ইতিহাসে কিছু মানুষের মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়; বরং তা নিজ যুগের এক গভীর ও ভয়াবহ বৈপরীত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। খলিলুর রহমান হাক্কানী—যিনি এক সময় বৈশ্বিক পরাশক্তির লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, যাঁর মাথার ওপর ঝুলছিল লক্ষ লক্ষ ডলারের পুরস্কার; শেষ পর্যন্ত শহীদ হন তাদেরই হাতে, যারা ইসলামের নামের আড়ালে মুসলিমদের বক্ষেই তরবারি বসায়। ইতিহাস এই নিম্নতাকে বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
যে হাত কোনো মুসলিমের দিকে ওঠে, সে হাত আগে নিজের ঈমানের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়, তারপর উম্মাহর অস্তিত্বের শিরা উপশিরা কেটে দেয়। তথাকথিত দাঈশি গোষ্ঠী, যারা নিজেদের দীনের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে, উম্মাহর এক ক্ষতের ওপর আরেক আঘাত বসিয়েছে। শত্রু বহু দশকের যুদ্ধেও যা করতে পারেনি, তারা এক মুহূর্তের ভ্রান্তিতে তা সম্পন্ন করেছে। এটি না ছিল জিহাদ, না ছিল বীরত্ব; বরং ছিল সেই সরল পথ থেকে প্রকাশ্য বিচ্যুতি, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা নিরপরাধ মানুষের হত্যাকে সর্বাপেক্ষা মহাপাপ বলে ঘোষণা করেছেন। যে নামেই হোক, যে পতাকার ছায়াতেই হোক—একজন মুসলিম মুজাহিদের হত্যা নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতকতা।
এখন আসুন, সেই সাহসী মুজাহিদ ও রণাঙ্গনের বীরের জীবনের দিকে দৃষ্টি দিই, যিনি আগুন ও যুদ্ধের ভাটিতে পুড়ে গড়ে উঠেছিলেন এবং দাঈশি খারিজিদের হাতে শহীদ হন। জন্ম থেকে শাহাদাত পর্যন্ত তাঁর মর্যাদাপূর্ণ যাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত ঝলক তুলে ধরা যাক।
১. জন্ম ও শিক্ষা
শহীদ খলিলুর রহমান হাক্কানী ছিলেন খাজা মুহাম্মাদের পুত্র এবং আলী বাদশাহর পৌত্র। প্রায় ঊনসত্তর (৬৯) বছর পূর্বে পাকতিয়া প্রদেশের গর্দী সেরাই জেলার কারিজগি অঞ্চলের আওজ খাইল গ্রামে (যা ছিল তাঁর মাতুলালয়) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন পশতুন; পশতুনদের মধ্যে জাদরান, আর জাদরান গোত্রের মিজাই সুলতান খাইল শাখার অন্তর্ভুক্ত।
তিনি কোনো স্কুল-কলেজে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি, কিংবা কোনো মাদরাসায় নিয়মিত দরসে নিজামি অধ্যয়ন করেননি। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে শৈশব থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণের পথে তিনি কষ্ট, হিজরত ও নিরবচ্ছিন্ন সফর সহ্য করেছেন। শৈশব থেকেই সংগ্রাম, ত্যাগ, ধৈর্য ও দৃঢ়তার পতাকা তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে মায়ের কাছেই কুরআন মাজিদের পাঠ শুরু করেন এবং মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে প্রাথমিক দীনি কিতাবসমূহ সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে গর্দী সেরাইয়ের কারিজগি গ্রামে আওজ খাইল অঞ্চলে মোল্লা মুহাম্মাদ উমারের কাছে আরও শিক্ষা লাভ করেন।
বড় ভাই জালালুদ্দিন হাক্কানী (রহ.)-এর কাছে তৃতীয় স্তর পর্যন্ত দীনি পাঠ গ্রহণ করেন। এরপর হিজরত করে পাখতুনখাওয়ায় পৌঁছে পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। এই সময়ে মুজাহিদদের আহতদের চিকিৎসাসেবার উদ্দেশ্যে স্বল্পমেয়াদি চিকিৎসা প্রশিক্ষণও নেন। কিন্তু স্বদেশে সোভিয়েত আগ্রাসন শুরু হলে তিনি তাঁর সমস্ত মনোযোগ ও চিন্তা সশস্ত্র জিহাদ ও শত্রুর মোকাবিলায় নিয়োজিত করেন; এখানেই তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
তবু তিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকেই শিক্ষা হিসেবে দেখেছেন এবং অভিজ্ঞতা থেকেই শিখেছেন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে এমন জাতীয় চেতনা, গণবোধ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দান করে, যা বহু উচ্চডিগ্রিধারীর মধ্যেও দুর্লভ। ‘লুই মুসাল্লেহ সত্তর গাজি’ গ্রন্থের লেখকের ভাষায়: হাজী খলিল উচ্চশিক্ষিত না হলেও রাজনৈতিক ও স্বাভাবিক প্রজ্ঞায় দীপ্ত ছিলেন; সে কারণেই আফগান–সোভিয়েত যুদ্ধে তিনি প্রতিপক্ষ সৈন্যদের গালি দিতেন না, বরং বলতেন—“তোমরা তো মন্দকেও বোঝ না!” তিনি পশতু ও দারি ভাষায় সাবলীল, উর্দুতে কথোপকথনে সক্ষম এবং আরবিতে যোগাযোগ করতে পারতেন।
২. রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জিহাদি পটভূমি
হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানির জিহাদী চেতনা, উদ্দীপনা, সাহসিকতা এবং শত্রুকে পরাস্ত করার ক্ষমতা তাঁর পূর্বপুরুষদের জিহাদী কীর্তি থেকে উৎসারিত এবং তা থেকেই তিনি পুষ্টি লাভ করেছেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে পাকতিয়ার জারমাত ও লোগারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, কঠিন যুদ্ধের পর ইংরেজদের পরাজিত করেন এবং সর্বোপরি ত্যাগের অঙ্গীকারে অটল থাকেন। এই যুদ্ধগুলোতে অর্জিত গণিমতের মালও পাওয়া গিয়েছিল, যা তাঁর বড় ভাই জালালুদ্দিন হাক্কানি (রহ.) পরে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদে ব্যবহার করেন।
দাউদ খানের ক্ষমতাচ্যুতি এবং কিছু কমিউনিস্টের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর যখন ইসলামপন্থীদের উপর অত্যাচার শুরু হলো, তখন বড় ভাই জালালুদ্দিন হাক্কানি ও হাজি মুহাম্মাদ ইব্রাহিম হাক্কানির নেতৃত্বে, পাকতিয়ার উলামা, জাতীয় নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বড় বড় বৈঠক করে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও জিহাদী পদক্ষেপ শুরু করেন।
কমিউনিস্ট উপাদানরা বড় ভাইদের হত্যার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হয় এবং অভিযানের সময় বিশেষ কৌশল ও জনগণের সহায়তায় তাঁরা নিরাপদ অঞ্চলে স্থানান্তরিত হন। তাঁদের পরিবার শমল দারে ও গুরুবি পাহাড়ের দিকে আশ্রয় নেয়, কিন্তু কমিউনিস্টরা সেখানেও তাঁদের জীবন কঠিন করে তোলে এবং পনেরো দিনের অবরোধের পর সেখান থেকে হিজরত করতে বাধ্য হন।
আলহাজ্জ খলিলুর রহমান হাক্কানি তাঁর পরিবারের সাথে পাঁচ দিনের পায়ে হেঁটে সফরের পর, ১৩৫৪ হিজরি শমসি সনে পাখতুনখোয়া, উত্তর ওয়াজিরিস্তানের দাতা খিল এলাকা থেকে মিরান শাহ পর্যন্ত হিজরত করেন। তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের, বিশেষত জালালুদ্দিন হাক্কানির সাথে মিলে, কমিউনিস্ট ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিহাদের ফ্রন্টগুলো এমন তীব্রতার সাথে গরম রাখেন যে বন্ধুদের মতে: সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধের সময়ও হাক্কানি সাহেবের কণ্ঠস্বর শোনা যেত। আমেরিকা ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে অতুলনীয় জিহাদী সংগ্রামের সময় তিনি লশকরের প্রধান ছিলেন এবং এই সংগ্রামের সময়েই ২০০৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর আমেরিকান ও পাকিস্তানি বাহিনীর যৌথ অভিযানে গ্রেফতার হন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল মোশাররফকে হত্যার জন্য বোমা স্থাপনের অভিযোগ আনা হয়; কিন্তু প্রায় চার বছর দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক কারাবাসের পর তিনি মুক্তি পান, তারপর দ্বিতীয়বার পেশোয়ারে প্রায় এক মাস কারাবন্দী থাকেন।
২০০৯ সালে জাতিসংঘ তাঁকে তাদের ব্ল্যাকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয় এবং ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১১ তারিখে আমেরিকান ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের আদেশ নং ১৩২২৪ এর অধীনে তাঁকে ব্ল্যাকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাঁর মাথার উপর পাঁচ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়। কিন্তু শহীদ হাক্কানি এর পরোয়া না করে আমেরিকান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর জিহাদী কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন, যতক্ষণ না আমেরিকার শেষ সৈন্যও আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত হয়।
হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানির সাহসিকতা ও সাফল্যের অসংখ্য গল্প তাঁর ফ্রন্টের সাথীদের হৃদয়ে জীবন্ত রয়েছে, যেখানে পরাজয়ের কোনো উদাহরণ দেখা যায় না।
৩. জিরগা ও আলোচনায় অংশগ্রহণ
শহীদ হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানি তাঁর জনসচেতনতা, উপজাতীয় প্রজ্ঞা এবং সমস্যা সমাধানে তাঁর পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে এত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন যে, অনেক উচ্চশিক্ষিত লোকও তাঁর সমকক্ষ হতে পারেননি। তাঁর নানা একজন জাতীয় নেতা ছিলেন, এবং তাঁর মৃত্যুর পর নেতৃত্বের পাগড়ি তাঁর চাচার (গুল মুহাম্মাদ খান) মাথায় পরানো হয়েছিল। তিনি মসিহ-ই-আজম, গাজিয়ে আকবর মৌলভি জালালুদ্দিন হাক্কানি (রহ.)-এর সাথে জিরগা (উপজাতীয় পরিষদ) ও আলোচনায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন এবং জনসাধারণের ও উপজাতীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতে তাঁর সমস্ত শক্তি ব্যয় করেন। তিনি কেবল পাকতিয়া প্রদেশেই উপজাতীয় বিরোধ সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেননি, বরং দেশের সমস্যা সমাধানেও অগ্রণী ও সক্রিয় ছিলেন।
হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানি গৃহযুদ্ধের সময় হাক্কানি সাহেব (রহ.)-এর সাথে মিলে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঐক্য ও সমঝোতার অবিস্মরণীয় প্রচেষ্টা চালান এবং প্রতিটি ফ্রন্টে কল্যাণের বীজ বপন করেন। যে কেউ জিরগা ও আলোচনার কথা বলে, বা এই ক্ষেত্রে একজন মীমাংসাকারী হিসেবে পদক্ষেপ নেয়, সে নিঃসন্দেহে শহীদ খলিলুর রহমান হাক্কানির কর্ম ও অভিজ্ঞতা থেকে আলো লাভ করে।
৪. গুণাবলী ও দক্ষতা
শহীদ হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানি ছিলেন তাকওয়া, ধৈর্য, সহনশীলতা ও সাহসিকতার অধিকারী। তাঁর ব্যক্তিত্বে নরম দিলি ও কঠোরতার এক অতুলনীয় মিশ্রণ দেখা যেত। তিনি অভাবীদের সাহায্য করার জন্য সবসময় উদগ্রীব থাকতেন, এবং তাঁর কথাগুলো সর্বদা পরিষ্কার ও সরাসরি হতো। সামরিক বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং অগ্রণী নেতা।
সোভিয়েত আক্রমণের সময় তাঁর যুদ্ধ কৌশল এবং সাহসের বিষয়ে মিশরীয় লেখক ও সাংবাদিক মোস্তফা হামিদ, যিনি সেসময় শহীদ হাক্কানিকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর “দুনিয়ার সর্বোচ্চ শিখর” (Dunya Parbam) বইয়ে লিখেছেন: “খলিলুর রহমান হাক্কানি ট্যাংক দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানায় অতুলনীয় বিশেষজ্ঞ এবং শত্রুর প্রথম সারি ভেদকারী এক সাহসী মুজাহিদ ছিলেন। তিনি কেবল ট্যাঙ্ক চালনাতেই দক্ষ ছিলেন না, বরং এর কারিগরি নির্মাণ ও কাঠামোতেও তাঁর জ্ঞান ছিল।” আলহাজ্জ হাক্কানি ছিলেন পরিষ্কার মনের, বিনয়ী এবং নেক দিল মানুষ, যিনি ইয়াতিম ও গরীবদের সাহায্য করতেন। তিনি নিজের খাবার অন্যদের সাথে ভাগ করে খেতেন এবং অভাবীদের কাছে টাকা না থাকলে ঋণ নিয়েও সাহায্য করতেন। তিনি অত্যন্ত দয়ালু, শিশুদের প্রতি স্নেহশীল এবং তাদের সুরক্ষাকারী ছিলেন।
জিরগা (সমঝোতা) ও আলোচনায় দক্ষ এবং শান্তিপ্রিয় এই নামকরা মুজাহিদ, দেশের বিভিন্ন জাতির মধ্যে ঐক্য স্থাপনের জন্য দিনরাত সচেষ্ট ছিলেন এবং যুদ্ধ ও শত্রুতার আগুনকে জিরগার মাধ্যমে নির্বাপিত করতেন।
আল্লাহ তাআলা হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানি এবং তাঁর পরিবারকে প্রশস্ত হৃদয়, পূর্ণ ধৈর্য, দৃঢ় সংকল্প এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাথে এমন উচ্চ মর্যাদা এবং ক্ষমার গুণাবলী দান করেছিলেন যে, সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখত। যখন হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানি সাহেব (রহ.) শত্রুর সামনে সরাসরি লড়তেন, তখন লড়াইয়ের পরপরই তিনি শত্রুর জন্য দয়া ও ক্ষমার বাহু উন্মুক্ত করতেন এবং আশ্বাস দিতেন: “তুমি এখন নিরাপদ।” তিনি তাঁর শত্রুপক্ষের সৈন্যদেরকে কেবল কাপড় ও টাকা দিতেন না, বরং নিজের মুজাহিদীনদের মাধ্যমে বিপজ্জনক এলাকা থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতেন, যার ফলস্বরূপ অনেকে তাঁর ভালো ব্যবহারের প্রভাবে তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরে না গিয়ে তাঁদের সঙ্গেই থেকে যেতেন এবং কঠিন যুদ্ধেও তাঁদের সাথে শামিল থাকতেন।
তিনি কোনো দায়িত্ব পালনের সময় কাউকে তাঁর দরজা থেকে নিরাশ করতেন না। যতক্ষণ না সমস্যা সমাধান হতো, তিনি সেই ব্যক্তিকে সব ধরনের সাহায্য করতেন, সংগ্রাম করতেন এবং সহায়তা প্রদান করতেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে, যদিও তিনি শরণার্থী বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন, তবুও তিনি জনগণের সেবা করতেন উন্মাদনার সাথে, তাঁর অফিসের দরোজা সকল স্তরের মানুষের জন্য খোলা রাখতেন এবং শেষ আবেদনপত্রে স্বাক্ষর না করা পর্যন্ত বাড়ি ফিরতেন না। বস্তুত, এই জনতার সেবক তাঁর জনগণের মধ্যে খুশি থাকতেন এবং সমস্যা সমাধানের মাধ্যমেই শান্তি অনুভব করতেন।
আলহাজ্জ খলিলুর রহমান হাক্কানির সেরা গুণাবলী বা দক্ষতার মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে, তিনি খুব দ্রুত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন এবং সেগুলোকে টিকিয়ে রাখা ও মজবুত করতেও খুব ভালোভাবে জানতেন। তিনি বিপক্ষ দলের সামরিক ও রাজনৈতিক মহলেও এমন যোগাযোগ স্থাপন করতেন যে শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার খবর আগেই পেয়ে যেতেন এবং সময়মতো তার মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতেন।
ইসলামী ইমারত (ইমারাতে ইসলামিয়া) পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর, তিনি তৎকালীন কান্দাহার এবং বর্তমান মাজার-ই-শরীফের গভর্নর মুহতারাম হাজি ওয়াফার সাথে নিবিড় সমন্বয় ও অতুলনীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জন করেন যে, কান্দাহার সহ নাঙ্গারহার, কুনার এবং আরও অনেক প্রদেশ পূর্ববর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে সুসংগঠিত যোগাযোগ ও আস্থা তৈরির মাধ্যমে কোনো যুদ্ধ ও রক্তপাত ছাড়াই ইসলামী ইমারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। একইভাবে, তিনি পূর্ববর্তী ব্যবস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়ে প্রত্যেককে তাঁদের বাড়িতে সম্মানের সাথে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও নিজে পালন করেন।
৫. দায়িত্বসমূহ
হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানি তাঁর তারুণ্য থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অসংখ্য দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিচে দেওয়া হলো:
• হিজরতের সময় মুজাহিদীনদের প্রশিক্ষণ ও জিহাদী কর্মসূচির দায়িত্ব এবং আফগান শরণার্থীদের সমস্যা সমাধানকারী কমিটির নেতৃত্ব। একইভাবে হিজরতের সময় রাজনৈতিক বিরোধী ও মীমাংসাকারীদের কাউন্সিলের দায়িত্বও তাঁর উপর ছিল।
• শহীদ সুলাইমান শাহ জাগরুয়াল গ্রুপের সাধারণ প্রধান।
• খোস্ত, পাকতিয়া, পাকতিকা, গাজনি, লোগার এবং জালালাবাদে তাঁর মুজাহিদীনদের নেতৃত্ব।
• খোস্ত ও পাকতিয়ার বিজয়ে সাতটি সংগঠনের সামরিক প্রধান।
• ড. নজিবুল্লাহর শাসনকালে মুজাহিদীনদের উচ্চ কাউন্সিলের সদস্য।
• গৃহযুদ্ধের সময় সমস্যা সমাধানের জন্য গঠিত সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য, এই কাউন্সিল তৎকালীন সরকারের সামরিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের দায়িত্বে ছিল।
• সিবাগতুল্লাহ মুজাদ্দেদি থেকে বুরহানুদ্দিন রব্বানি পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধি দলের সাথে সাতটি সংগঠনের বৈঠকে তাঁর সংগঠনের নেতৃত্ব।
• সমাধান ও বন্ধন কাউন্সিলে পাকতিয়ার উপজাতিদের প্রতিনিধি।
• সোভিয়েত দখলের সমাপ্তি এবং আফগান জিহাদের সাফল্যের পর জিহাদী নেতাদের মধ্যে মতভেদ দূর করার জন্য কাবার ইমামের নেতৃত্বে গঠিত কাউন্সিলের সদস্য।
• ইসলামী ইমারতের প্রথম আমলে প্রজাতন্ত্রী গার্ড ও খাজা রাওয়াশ বিমান বন্দরের দায়িত্বশীল এবং উত্তর ফ্রন্টের মুজাহিদীনদের কমান্ডার, যিনি সাওরের বিদ্রোহের পর চৌদ্দ বছরের জিহাদেও একটি ফ্রন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
• আমেরিকান আগ্রাসনের সময় একটি মুজাহিদ গ্রুপের কমান্ডার এবং দখলের সমাপ্তির পর কাবুলের কর্মকর্তাদের সাথে শান্তি স্থাপন, সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর এবং রক্তপাত এড়াতে যোগাযোগ স্থাপনকারী। একইভাবে, তিনি সময়ে সময়ে মরহুম হাক্কানি সাহেব (রহ.)-এর দায়িত্ব নিতেন, একাধিক রাজনৈতিক ও সামরিক বৈঠকে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং ইসলামী ইমারতের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে শরণার্থী বিষয়ক সহকারী মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৪০২ হিজরি শমসি সনে, যখন পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক আফগানিস্তানে নির্বাসিত করা হয়, তখন তিনি তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেন এবং তাঁদের পৈতৃক এলাকায় পৌঁছে দেন। তাঁর তিন বছরের চাকরির সময় তিনি কেবল ফিরে আসা লোকদেরই সাহায্য করেননি, বরং সমস্যা সমাধানের জন্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান ও ইরানও সফর করেন।
৬. জ্ঞানভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ
হাজি খলিলুর রহমান হাক্কানি বই এবং মিডিয়ার প্রতি ভালোবাসা পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। যদিও এই পরিবার খুব বেশি সাংস্কৃতিক ছিল না, তবে সংস্কৃতির অনুরাগী অনেকে ছিলেন এবং জিহাদী ইতিহাসের সুরক্ষায় তাঁরা অগ্রগণ্য ছিলেন। তাঁর সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টার কারণে, মরহুম মোল্লা মুহাম্মাদ ইউনুস খালিসের নেতৃত্বে “শোহাদা-ই-হিজব-ই-ইসলামীর জীবনী” প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং আমেরিকান হামলায় শহীদ হওয়া অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির সংগ্রাম ও কৃতিত্বের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল, যা তাঁদের স্মৃতিচারণ ও লেখালেখির সাথে প্রকাশিত হবে।
রেডিও ও টেলিভিশন থেকে খবর শোনা, রাজনৈতিক আলোচনা দেখা, সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন পড়া, লেখকদের সাথে বই প্রকাশনায় সাহায্য করা এবং কিছু গ্রন্থাগারকে ব্যক্তিগত আর্থিক সহায়তায় বই দান করা—এগুলো তাঁর সাংস্কৃতিক বিকাশ, চেতনার জাগরণ এবং দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ ছিল। তিনি মিডিয়ায় তাঁর কার্যক্রমের রিপোর্ট সরবরাহ করতেন, সময়ে সময়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিতেন এবং প্রদেশ সফরের সময় সাংবাদিকদের কেবল তাঁর সাথে রাখতেন না, বরং তাঁদের সাথে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন, খাবারের সময় তাঁদের তাঁর দস্তরখানে আমন্ত্রণ করতেন এবং পারস্পরিক আলোচনা করতেন।
প্রতিটি যুগে খারিজিরা উম্মাহর ক্ষতকে তাজা করেছে; বাইরে থেকে দীনের পোশাক পরলেও ভেতরে অন্ধকার। এই লোকেরা কঠিন হৃদয়ের চরম সীমায় রয়েছে এবং মুসলিমদের রক্তকে তারা এক ফোঁটা পানির মতো গণ্য করে। আলেমগণ বলেছেন যে খারিজিদের পরিচয় হলো: তারা সত্যের নরম দিক থেকে পালিয়ে যায় কিন্তু মুসলিমদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধারালো রাখে। তারা সর্বদা উম্মাহর দেহে সেই ছোরা ঢুকিয়ে দেয় যা শত্রুর জন্য পথ সুগম করে এবং উম্মাহর সেরা নেতাদের হত্যা করার সাথে জড়িত ছিল।
৭. শাহাদাত
অবশেষে, মুসলিম উম্মাহর এই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি আমেরিকান ব্ল্যাকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; ঈমানদার মুজাহিদ, যার মাথার উপর লক্ষ লক্ষ ডলার পুরস্কার নির্ধারিত ছিল, যাকে কেউ দুই বিপ্লবের সময় কাফেরদের কাছে বিক্রি করেনি, কিন্তু ইসলামের কট্টর শত্রু দাঈশি খারিজিরা তাদের প্রভুদের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করল। ১৪০৩ হিজরি শমসি সনের, লিন্দি মাসের ২১ তারিখে, শহীদ আলহাজ্জ খলিলুর রহমান হাক্কানি শরণার্থী মন্ত্রণালয়ের অফিসে দুপুর দেড়টায় দাঈশি আত্মঘাতী হামলাকারীর আক্রমণে শহীদ হন। (নাহসাবুহু কাজালিক ওয়াল্লাহু হাসিবুহু আমরা তাঁকে শহীদ মনে করি এবং আল্লাহই তাঁর হিসাব গ্রহণকারী)। তাঁর জানাযার নামায কওস মাসের ২২ তারিখ, বৃহস্পতিবার, তাঁর পৈতৃক ভূমিতে অত্যন্ত ভক্তি সহকারে আদায় করা হয় এবং তাঁকে জারগুন রুগার নতুন কবরস্থানে দাফন করা হয়। (আল্লাহ তাঁর কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন)।
হে ইসলামের মহান শহীদ! আপনি সফল হয়েছেন এবং সফলতার সাথে চিরন্তন পথে যাত্রা করেছেন। আপনি ইসলামের ইতিহাসে আপনার অস্তিত্বের রক্ত দিয়ে সাহসিকতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কীর্তি স্থাপন করেছেন, এবং আপনি সেই সুসংবাদের অংশ হলেন যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি খারিজিদের হত্যা করে বা খারিজিদের দ্বারা শহীদ হয়, তার জন্য শাহাদাত এক মহান নেয়ামত যা ভাগ্যবানরা লাভ করে। আপনি আপনার জীবন পবিত্র দীন ইসলামের সুরক্ষার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, এবং আপনি কেবল এখন নন, বরং আগেই শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন এবং এই উচ্চ মর্যাদার জন্য পার্থিব জীবন কাটাচ্ছিলেন।
হে সৌভাগ্যবান শহীদ! আপনি সেই দলের ব্যক্তির হাতে শাহাদাত পেলেন, যারা হযরত উসমান (রা.), নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীকে, কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের সময় শহীদ করেছিল এবং তাঁর রক্ত কুরআনের পাতায় প্রবাহিত করেছিল। আপনি উচ্চ মর্যাদার শহীদ, এমন এক শহীদ, যার স্থান অত্যন্ত উঁচু। হে আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত! আমরা আপনার পথেই চলছি, আপনার পথেই আমাদের জীবন ও মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছি।
