প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ২৪ ডিসেম্বর, বুধবার ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম হুসাইন এলাকায় কমান্ডার একরামুদ্দিন সারী এবং তার সহযোগীদের ওপর একটি হামলা হয়। এই হামলায় তিনি কমান্ডার আলমাস-সহ নিহত হন এবং তাদের এক সহযোগী আহত হন। আহমাদ মাসউদের নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধ ফ্রন্ট এবং আরও কিছু পলাতক ব্যক্তিত্ব তাৎক্ষণিকভাবে দাবি করেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ড আফগানিস্তান ইসলামি ইমারাতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে যে, এত দ্রুত কীভাবে ইসলামি ইমারাতকে দায়ী করা হলো এবং এই তথ্যগুলো এত দ্রুত কীভাবে সংগ্রহ ও প্রচার করা হলো?
ইরানের কিছু সূত্রের মতে, কমান্ডার একরামুদ্দিন সারী ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) ‘আনসার সদরদপ্তর’-এর সাথে আফগানিস্তানের প্রাক্তন প্রজাতন্ত্রী আমলের সামরিক কর্মকর্তাদের বিষয়ে কাজ করতেন এবং তাদের সংগঠিত করতেন। সম্প্রতি একই ধরনের একটি গোপন প্রকল্প পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই) শুরু করেছে, যেখানে জেনারেল আবদুল মতিন হুসাইনখেল এবং জেনারেল জুরআত আইএসআই-কে সহযোগিতা করছেন। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সাবেক সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে ডেকে নিয়ে আইএসআই-এর সাথে সমন্বয় করা, আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং উপজাতীয় শরণার্থীদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করা।
তবে কমান্ডার একরামুদ্দিন সারী চাইতেন না যে ইরান ও অন্যান্য দেশে অবস্থানরত সাবেক জেনারেল ও কর্মকর্তারা পাকিস্তানে যাক। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ ছিল। ফলে আইএসআই-এর এই প্রচেষ্টার পথে কমান্ডার সারী একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এই কারণে জেনারেল জুরআত এবং জেনারেল আবদুল মতিনের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছিল যাতে তাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখা যায় অথবা তাকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বেশ কিছু সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, একরামুদ্দিন সারীর হত্যাকাণ্ডের পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর হাত রয়েছে। আর দোষ যেন আফগানিস্তানের ওপর চাপানো যায়, সেজন্য পাকিস্তান আগে থেকেই কিছু বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপ নিয়ে রেখেছিল। একারণেই সম্প্রতি পাকিস্তানে যাতায়াতকারী পলাতক ব্যক্তিরা তৎক্ষণাৎ অভিযোগের আঙুল আফগানিস্তানের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। আফগান সরকারের একটি সূত্র ‘আল-মিরসাদ’-কে জানিয়েছে যে, এই হামলাটি একরামুদ্দিন সারী ও আহমাদ মাসউদের গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে করানো হয়েছে যারা সারীর সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে যে, আফগানিস্তান ইসলামি ইমারাতের সীমান্ত ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে কোনো অভিযানের নীতি নেই। বিশ বছরের লড়াইয়ের সময়ও তারা বিদেশের মাটিতে কোনো শত্রুকে লক্ষ্যবস্তু করেনি এবং এখনো এমন কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। ইসলামি ইমারাত সাধারণ ক্ষমা (General Amnesty) কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিদেশে যারা জীবন ঝুঁকিতে মনে করছেন, তারা আফগানিস্তানে ফিরে এসে নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারেন।
সূত্রগুলো আরও জানায় যে, মাশহাদে গোলাম মারুফের ওপর হামলাটিও জাভেদ নামক এক ব্যক্তি চালিয়েছিল, যে হেরাত প্রদেশের কোহসান জেলার বাসিন্দা। আহমাদ মাসউদের গোষ্ঠীর সদস্য ছিল জাভেদ এবং আফগানিস্তানে গ্রেনেড হামলা, হত্যা, অপহরণ ও চুরির মতো অপরাধে জড়িত ছিল। সে ২০২২ সালে আহমাদ সদিস নামক এক শিয়া কিশোরকে অপহরণ করে ১ লক্ষ মার্কিন ডলার দাবি করেছিল। পরে ইসলামি ইমারাতের অভিযানে ওই কিশোর উদ্ধার হয়, জাভেদের ভাই নিহত হয় এবং জাভেদ পালিয়ে ইরানে আশ্রয় নেয়। ধারণা করা হচ্ছে, জাভেদ ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে গোলাম মারুফকে হত্যা করেছে।
সূত্র আরও জানাচ্ছে যে, তেহরান ও মাশহাদে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তদন্তের ফলাফল নিহতের পরিবার ও সংবাদমাধ্যমকে জানানো হবে।
পাকিস্তান বর্তমানে বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত সাবেক আমলের কমান্ডারদের মধ্যে বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টির তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। গত মাসে ইরানে অবস্থানরত কান্দাহারের সাবেক কিছু কমান্ডারের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। একদিকে ছিলেন কমান্ডার হাশিম রিগওয়াল, কমান্ডার ইসমত ও কমান্ডার মুস্তফা; অন্যদিকে ছিলেন জেনারেল রাজিকের পরিবারের অনুগত কমান্ডার সিরাজ, রহিমুল্লাহ খান ও বিসমিল্লাহ। এই সংঘর্ষে ছুরি ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয় এবং রহিমুল্লাহ খানকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। হাশিম রিগওয়ালের হামলায় রহিমুল্লাহ খান গুরুতর আহত হন।
রিপোর্ট অনুযায়ী, কমান্ডার হাশিম রিগওয়াল কোয়েটায় অবস্থানরত তার সহযোগী কমান্ডার ওয়ালি জানের মাধ্যমে আইএসআই-এর সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখছেন। অন্যদিকে জেনারেল রাজিকের পরিবার সম্প্রতি পাকিস্তানের কিছু দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, রহিমুল্লাহ খানকে হত্যার চেষ্টা করার মূল কারণ হলো তারা পাকিস্তানের দাবি মেনে নেয়নি।
এছাড়াও আইএসআই তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে ইরানে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে, যাতে ইরান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক তিক্ত হয়। তেহরানে কমান্ডার সারীর হত্যাকাণ্ড এবং এর ব্যাপক প্রচারণার উদ্দেশ্যও হলো ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করা।
