রাশিয়ার সাথে ইসলামি ইমারাতের চুক্তি নিয়ে কিছু মহল কেন উদ্বিগ্ন? ​

✍🏻 হাসসান মুজাহিদ

আফগানিস্তানের ইসলামি ইমারাত (IEA) এবং রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি নিকট ভবিষ্যতে আফগানিস্তানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশটিকে ব্যাপক সামরিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা অর্জনে সক্ষম করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইসলামি ইমারাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বারবার আশ্বস্ত করেছে যে, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না।

অতএব, রাশিয়া ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যদি উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং এটিকে নিজের জন্য হুমকি মনে করে, তবে সেই উদ্বেগ এই কারণে হতে পারে যে, তারা আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের কোনো ভালো ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য নেই। তাছাড়া, রাশিয়ার মতো একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী দেশের সাথে ইসলামি ইমারাতের সম্পর্ক বজায় রাখা তারা সহ্য করতে পারছে না বলে মনে হচ্ছে, কারণ এই ধরনের সম্পর্ক তাদের অবস্থানের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকতে আফগানিস্তান সরকারের নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধির বৈধ অধিকার রয়েছে।
ইসলামি ইমারাত ইসলামী নীতিমালা, জাতীয় স্বার্থ এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে রাশিয়া, চীন বা অন্য যেকোনো দেশের সাথেই হোক না কেন, সব দেশের সাথে উপযুক্ত এবং পারস্পরিকভাবে কল্যাণকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, রাশিয়ার এখন আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের ওপর আস্থা তৈরি হয়েছে। অতীতে মাদক পাচার, নিরাপত্তাহীনতা এবং আইএস (ISIS)-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগ ছিল। তবে ইসলামি ইমারাত তার সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই এই চ্যালেঞ্জগুলো প্রতিরোধ ও নির্মূল করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বেড়েছে এবং তাদের সম্পর্ক আগের চেয়ে আরও মজবুত হয়েছে।

কিছু বিরোধী মহল ইসলামি ইমারাতের সমালোচনা করে এই যুক্তি দেয় যে, অতীতে তালেবানরা পূর্ববর্তী সরকারগুলোর রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখাকে নিন্দা জানাত এবং ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করত; অথচ এখন তারা নিজেরাই রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখছে।

এই আপত্তির জবাবে বলা যায় যে, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সম্পর্ককে বিদেশি হস্তক্ষেপ শক্তিশালী করার হাতিয়ার এবং নিজেদের মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হিসেবে দেখা হতো। পক্ষান্তরে, ইসলামি ইমারাতের দাবি—তাদের বর্তমান সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং আফগানিস্তানের ভূখণ্ড রক্ষার তাগিদেই বজায় রাখা হচ্ছে।

শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে অমুসলিম দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা
ইসলামি ইমারাত এখন নিজের শাসনব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ ও সংঘাতের বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকাকে একটি তীব্র প্রয়োজনীয়তা মনে করে। একদিকে রয়েছে প্রয়োজন ও কল্যাণ, অন্যদিকে রাশিয়া ও ইসলামি ইমারাতের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া। অমুসলিমদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার বৈধতার ক্ষেত্রে বহু ইসলামি আইনবিদ (ফকিহ) এই দুটি শর্তেরই উল্লেখ করেছেন। সম্মানিত ফকিহগণ প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে, হুনায়নের যুদ্ধের দিন আল্লাহর রাসুল (সা.) সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছিলেন, অথচ সে সময় তিনি মুশরিক ছিলেন। একইভাবে, মক্কা বিজয়ের বছর বনু খুজাআ গোত্র কুরাইশদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সাথে যোগ দিয়েছিল, যদিও তারাও মুশরিক ছিল।

বৈধতার পক্ষে আরেকটি প্রমাণ হিসেবে কুজমানের ঘটনা উল্লেখ করা যায়, যিনি উহুদের যুদ্ধের দিন মুশরিক থাকা সত্ত্বেও সাহাবিদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি মুশরিকদের সারির তিনজন পতাকাবাহীকে হত্যা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছিলেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কখনো কখনো কোনো পাপাচারী ব্যক্তি দ্বারাও এই দীনকে সাহায্য করেন।”
সীরাত (নবীজির জীবনী) বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

Exit mobile version