বেলুচিস্তান—যে ভূমি এক বিস্তৃত প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার; এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে বৃহৎ, তবু সবচেয়ে পেছনে পড়ে থাকা, বঞ্চিত এবং উপেক্ষিত প্রদেশ হিসেবে বিবেচিত। এই সুবিস্তৃত ও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন অঞ্চলটি বেলুচ জাতির ঐতিহাসিক আবাসভূমি; এক নীতিবান, মর্যাদাসম্পন্ন ও আত্মসম্মানশীল জাতি, যারা বহু দশক ধরে তাদের জাতীয় পরিচয়, তাদের ভূমির প্রাকৃতিক ভান্ডার এবং তাদের মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
যদিও বেলুচিস্তানের মাটি সোনা, গ্যাস, তামা, কয়লা এবং অসংখ্য মূল্যবান খনিজে পূর্ণ, তবু এখানকার অধিবাসীরা আজও দারিদ্র্য, বৈষম্য, হিংসা এবং সংগঠিত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখোমুখি। নেই মানসম্মত শিক্ষা, নেই স্বাস্থ্যসেবা, নেই বিশুদ্ধ পানি, নেই কর্মসংস্থানের সুযোগ, এমনকি নেই রাজনৈতিক স্বাধীনতাও; এই সমস্ত অবরোধ বেলুচ জনগণকে বাধ্য করে, তাদের মহিমান্বিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সম্মানজনক জীবনের জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে।
বেলুচ জাতি দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক বঞ্চনা ও চাপানো নীরবতার শিকারে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এবং সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে, অথচ এই ভূমির প্রকৃত অধিবাসীদের মতামতকে কোনো বাস্তব গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
যে সকল বেলুচ নেতা জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলেন কিংবা নির্যাতনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলেন, তারা চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হন। অনেকেই অপহৃত হন, কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন কিংবা রহস্যজনক পরিস্থিতিতে প্রাণ হারান। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে রিপোর্ট করে আসছে যে, পাকিস্তানে জোরপূর্বক গুমের সর্বাধিক ঘটনা ঘটে বেলুচিস্তানেই; এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর পেছনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আইএসআই ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়।
যে রাজনৈতিক পরিবেশে সংলাপ, নির্বাচন এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার অনুপস্থিত, সেই পরিবেশ যুবকদের এমন পথে ঠেলে দেয়, যার পরিণতি হয় চরমপন্থা, বিদ্রোহ ও সশস্ত্র প্রতিরোধে ঝুঁকে পড়া। তাদের এই সংগ্রাম ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং অস্তিত্বরক্ষা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং এক নির্যাতিত জাতির আত্মমর্যাদার প্রতিরক্ষা।
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে ধনী প্রদেশ; যেখানে সোনা, তামা, কয়লা, গ্যাসসহ অসংখ্য প্রাকৃতিক সম্পদ বিদ্যমান। কিন্তু দু:খজনক সত্য হলো, এই ধনভান্ডার ভূমির প্রকৃত মালিকদের কাছে পৌঁছায় না; বরং তা প্রবাহিত হয় কেন্দ্রীয় সরকার, সামরিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল এবং আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের কোষাগারে। বেলুচ জনগণ নিজেদের ভূমি থেকে উত্তোলিত সম্পদের সুফল থেকে বঞ্চিত, অথচ এখান থেকে প্রতি বছর অগণিত সম্পদ লুটে নেওয়া হয়।
এই অর্থনৈতিক বৈষম্য এক প্রকাশ্য শোষণমূলক নীতি, যা জনগণকে কেবল দরিদ্রতরই করেনি, বরং রাষ্ট্র, তার কাঠামো ও কেন্দ্রীয় আধিপত্যের প্রতি ক্ষোভ ও অবিশ্বাসকেও আরও গভীর করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার উল্লেখ করেছে যে, পাকিস্তানী নিরাপত্তা বাহিনী বেলুচিস্তানে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, সাংবাদিক এমনকি যে-ই সাহস করে কণ্ঠ উঁচু করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
সাধারণ মানুষদের কোনো বিচার ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়; বছরের পর বছর তারা নিখোঁজ থাকেন, নির্যাতনের শিকার হন এবং অনেকেই প্রাণ হারান। যারা নিখোঁজ হন, তাদের মৃতদেহ পাওয়া গেলে তা হয় ভয়াবহ নির্যাতনের চিহ্নে ভরা, অথবা অনেক সময় আর কোনোদিনও তাদের সন্ধান মেলে না। এসব জোরপূর্বক গুমের পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়। এটি কেবল মানব মর্যাদার অবমাননা নয়; বরং এক সমগ্র জাতিকে মানসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ে নিমজ্জিত করার উপায়।
বেলুচিস্তানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে। যে কেউ, চাই সে রাজনৈতিক কর্মী হোক, লেখক, ছাত্র বা সাধারণ নাগরিক—যদি তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা বলে, তাকে সাথে সাথে “বিচ্ছিন্নবাদী” বা “সন্ত্রাসী” বিশেষণে চিহ্নিত করা হয়।
এটি পাকিস্তানের সামরিক কাঠামোর এক সুপরিকল্পিত কৌশল—বেলুচ জনগণের ন্যায্য সংগ্রামকে কলুষিত করা, বিশ্বের দৃষ্টি প্রকৃত সমস্যার দিক থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং শক্তি প্রয়োগের জন্য একটি অজুহাত তৈরি করা। এই সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লেবেলের আড়ালে হাজারো মানুষ গ্রেফতার, নির্যাতিত এবং নিহত হয়েছে।
অতএব বলা যায়, বেলুচিস্তান কেবল সম্পদের ভূমি নয়; এটি এক নিপীড়িত, কিন্তু আত্মমর্যাদাশীল জাতির আবাসভূমি, যারা বহু দশক ধরে নিজের অধিকারের সংগ্রামে অবিচল। এ জাতিকে বুঝতে হবে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকারের সুরক্ষা কোনো অপরাধ বা সন্ত্রাস নয়; বরং এটি এক স্বাভাবিক, ন্যায্য ও মৌলিক মানবাধিকার। এই সচেতনতাই তাদের ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ, জাতীয় পরিচয়ের সংরক্ষণ এবং স্বৈরাচার থেকে মুক্তির দিশা তৈরি করবে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থার সেই নিষ্ঠুর নীতিসমূহর অন্তর্ভুক্ত জোরপূর্বক গুম, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক দমন এখন আর গোপন রাখা সম্ভব নয়। এসব বাস্তবতা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা জরুরি, যাতে স্পষ্ট হয় কিভাবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে এক সমগ্র জাতিকে তার প্রাকৃতিক অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, গণমাধ্যম এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রসমূহের কর্তব্য হলো এই সত্য প্রকাশ করা। এটি শুধুমাত্র বেলুচিস্তানের সমস্যা নয়, এটি বিশ্ব-সমাজের নৈতিক বিবেকেরও পরীক্ষা। এখন সময় এসেছে, বিশ্ব বেলুচ জনগণের কণ্ঠকে শুনুক, তাদের অধিকারের সুরক্ষায় পাশে দাঁড়াক এবং পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের অবিচারগুলো উন্মোচিত করুক। কারণ এখন নীরবতা আর সহনীয় নয়।




















