ইতিহাসের পাতায় উসমানি খিলাফত | সপ্তদশ পর্ব

✍🏻 হারিস উবায়দাহ

সুলতান বায়েজিদ প্রথম 
(৭৯১ – ৮০৫ হিজরি / ১৩৮৯ – ১৪০২ খ্রিস্টাব্দ)
সুলতান মুরাদের শাহাদাতের পর তাঁর পুত্র বায়েজিদ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি ছিলেন একজন সাহসী, ধৈর্যশীল, মহাজ্ঞানী এবং ইসলামি বিজয়ের প্রতি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ব্যক্তিত্ব। এ কারণেই তিনি সামরিক বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আনাতোলিয়ার খ্রিস্টান আমিরাতগুলোকে নিজের লক্ষ্যবস্তু বানান এবং সেই বছরের মধ্যেই প্রায় সবকটি আমিরাতকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। বায়েজিদ বলকান এবং আনাতোলিয়া উভয় রণাঙ্গনে বিদ্যুতের গতিতে আক্রমণ চালাতেন, যার ফলে তাঁকে “আল-সায়িকা” (বজ্রকণ্ঠ বা আসমানি বিদ্যুৎ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সার্বিয়া সম্পর্কে বায়েজিদের কৌশল
বায়েজিদ সার্বিয়ার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন, যদিও সার্ব জাতি উসমানীয়দের বিরুদ্ধে বলকান জোটের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। বায়েজিদের উদ্দেশ্য ছিল সার্বিয়াকে উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং হাঙ্গেরির মাঝে একটি দেয়াল হিসেবে ব্যবহার করা। বায়েজিদ এমন একজন বন্ধুর প্রয়োজন অনুভব করছিলেন, যিনি এশিয়া মাইনরে ইসলামি ও তুর্কি সেলজুক আমিরাত সংক্রান্ত তাঁর নতুন সামরিক কৌশলে সহায়ক হতে পারেন।

এই উদ্দেশ্যে বায়েজিদ সার্বদের সাথে এই মর্মে একমত হন যে, কসোভোর যুদ্ধে নিহত রাজা (লাজার)-এর দুই পুত্র সার্বিয়ার এলাকাগুলোতে স্থানীয় রীতিনীতি, আইন ও ঐতিহ্য অনুযায়ী শাসন করবেন। তবে শর্ত ছিল যে, তারা উসমানী সাম্রাজ্যের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবেন, কর (খারাজ) প্রদান করবেন এবং যুদ্ধের সময় সুলতানের বাহিনীকে একটি পৃথক সেনাদল হিসেবে সামরিক সহায়তা প্রদান করবেন। সুলতান এই চুক্তিকে আরও সুদৃঢ় করতে রাজা লাজারের কন্যাকে বিবাহ করেন।

উসমানী সরকারের কাছে বুলগেরিয়ার পরাজয়
সার্বদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের পর, ৭৯৭ হিজরি / ১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দে বায়েজিদ দ্রুত বুলগেরিয়ার দিকে অগ্রসর হন এবং তা জয় করেন। তিনি বুলগেরিয়ার রাজনৈতিক স্বাধীনতা চিরতরে খতম করে দেন। বুলগেরিয়ার পতনের পর পুরো ইউরোপে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো সুলতান মুরাদের রেখে যাওয়া প্রতাপে প্রকম্পিত হয়। ক্রুসেডার ও খ্রিস্টান বাহিনী অনিচ্ছা সত্ত্বেও একত্রিত হয় যাতে বলকান থেকে উসমানীয়দের নাম-নিশানা মুছে ফেলা যায়।

উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান ও ক্রুসেডার জোট
হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমুন্ড এবং নবম পোপ বোনিফেস উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি ক্রুসেডার ও খ্রিস্টান ইউরোপীয় জোট গঠনের অভিযান শুরু করেন। এটি ছিল চতুর্দশ শতাব্দীতে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে গঠিত জোটগুলোর মধ্যে বৃহত্তম। কারণ এই জোটে আগের তুলনায় অনেক বেশি রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তারা অস্ত্র, অর্থ ও সৈন্য সংগ্রহে একে অপরকে পূর্ণ সহযোগিতা করেছিল। এই ক্রুসেডার অভিযানে প্রায় ১,২০,০০০ যোদ্ধা শামিল ছিল, যারা জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড এবং অন্যান্য দক্ষিণ অঞ্চল থেকে এসেছিল।

৮০০ হিজরি / ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডার বাহিনী হাঙ্গেরির দিকে রওনা হয়, কিন্তু যুদ্ধের আগেই সেনাপতিদের সাথে রাজা সিগিসমুন্ডের মতবিরোধ দেখা দেয়। সিগিসমুন্ড চাচ্ছিলেন ক্রুসেডাররা অপেক্ষা করুক এবং উসমানীয়রা আগে আক্রমণ করলে তারপর তারা পাল্টা যুদ্ধ শুরু করুক। কিন্তু বাকি কমান্ডাররা অপেক্ষা করতে অস্বীকার করে।

তারা অবিলম্বে আক্রমণের নির্দেশ দেয়। তারা দানিউব নদী অতিক্রম করে উত্তর বলকানের নিকোপোলিস (Nicopolis) পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং শহরটি ঘেরাও করে। শুরুতে তারা উসমানী বাহিনীর ওপর কিছুটা আধিপত্য বিস্তার করলেও, যখন সুলতান বায়েজিদ প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে রণক্ষেত্রে আবির্ভূত হন, তখন দৃশ্যপট বদলে যায়।

যদিও উসমানীয় সৈন্যসংখ্যা ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের তুলনায় কম ছিল, কিন্তু সামরিক শৃঙ্খলা ও সংহতির দিক থেকে তারা শ্রেষ্ঠ ছিল। খ্রিস্টান বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়; অনেকে নিহত হয় এবং তাদের অনেক বড় বড় সেনাপতি জীবিত বন্দী হয়।

এই যুদ্ধে উসমানীয়রা প্রচুর গণিমতের মাল এবং শত্রুদের বিশাল রসদ কব্জা করে। বাহিনীর এই অভাবনীয় সাফল্যে সুলতান বায়েজিদ গর্বভরে ঘোষণা করেন, “আমি ইতালি জয় করব এবং রোমের সেন্ট পিটার্স চার্চের বেদিতে আমার ঘোড়াকে যব খাওয়াব।”

Exit mobile version