এরপর এশিয়া মাইনরে (এশিয়া-ই-কুচুক) বেশ কয়েকটি মুসলিম শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সেলজুক শাসন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সাম্রাজ্য এশিয়া মাইনরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এর শাসক সুলতান আলপ আরসালান (৪৫৫–৪৬৫ হিজরি / ১০৬৩–১০৭২ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন বীর সেনাপতি।
৩৬৪ হিজরি / ১০৭১ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত মালাজগির্দের যুদ্ধে তিনি রোমান সম্রাট রোমানোসকে পরাজিত করেন এবং কনস্টান্টিনোপলকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেন। এ যুদ্ধে রোমান সম্রাট নিজেই বন্দী হন। পরে তাকে এই শর্তে মুক্তি দেওয়া হয় যে, তিনি প্রতি বছর সেলজুক সুলতানকে কর প্রদান করবেন। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, রোমান সাম্রাজ্যের বহু অঞ্চল শক্তিশালী ইসলামী সেলজুক শাসনের সামনে নতি স্বীকার করেছিল।
মহান সেলজুক সাম্রাজ্যের পতনের পর বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র সেলজুক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলোর মধ্যে সেলজুক-ই-রূম-এর শাসনকাল বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। তাদের কর্তৃত্ব ছিল এশিয়া মাইনরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। তারা পশ্চিম দিকে ভূমধ্যসাগরের উপকূল পর্যন্ত নিজেদের সীমানা সম্প্রসারিত করেছিল। এর ফলে রোমানদের শাসনব্যবস্থা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছিল।
অষ্টম হিজরি শতাব্দীতে (চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দে) রূমের সেলজুকদের স্থলাভিষিক্ত হয় উসমানিরা। তারা আবারও কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের প্রচেষ্টা শুরু করে। এর সূচনা ঘটে তখন, যখন বায়েজিদ, যিনি ‘আস-সা‘ইকা’ (বজ্রপাত) উপাধিতেও পরিচিত ছিলেন, ৭৯৬ হিজরি / ১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপল কঠোরভাবে অবরোধ করেন।
সুলতান বায়েজিদ কনস্টান্টিনোপলকে এমন কঠোরভাবে অবরোধ করেছিলেন যে, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি দাবি করেন শহরটি মুসলমানদের হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু বাইজেন্টাইন শাসকরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে থাকে, যাতে তারা সময় লাভ করতে পারে এবং ইউরোপ থেকে ইসলামী বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহায্য আনতে পারে।
এই অবরোধ সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল এবং মনে হচ্ছিল, কনস্টান্টিনোপল অচিরেই বায়েজিদের হাতে চলে আসবে। কিন্তু ঠিক তখনই সুলতানের কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে, তিমুর লং-এর নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী উসমানি ভূখণ্ডে আক্রমণ করেছে এবং সেখানে ব্যাপক অরাজকতা ও ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সুলতান বায়েজিদ অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন এবং মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিজের বাহিনীকে রওনা করিয়ে দেন।
এদিকে বায়েজিদ নিজেই যখন তাঁর বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন আঙ্কারার নিকটবর্তী অঞ্চলে দুই মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বায়েজিদের বাহিনী পরাজিত হয় এবং তিনি নিজেও তিমুর লং-এর হাতে বন্দী হন। বন্দী অবস্থাতেই তিনি ১৪০২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর উসমানি সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যায় এবং কনস্টান্টিনোপল বিজয় কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে যায়।
পরবর্তীতে উসমানি সাম্রাজ্য যখন পুনরায় স্থিতিশীলতা অর্জন করে, তখন তারা আবার জিহাদের অভিযান শুরু করে। সুলতান মুরাদ দ্বিতীয়ের শাসনামলে (৮২৪–৮৬৩ হিজরি / ১৪২১–১৪৫১ খ্রিস্টাব্দ) কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের প্রচেষ্টা পুনরায় শুরু হয়।
এই সময় উসমানিরা বেশ কয়েকবার কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করে। এসব প্রচেষ্টার সময় বাইজেন্টাইন সম্রাট উসমানি বাহিনীর মধ্যে ফিতনা ও বিভেদ সৃষ্টি এবং সুলতানের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সাহায্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। এভাবে খ্রিস্টান সম্রাট সাময়িকভাবে সুলতানকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে সক্ষম হয় এবং উসমানিরা তখন কনস্টান্টিনোপল বিজয় করতে পারেনি।
অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় বায়েজিদের পুত্র সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহের শাসনামলে।





















