গত শুক্রবার ৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী হামলা চালানো হয়, যার ফলে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করেছে এবং হামলাকারীর ছবিও প্রকাশ করেছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান সরকার তৎপরতা দেখায় এবং আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবারের এই হামলার পরিকল্পনাকারী গোষ্ঠীটি খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বাজৌর জেলার ডামডালা ও কাটকোট এলাকার বাসিন্দা।
খবর অনুযায়ী, ইসলামাবাদ হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন ইমরান (যিনি আবু বকর বাজৌরি নামে পরিচিত), ইদ্রিস (ইউসুফ নামে পরিচিত) এবং মোল্লা ইমরান। এই ব্যক্তিরা হামলাকারীকে পরিচালনা করছিলেন এবং তার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ রাখছিলেন। হামলাকারীকে বাজৌরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এবং তার আত্মঘাতী জ্যাকেটটি পেশোয়ার থেকে আনা হয়েছিল। হামলার দিন সন্ধ্যায় পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী খাইবার পাখতুনখোয়ার নওশেরা শহরের হাকিমাবাদ এলাকায় তাদের আস্তানায় অভিযান চালায়। এতে ইউসুফ (ইদ্রিস) নিহত হন, আবু বকর বাজৌরি গ্রেপ্তার হন এবং মোল্লা ইমরান পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এই হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা এবং আইএসের ভেতরে নিজেদের চরদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার বিষয়টি ঢাকতে দাবি করেছে যে, হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীরা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আফগানিস্তানে যাতায়াত করছিল। অথচ এই হামলার সমস্ত পরিকল্পনাকারী মূলত পাকিস্তানি নাগরিক। আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার কয়েক মাস পর সেখানে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ায় তারা খাইবার পাখতুনখোয়া, বিশেষ করে বাজৌরে পালিয়ে এসেছিল; কারণ আফগানিস্তানে তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছিল না।
উল্লেখ্য যে, এই গোষ্ঠীটি ২০২৩ সাল থেকে বাজৌর ও পেশোয়ারে জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের (JUI) বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, ধর্মীয় আলেম ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল:
* মওলানা সালাহউদ্দিন, জেআইউআই সদস্য; শাহাদাত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩।
* মওলানা আলতাফ হোসেন, জেআইউআই সদস্য ও ব্যবসায়ী; শাহাদাত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩।
* মওলানা নূর মুহাম্মদ, জেআইউআই সদস্য ও ব্যবসায়ী; শাহাদাত: ২২ জুন ২০২৩।
* মুয়াজ খান, জেআইউআই স্থানীয় কর্মকর্তা এবং সাবেক তালেবান নেতা মুফতি বশীরের ছেলে; শাহাদাত: ১৮ এপ্রিল ২০২৩।
* কারি ইসমাইল, সালাফি আলেম; শাহাদাত: ২৯ অক্টোবর ২০২৩।
* কারি জয়নুল আবেদিন, মসজিদের ইমাম; শাহাদাত: ২৭ অক্টোবর ২০২৩।
* মওলানা তলা মুহাম্মদ, সালাফি আলেম ও শিক্ষক; শাহাদাত: ৪ অক্টোবর ২০২৩।
* আকরাম খান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী; শাহাদাত: ৯ নভেম্বর ২০২৩।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুই বছর ধরে এই গোষ্ঠীটি কেন ধরা পড়ল না? কেন ইসলামাবাদ হামলার ঠিক একদিন পরেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো? হামলার পর পাকিস্তানের সামরিক কৌশল কেন বদলে গেল? ইসলামাবাদ হামলার পর এই প্রশ্নগুলোই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এবং গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন।
পাকিস্তানের দিকে আইএস খোরাসানের নেতৃত্ব ও সদস্যদের স্থানান্তর
আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার পর আইএসের ওপর চাপ বেড়ে যায়। ফলে আইএস খোরাসানের (ISKP) নেতৃত্ব তাদের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। যদিও আইএসের আদর্শ অনুযায়ী তারা বিশ্বের সমস্ত সরকারকে ‘মুরতাদ’ মনে করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাই পাকিস্তানে অবস্থান করাও তাদের জন্য চ্যালেঞ্জহীন ছিল না। তবে পাকিস্তান তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে পরোক্ষভাবে একটি সমঝোতার মাধ্যমে এই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও সদস্যদের সুসংগঠিতভাবে আশ্রয় দেয়। বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া’র পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। তবে সেখানেও এই গোষ্ঠীটিকে ক্রমাগত চাপের মুখে রাখা হয়েছিল।
বেলুচিস্তানের মাস্তুং এলাকায় আস্তানা তৈরির পর আইএস তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠিত করে। অবশেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ সেই আস্তানাগুলোর বিরুদ্ধে একটি অভিযান শুরু হয় যা তিন দিন স্থায়ী ছিল। এই অভিযানে তাদের আস্তানাগুলো ধ্বংস করা হয় এবং প্রায় ৩০ জন যোদ্ধা, প্রশিক্ষক ও কমান্ডার নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিল বিদেশি। এই অভিযানে ওয়ালিদ আল-তুর্কি, মোহাম্মদ ইসলাম কুর্দি ইরানি এবং আবদুল্লাহ আল-তুর্কি নামে তিন গুরুত্বপূর্ণ আইএস নেতাও নিহত হন।
মাস্তুংয়ের আস্তানা ধ্বংস হওয়ার পর আইএস খাইবার পাখতুনখোয়ার দিকে মনোযোগ দেয়, কিন্তু সেখানেও তারা নিরাপদ থাকতে পারেনি। গত ২৬ নভেম্বর খাইবার এজেন্সির জব্বার মেলা এলাকায় আব্দুল হাকিম তাওহিদি ও গুল নাজিমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত আস্তানায় ড্রোন হামলা চালানো হয়। চলতি ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে বাড়ার কাম্বারখেল এলাকার শিনকুতে তাদের আরেকটি আস্তানায় অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা হামলা চালায়, যাতে ১১ জন আইএস সদস্য নিহত এবং ৩ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে তিনজন স্থানীয় এবং বাকিরা বিদেশি ছিল। স্থানীয়দের মধ্যে আদনান (আবু আল-হারব) নামে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও ছিল। গত দুই বছরে পাকিস্তানে আরও অনেক আইএস সদস্য অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের হাতে নিহত হয়েছে।
আইএস সদস্যদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিভাজন
আইএস তাদের চরমপন্থী মতাদর্শ এবং সুনির্দিষ্ট কৌশলের অভাবে আদর্শিকভাবে বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত। তাদের কিছু সদস্য ‘তাকফির’ (কাউকে কাফের ঘোষণা করা) এর ক্ষেত্রে আইএসের মূল নীতির চেয়েও বেশি চরমপন্থা অবলম্বন করে। অন্যদিকে, কিছু সদস্য তুলনামূলক বাস্তববাদী ও সুবিধাবাদী এবং সংগঠনের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতায়ও রাজি থাকে। এই পরিস্থিতির কারণে সংগঠনের ভেতরে দলাদলি সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রতিটি উপদল তাদের নেতাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে।
আইএস ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক
আইএস খোরাসান এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্কের ইতিহাস এই গোষ্ঠীর শুরুর দিনগুলো থেকেই। শেখ আব্দুর রহিম মুসলিম দোস্তের মতে, প্রাথমিক দিনগুলোতে লস্কর-ই-তৈয়বা সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আইএসকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন। এরপর থেকে আইএস খোরাসান ও পাকিস্তান শাখাকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন সময় ব্যবহার করেছে, যার একটি উদাহরণ হলো পাকিস্তানে সামরিক সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের হত্যা।
আইএস কেন ইসলামাবাদে হামলা করল?
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইএসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌথ পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য বিদ্যমান ছিল। এই কারণে পাকিস্তানে আইএসের হামলাগুলো গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট রূপ ধারণ করেছিল এবং তাদের আদর্শিক ও সামরিক কার্যক্রম অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন ছিল।
আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজর রাখা বিশ্লেষকদের মতে, হামলার এই গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতা আইএসের ভেতরে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। এমন পরিবেশে নেতৃত্ব মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘সফট টার্গেট’ (সহজ লক্ষ্যবস্তু) আক্রমণ করে নিজেদের সদস্যদের বিভ্রান্ত করতে এবং সাংগঠনিক মনোবল বাড়াতে চেষ্টা করে।
একটি গবেষণা এও দেখায় যে, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় আস্তানা হারানোর পর আইএস বড় ধাক্কা খেয়েছিল। তাদের নিজেদের আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে নিজেদের স্বাধীন প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল। তাই তারা ইসলামাবাদের শিয়া মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এই সহজ লক্ষ্যবস্তুটি তাদের ‘এক ঢিলে তিন পাখি’ মারতে সাহায্য করেছে, কিন্তু তারা কল্পনাও করেনি যে এই পদক্ষেপ তাদের জন্য এত চড়া মূল্য বয়ে আনবে।
ইসলামাবাদ হামলার পর পাকিস্তানের সামরিক কৌশল কেন বদলাল?
ইসলামাবাদ হামলার পর বাজৌর গ্রুপের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর অভাবনীয় দ্রুত অভিযান থেকে স্পষ্ট যে, পাকিস্তান আইএসের লাগামহীন হামলা, বিশেষ করে যা সামরিক সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ ও নীতির পরিপন্থী—তা কখনোই সহ্য করবে না। এর আগেও পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় শিয়াদের ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু সামরিক সরকার আইএসের বিরুদ্ধে এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
কিন্তু ইসলামাবাদ যেহেতু রাজধানী এবং সামরিক সরকার একে বিশ্বের কাছে একটি নিরাপদ, উন্নত ও আদর্শ শহর হিসেবে উপস্থাপন করে, তাই এখানে হামলা তাদের জন্য মানহানিকর। বর্তমানে সামরিক সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে এবং প্রমাণ করতে চাইছে যে পাকিস্তানে বিনিয়োগের পরিবেশ নিরাপদ এবং এখানে একটি শক্তিশালী সরকার ও সেনাবাহিনী বিদ্যমান। কিন্তু এই হামলা সামরিক সরকারের সেই বয়ান ও প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা সংস্থাগুলো এই হামলাকে “ফিতনাতুল খাওয়ারেজ” (Fitna al-Khawarij) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল—যেটি তারা সাধারণত আইএস ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বাদে অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু যখন আইএসের সংবাদ সংস্থা ‘আমাক্ব’ (Aamaq) হামলার দায় স্বীকার করল এবং হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করল, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে আইএস পাকিস্তানে তাদের শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করতে চাইছে। এই বিষয়টি পাকিস্তানি সামরিক সরকারের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল। তাই তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঢাকতে এবং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ কমাতে সচেষ্ট হয়েছে।
ইসলামাবাদ মসজিদের এই হামলা পাকিস্তানি গোয়েন্দা মহলের জন্য একটি স্পষ্ট শিক্ষা যে, নিজেদের কৌশলগত উদ্দেশ্যে আইএসের মতো গোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হলে, একটা সময় তারা নিজেদের রক্ষককেই আঘাত করবে। এই ঘটনা পাকিস্তানকে জাগ্রত করার এবং এই গোষ্ঠীকে ব্যবহারের পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে আন্তরিকভাবে লড়াই করার দাবি রাখে।





















