মানবিক আইনের একটি পুনঃপরীক্ষা!

✍🏻 ​আজমল গজনভী

কুনারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়টি কেবল স্থানীয় নিরাপত্তা সংবাদ নয়; বরং এটি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সেই গভীর সংকটের একটি পুনরাবৃত্তি, যেখানে আইন এবং বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার নামে যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আজ অনেক জনপদে এক কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন। এমন এক পরীক্ষা, যার উত্তর বইয়ের পাতায় নয়, বরং মানুষের রক্তের বিনিময়ে জমিনে লেখা হচ্ছে।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কুনার প্রদেশের বিভিন্ন অংশে মর্টার ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যার ফলে আসাদাবাদ শহর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে আরও ঘনীভূত করে; আন্তঃসীমান্ত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো কতটা মেনে চলা হচ্ছে এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বেসামরিক জীবনের সুরক্ষা আসলে কতটা অবশিষ্ট আছে?

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, বেসামরিক বসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো ইচ্ছাকৃত বা বেপরোয়া হামলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। জেনেভা কনভেনশন এবং এর অতিরিক্ত প্রোটোকলগুলো স্পষ্টভাবে জোর দেয় যে, সংঘাতের পক্ষগুলো বেসামরিক হতাহত রোধ করতে বাধ্য এবং যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের সময় ‘আনুপাতিকতা’ (proportionality) ও ‘পার্থক্যকরণের’ (distinction) নীতিগুলো অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। তবে সংঘাতের ভূগোল যত বিস্তৃত হচ্ছে, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অজুহাতে এই নীতিগুলো প্রায়ই লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং শক্তির ভাষার সামনে আইনের ভাষা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

এমন এক পরিবেশে যেখানে কোনো ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ কেবল সরকারি বার্তার ওপর নির্ভর করতে পারে না, সেখানে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি বড় ত্রুটি উন্মোচিত হয়, বিবৃতি, পারস্পরিক অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বয়ানের ভিড়ে সত্য প্রায়ই হারিয়ে যায়। প্রতিটি পক্ষ তাদের নিজস্ব ভাষ্য উপস্থাপন করে, অন্যদিকে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থাগুলো হয় দুর্বল, নয়তো ভূ-রাজনৈতিক চাপে সংকুচিত। এখানেই ন্যায়বিচারের ধারণাটি প্রশ্নের মুখে পড়ে: যদি সত্যই উদ্ভাসিত না হয়, তবে দায়বদ্ধতা কীভাবে সম্ভব?

আঞ্চলিক পর্যায়ে এ ধরনের ঘটনার প্রভাব কেবল শারীরিক ধ্বংসলীলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিণতি আরও অনেক গভীর। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ এক অনিয়মিত হুমকির ছায়ায় জীবন কাটায়, যার সময় এবং লক্ষ্যবস্তু অজানা। শিক্ষা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা—সবই প্রতিনিয়ত ভয়ের চাপে পিষ্ট হয়। এই পরিস্থিতি পর্যায়ক্রমে মানব উন্নয়নের স্বাভাবিক গতিপথকে ব্যাহত করে এবং পুরো জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনা পরাশক্তি ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। যখন স্বচ্ছ আইনি ব্যাখ্যা ছাড়াই আন্তঃসীমান্ত সামরিক অভিযান চালানো হয়, তখন তা কেবল প্রতিপক্ষের সন্দেহই বাড়ায় না, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির সেই সংবেদনশীল বিন্দু (flashpoints), যেখানে একটি ছোট ঘটনাই বড় কোনো সংকটের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে সমস্ত রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষণের আড়ালে একটি মৌলিক সত্য ধ্রুব থাকে; যুদ্ধের বোঝা সবসময় সাধারণ মানুষের কাঁধেই পড়ে। যে শিশুটি স্কুলের পাঠের বদলে বিস্ফোরণের গর্জন শোনে, যে পরিবারটি শান্তিপূর্ণ জীবনের পরিবর্তে বাস্তুচ্যুতির হুমকির মুখে পড়ে এবং যে সমাজ ভবিষ্যতের বদলে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে—এটাই প্রতিটি সামরিক কৌশলের গোপন মূল্য।

ঠিক এখানেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি উপস্থিত হয়। আন্তর্জাতিক আইনগুলো কি কেবল দাপ্তরিক নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তব ক্ষেত্রে সবার জন্য এগুলোর সমান মূল্য রয়েছে? আইন যদি কেবল দুর্বলের জন্য হয় আর শক্তি যদি বিশেষ ছাড়ের অধিকার দেয়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিটি অসমতার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে।

কুনারের ঘটনার মতো বিষয়গুলো আমাদের এই সিদ্ধান্তে নিয়ে যায় যে, সমসাময়িক বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক ঐক্যমত্য নয়, বরং আইনি মানদণ্ডের ব্যবহারিক প্রয়োগ। যতক্ষণ না বেসামরিক মানুষের জীবনকে সমস্ত কৌশলগত হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হবে, ততক্ষণ প্রতিটি শান্তি, ঘোষণা এবং চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা ক্ষণস্থায়ী হয়েই থাকবে। প্রতিটি সংঘাতের পর সেই মৌলিক প্রশ্নটিই আবার সামনে আসে, বিশ্ব কি কখনও ক্ষমতার বদলে আইনের ছায়ায় মানবতার পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি এই পৌনঃপুনিক ইতিহাস অন্তহীন যন্ত্রণার রূপ নিয়ে চলতেই থাকবে?

Exit mobile version