতিফলন।
কলকারখানা ও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য শিল্পাঞ্চলের জমি বরাদ্দ এবং বিভিন্ন খাতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সম্প্রসারণের পথ তৈরি হয়েছে। এসব অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু আফগানিস্তানের জন্যই উপকারী নয়; বরং সমগ্র অঞ্চলের জন্যও কল্যাণকর। কারণ, আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অগ্রগতিতেও সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ইসলামী ইমারাতের অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেলপথে পরিবাহিত আফগানিস্তানের আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিকল্প পথ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রুটের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে আফগানিস্তান ধীরে ধীরে আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন করিডরে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। বর্তমানে হাইরাতান, আকিনা, তুরগুন্দি ও খাফ-হেরাতসহ বিভিন্ন রুট দিয়ে পণ্য প্রতিবেশী দেশগুলো এবং আরও দূরবর্তী বাজারে পৌঁছাচ্ছে। পরিবহনের এই বহুমুখী ব্যবস্থা আফগানিস্তানের ট্রানজিট-সংশ্লিষ্ট অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে দেশটির ভূমিকা বাড়িয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তুর্কমেনিস্তানের প্রাকৃতিক গ্যাস আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ও ভারতে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গৃহীত টিএপিআই প্রকল্পের কাজ আফগান ভূখণ্ডে চলমান রয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সিএএসএ-১০০০-এর লক্ষ্য হলো কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান থেকে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।
আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা এবং আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে ইসলামী ইমারাত এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। এসব প্রকল্প শুধু দেশের অর্থনৈতিক সুবিধাই বয়ে আনবে না; বরং আফগানিস্তানকে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করবে।
এতসব অগ্রগতি সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিছু ব্যক্তি, শত্রুভাবাপন্ন গণমাধ্যম এবং বিদেশি রাজনৈতিক মহল আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন বলে দাবি করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তারা দেশটির সঙ্গে বিদ্যমান বিস্তৃত সম্পর্কগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আফগানিস্তান যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হতো, তাহলে এতগুলো দেশের সঙ্গে সক্রিয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখত? আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে কয়েক ডজন সমঝোতা স্মারক ও বাণিজ্যিক চুক্তি কীভাবে সম্পাদিত হতো? কিংবা একাধিক দেশের সহযোগিতায় টিএপিআই ও সিএএসএ-১০০০-এর মতো বড় প্রকল্পগুলোর কাজই বা কীভাবে দেশটির ভূখণ্ডে এগিয়ে চলত?
আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার দাবি মূলত একটি রাজনৈতিক বয়ান, যা নিজেদের স্বার্থসন্ধানী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো প্রচার করে থাকে। এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো বাস্তবতা নয়। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে নিজেদের অবৈধ স্বার্থ হাসিল করতে ব্যর্থ হয়ে এসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো এবং বাস্তবতাকে বিকৃত করার আশ্রয় নেয়। কখনো তারা নিজেরাই রাজনৈতিক ভাষ্য প্রকাশ করে, আবার কখনো নিজেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে এসব প্রচারণা চালায়। তাদের ভিত্তিহীন অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো সামঞ্জস্য নেই।
জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাহায্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলাও ইসলামী ইমারাতের আরেকটি কূটনৈতিক অর্জন।
ইসলামী ইমারাত বারবার জানিয়েছে, মানবিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। তবে এই সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি। এই নীতিগত অবস্থান ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক সীমার বাইরের বহু দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। ফলে ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের পথ তৈরি হচ্ছে।
আজ বিরোধীদের অপপ্রচারের বিপরীতে আফগানিস্তান বিশ্বের প্রান্তে পড়ে নেই; বরং আঞ্চলিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এটি ইসলামী ইমারাতের পরিমিতিবোধ, দূরদর্শিতা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতির অন্যতম অর্জন।





















