إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا
“নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।”
কিছু দিন কেবল সময়ের পাতায় লেখা একটি তারিখ হয়ে থাকে না; বরং ইতিহাসের কপালে চিরকাল দীপ্ত হয়ে থাকে। কিছু দিন একটি জাতির স্মৃতির শিরায় রক্তের মতো প্রবাহিত হয় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। আর যখনই সেসব দিনের কথা স্মরণ করা হয়, তখন অতীতের বেদনার পাশাপাশি বিজয়ের মধুর সুবাসও অনুভূত হয়।
২৪ আসাদ তেমনই একটি দিন। সেই দিন, যেদিন দীর্ঘ এক রাতের প্রান্তসীমা পেরিয়ে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই দিন, যেদিন বহু বছরের ধোঁয়া ও অন্ধকারের আড়াল থেকে স্বাধীনতা উদ্ভাসিত হয়েছিল এবং ক্লান্ত-শ্রান্ত আফগান ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।
কিন্তু এই ভোরের আলোর আগে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ও অন্ধকার এক রাত। এই দিনের পেছনে রয়েছে অগণিত মায়ের সেই কান্না, যারা সন্তানদের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন, অথচ তাঁদের কানে পৌঁছেছিল সন্তানের শাহাদাতের সংবাদ। রয়েছে সেই বাবাদের নীরব অশ্রু, যারা কাঁধে করে নিজেদের তরুণ সন্তানদের জানাজা বহন করেছিলেন। রয়েছে সেই শিশুদের চোখ, যারা বাবার স্নেহময় হাতের উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। রয়েছে সেই নববধূদের শুভ্র পোশাক, যাদের মুখে আনন্দের পরিবর্তে নেমে এসেছিল শোকের কালো ছায়া। রয়েছে সেই স্ত্রীদের প্রতীক্ষমাণ চোখ, যারা দরজার দিকে তাকিয়ে প্রিয়তমের পদধ্বনি শোনার আশায় ছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেয়েছেন তাঁর শাহাদাতের সংবাদ।
যুদ্ধ শুধু মানুষ হত্যা করেনি; এটি ঘরের ছাদও ভেঙে দিয়েছে, আর সেই ছাদের সঙ্গে বহু পরিবারের আশাও ধ্বংস হয়েছে। এটি শহর ও গ্রামকে ক্ষতবিক্ষত করেছে; কিন্তু সবচেয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে মানুষের হৃদয়ে। কেউ হারিয়েছে স্নেহময় পিতাকে, কেউ প্রিয় সন্তানকে, কেউ আপন ভাইকে, কেউ হারিয়েছে জীবনসঙ্গীকে। কেউ ঘর ছেড়েছে, কেউ মাতৃভূমি ছেড়েছে, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়েছে। কেউ এমন শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে, যা হয়তো তার পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারত। আফগানিস্তানের প্রতিটি প্রান্তে, তার পাহাড় ও উপত্যকায়, এই দীর্ঘ যুদ্ধের একটি করে বেদনাদায়ক ও অপ্রকাশিত কাহিনি ছড়িয়ে আছে।
কিছু গল্প কবরের মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। কিছু গল্প মায়েদের চোখে জমে আছে। কিছু গল্প এতিমদের নীরবতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। আর কিছু গল্প পড়ে আছে পুরোনো বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপে, যেখানে আজও যেন অতীত দিনের পদধ্বনির প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
কিন্তু আফগান জাতি এমন কোনো জাতি নয়, যে ঝড়ের ঢেউয়ে ভেঙে পড়ে। এটি এমন এক জাতি, যে অসংখ্য ঝড় দেখেছে, অথচ কোনো ঝড়ই তার শিকড় উপড়ে ফেলতে পারেনি। সময়ের ঝড়গুলো তার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, কিন্তু সে পাহাড়ের মতো অটল থেকেছে।
একজন মুমিনের কাছে কঠিন দিনগুলো পথের শেষ নয়; বরং পরীক্ষা। আর পরীক্ষার পর যখন বিজয়ের দরজা খুলে যায়, তখন মানুষের উচিত অহংকারে মত্ত না হয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়া এবং গর্ব না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। এ কারণেই ২৪ আসাদ শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি কৃতজ্ঞতারও দিন।
এটি সেই শহীদদের স্মৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃতজ্ঞতার দিন, যারা এই পবিত্র ব্যবস্থার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের মাতৃভূমির মাটিতে স্বাধীনতার বাতাস গ্রহণ করতে পারে এবং আবারও স্বাধীনভাবে ইসলামের পতাকা উড্ডীন দেখতে পারে।
কিন্তু কেবল উৎসব ও সমাবেশের মাধ্যমে স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা যায় না। আমরা যদি সত্যিই শহীদদের রক্তের সম্মান করতে চাই, তাহলে আমাদের এই পবিত্র ইসলামী ব্যবস্থার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে। কারণ ইসলামের জন্য আত্মোৎসর্গকারী একজন শহীদের জন্য সবচেয়ে বড় স্মৃতিসৌধ হওয়া উচিত একটি ইসলামী, পবিত্র ও সমৃদ্ধ আফগানিস্তান। এমন একটি আফগানিস্তান, যেখানে কোনো শিশু ভয়ের মধ্যে নয়, বরং আশার আলো নিয়ে চোখ মেলে।
আসুন, ২৪ আসাদকে প্রতিশোধের ভাষায় নয়, আত্মসমালোচনা ও উপলব্ধির ভাষায় স্মরণ করি। ঘৃণার পরিবর্তে এর কাছ থেকে ঐক্যের বার্তা গ্রহণ করি। অতীতের বিজয় স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী ইসলামী ব্যবস্থা নির্মাণের সংকল্পও নতুন করে গ্রহণ করি। ২৪ আসাদ আমাদের শিক্ষা দিক বিজয় কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এটি নতুন দায়িত্বের সূচনা। আল্লাহ আমাদের শহীদদের প্রতি রহম করুন এবং তাঁদের পরিবারগুলোকে ধৈর্য ও মহাপুরস্কার দান করুন।
যেসব মহল ও রাষ্ট্র আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে এবং যুদ্ধের আগুন পুনরায় জ্বালাতে চায়, তাদের স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া উচিত এই জাতি আর অন্যদের রাজনৈতিক খেলার মাঠ নয়। আফগানিস্তান বহু দশকের যুদ্ধের আগুন পেরিয়ে এসেছে। এই ভূমিতে কেউ যেন বিভেদের আগুন জ্বালানোর চেষ্টা না করে। এই জনগণের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। আবার যুদ্ধ ফিরিয়ে আনার যেকোনো প্রচেষ্টা ইতিহাসের কঠিন শিক্ষা ও পরিণতির মুখোমুখি হবে। সত্য সর্বদাই বিজয়ী হবে।
দেশের শান্তি ও ইসলামী ব্যবস্থা রক্ষার জন্য আমরা এই ভূমির প্রবেশদ্বারে অটল থাকব। যে-ই নিরাপত্তাহীনতা ছড়ানোর চেষ্টা করবে, তার বিরুদ্ধে দৃঢ় ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। যে জাতি ঝড় পেরিয়ে এসেছে, সে আর প্রতিটি বজ্রধ্বনিতে ভীত হয় না।
আপনারা আপনাদের সন্তান ও পরিবারগুলোর দুঃখ আর বাড়াবেন না। নিজেদের ও নিজেদের পরিবারের প্রতি দয়া করুন। এই ইসলামী ব্যবস্থা ও সাদা পতাকার ছায়াতলে শান্তিতে জীবনযাপন করুন।





















