তাকফির এবং মুসলমানদের সম্পর্কে চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি
খাওয়ারিজদের সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো, মুসলমানদের প্রতি তাদের চরমপন্থী আচরণ এবং তাঁদের ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত মনে করা। তাদের দৃষ্টিতে কখনো কখনো এমন কোনো গুনাহ কিংবা বিরোধিতাও একজন মুসলমানকে কাফির সাব্যস্ত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা প্রকৃতপক্ষে মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।
বর্তমান যুগেও আমরা এ অবস্থার বাস্তব চিত্র দেখতে পাচ্ছি। এই পথভ্রষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষুদ্র দলটি ছাড়া পৃথিবীর বাকি সব মুসলমানকে কাফির মনে করে। তারা বলে, “মুরতাদদের (মুসলমানদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করার পর আমরা কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” প্রকৃতপক্ষে, এই চরমপন্থী চিন্তাধারাই মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পথ তৈরি করে। কারণ, তারা নিজেদের দল ছাড়া বাকি সব মুসলমানকে কাফির কিংবা মুরতাদ মনে করে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
«يَقْتُلُونَ أَهْلَ الْإِسْلَامِ، وَيَدَعُونَ أَهْلَ الْأَوْثَان»
[সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৪৪]
“তারা মুসলমানদের হত্যা করবে এবং মূর্তিপূজারীদের ছেড়ে দেবে।”
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, খাওয়ারিজদের বড় ধরনের ভ্রষ্টতার একটি হলো মুসলমানদের সঙ্গে কঠোর ও সহিংস আচরণ করা। এমনকি তারা মুসলমানদের রক্তের পবিত্রতারও পরোয়া না করে তাঁদের হত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। অথচ পবিত্র কোরআন অন্যায়ভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,
«وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا…»
[সূরা আন-নিসা: ৯৩]
“আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার প্রতিফল হলো জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে…”
একইভাবে, কোনো মুসলমানকে অযথা কাফির আখ্যা দেওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
«إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِأَخِيهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهِ أَحَدُهُمَا»
[সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১০৩]
“যখন কোনো ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে বলে, ‘হে কাফির!’ তখন এ অপবাদ তাদের দুজনের একজনের ওপর বর্তায়।”
এই হাদিসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি স্পষ্ট করে যে, কোনো মুসলমানকে কাফির আখ্যা দেওয়া মামুলি কোনো বিষয় নয়, যে কেউ নিজের ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাকফির একটি গুরুতর শরয়ি বিধান। এর জন্য সুস্পষ্ট শরয়ি দলিল এবং স্বীকৃত শর্তাবলির উপস্থিতি আবশ্যক। তবে এর অর্থ কুফর ও ঈমানের বিধান অস্বীকার করা নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফির সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত আবেগ, ব্যক্তিগত মতবিরোধ কিংবা ভুল বোঝাবুঝির ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। ইসলামের আলেমগণ এ বিষয়ে কোনো কথা বা কাজ কুফরি হওয়া এবং নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে কাফির সাব্যস্ত করার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সুস্পষ্ট করেছেন।
এ কারণেই খাওয়ারিজদের সম্পর্কে হাদিস থেকে প্রাপ্ত মৌলিক শিক্ষাগুলোর একটি হলো, দ্বীনি চেতনার পাশাপাশি জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও সতর্কতাও অপরিহার্য। যে ব্যক্তি চিন্তাগত, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কারণে সহজেই মুসলমানদের তাকফির করে এবং তাঁদের রক্ত ও সম্পদের পবিত্রতার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না, সে এক বিপজ্জনক পথে অগ্রসর হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ যে পথ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, এটি সেই পথই।
অতএব, খাওয়ারিজদের এসব বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য কেবল একটি ঐতিহাসিক গোষ্ঠী সম্পর্কে অধ্যয়ন করা নয়; বরং এর মধ্যে সব মুসলমানের জন্যও একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। তা হলো, ঈমান ও কুফরের বিষয়ে তাড়াহুড়ো, চরমপন্থা এবং জ্ঞান ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। পাশাপাশি পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে স্বীকৃত শরয়ি মূলনীতি এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা।





















