রামাদান: তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম
আরও একবার রামাদানুল মুবারক—আল্লাহ তায়ালা জাল্লা জালালুহুর মেহমানদারির মাস আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে। এটি সেই মাস যাতে রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। এটি এমন এক মাস যাতে মুমিনের শ্বাস নেওয়া তসবীহ এবং ঘুম ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এই মাসটি নিজের সত্তার দিকে ফিরে আসার এবং নিজের অস্তিত্বে তাকওয়ার এক সুউচ্চ ইমারত নির্মাণের এক অসাধারণ সুযোগ।
আল্লাহ তায়ালা জাল্লা জালালুহু প্রথম আয়াতে, যেখানে রোযার বিধান দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই মহান ইবাদতের হিকমত বা রহস্য এভাবে স্পষ্ট করেছেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ (আল-বাকারা: ১৮৩)
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল, যেন তোমরা পরহেজগার (তাকওয়াবান) হতে পারো।
রোযার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়ার উচ্চ শিখরে পৌঁছানো। তাকওয়া হলো সেই চিরজাগ্রত অবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ নজরদারি যা মানুষকে নাফরমানি থেকে বাঁচায় এবং আল্লাহ তায়ালা জাল্লা জালালুহুর আদেশের আনুগত্যের দিকে পরিচালিত করে। রোযা—এই অতুলনীয় ইবাদত আমাদের ভেতরে এই মূল্যবান গুণটি গড়ে তোলার একটি ব্যবহারিক ক্ষেত্র।
আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদিসে ইরশাদ করেছেন:
«الصَّوْمُ جُنَّةٌ»
অর্থাৎ: “রোযা একটি ঢাল।” রোযা সেই বর্মের মতো যা মানুষকে গুনাহ থেকে রক্ষা করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়।
যেভাবে একটি ঢাল যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর তীর ও আঘাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে, তেমনি রোযাও নফসের খাহেশ (প্রবৃত্তি) এবং শয়তানের কুমন্ত্রণার মোকাবিলায় একজন মুমিনকে গুনাহ ও মন্দ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। এই ঢাল শুধু গুনাহর বিরুদ্ধেই নয়, বরং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচারও মাধ্যম।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য একটি হাদিসে বলেছেন:
«مَا مِنْ عَبْدٍ يَصُومُ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا بَاعَدَ اللَّهُ بِذَلِكَ الْيَوْمِ وَجْهَهُ عَنْ النَّارِ سبعِينَ خَرِيفًا»
অর্থাৎ: এমন কোনো বান্দা নেই যে আল্লাহর পথে একদিন রোযা রাখে, আর আল্লাহ তায়ালা সেই একদিনের বিনিময়ে তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে সরিয়ে না দেন।
এভাবে রোযা আমাদের এবং জাহান্নামের মাঝে একটি নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করে দেয়, আর এটাই সেই মহাসাফল্য যা প্রতিটি মুমিন অনুসন্ধান করে।
কিন্তু এই ঢাল আমাদের কীভাবে বাঁচায়?
রোযা ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে অবাধ্য প্রবৃত্তিগুলোকে দুর্বল করে এবং মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করে। যে ব্যক্তি এক মাস ধরে হালাল জিনিস—যেমন পানি, খাবার এবং নিজ স্ত্রীর সান্নিধ্য থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে, সে রামাদানের পরেও হারামের মোকাবিলায় অবিচল থাকতে পারে। এই নিরন্তর অনুশীলন মানুষের ভেতরে তাকওয়ার গুণকে সুদৃঢ় ও প্রোথিত করে দেয়।
তাজকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি, যা এই পুরো প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য, তা এই ব্যবহারিক চর্চা ছাড়া সম্ভব নয়। রামাদানুল মুবারক হলো আত্মোপলব্ধি এবং আত্মসংশোধনের মাস; এমন এক মাস যাতে মানুষ রিয়াজত বা সাধনার মাধ্যমে নিজের নফসকে পবিত্র করে। রেওয়ায়েতে এসেছে যে, সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ, আর রোযা হলো সেই ‘জিহাদে আকবর’-এর ব্যবহারিক ময়দান।
তাই আসুন, এই বরকতময় মাসে বিশুদ্ধ নিয়ত এবং সুদৃঢ় সংকল্পের সাথে এই সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করি; নিজের ভেতরে তাকওয়ার ভিত্তি মজবুত করি এবং নিজেকে মন্দ অভ্যাস ও গুনাহর শিকল থেকে মুক্ত করি, যাতে এই মাসের শেষে আমরা এক পবিত্র হৃদয় এবং অধিকতর প্রস্তুত আত্মার সাথে জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে পারি।
এটিও মনে রাখা উচিত যে, রোজা মানে কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ»
অর্থ: যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং মন্দ কাজ ত্যাগ করল না, আল্লাহর কাছে তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
প্রকৃত রোযা হলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোযা। চোখের রোযা হলো হারাম দৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকা, জিহ্বার রোযা মিথ্যা ও গীবত থেকে বিরত থাকা, কানের রোযা বাতিল বা অনর্থক কথা পরিহার করা এবং হৃদয়ের রোজা হলো প্রতিটি সেই বিষয় থেকে পবিত্র হওয়া যা আল্লাহ তায়ালার অপছন্দ। অতএব, আসুন এই পবিত্র মাসে পূর্ণ সচেতনতা ও ইখলাসের সাথে রোযা পালন করি, যাতে তাকওয়ার মিষ্টতা কেবল রামাদানেই নয়, বরং সারা জীবনে অর্জিত হয়।





















