প্রায়ই কিছু বিশ্লেষক ও অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক ভাষ্যকার প্রশ্ন তোলেন, আফগানিস্তান কেন তার প্রতিবেশী ও আশপাশের দেশগুলোর মতো উন্নত ও সমৃদ্ধ হতে পারেনি। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও বিভক্তির কারণে আফগানিস্তান উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।
কথাটি পুরোপুরি অমূলক নয়। গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি নিঃসন্দেহে আফগানিস্তানের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। তবে এখানে আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার। যেসব আঞ্চলিক দেশ নিজেদের উন্নত ও সমৃদ্ধ করেছে, তার মূল্য তারা কীভাবে দিয়েছে?
প্রতিবেশী দেশগুলোর কথাই যদি ধরা হয়, বিশেষ করে আমাদের উত্তরের প্রতিবেশীদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের উন্নয়ন ও বর্তমান অবস্থান গড়ে ওঠার পেছনে রাশিয়ার বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। অথচ যেসব শাসনব্যবস্থাকে কথিত ইসলামী রাষ্ট্র বলা হয়, সেগুলো ইসলামকে তো দূরের কথা, নিজেদের জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বও করে না। আজও তাদের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সুতো বিদেশি শক্তির হাতেই রয়ে গেছে।
কেউ যদি মনে করেন, আজ কিছু দেশ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, সেই অবস্থান অর্জনের জন্য ব্রিটিশ, রুশ ও আমেরিকান শক্তির সামনে আফগানিস্তানেরও নীরব থাকা উচিত ছিল, তাহলে তাঁর হিসাব সম্পূর্ণ ভুল। আফগানিস্তানের সব সংগ্রাম ও জিহাদের পেছনে শুরু থেকেই একটি লক্ষ্য ছিল, আর তা হলো একটি ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
একটি বিশুদ্ধ ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং শরিয়াহ বাস্তবায়ন আফগান জনগণের ঐতিহাসিক ও মৌলিক দাবি ছিল এবং এখনো তা-ই রয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আফগানিস্তানে ইসলামী ইমারত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
পশ্চিমা ও মানবপ্রণীত আইনকে সরিয়ে তার জায়গায় বিশুদ্ধ শরিয়াহভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটি ছিল জনগণের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক দাবি। সেই দাবি বাস্তবায়নের পর আফগানিস্তানের মর্যাদা ও জাতীয় অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এখন তারা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে মাথা উঁচু করে সমান মর্যাদায় কথা বলতে পারে।
অতীতে যারা মুজাহিদ ও জিহাদের নাম ব্যবহার করে নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে, যারা প্রজাতন্ত্রের সময় শরিয়াহ বাস্তবায়নের স্লোগান দিয়েছে, আজ তাদেরই কেউ কেউ নতুন রূপে ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়েছে। তারা বর্তমান ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিচ্ছে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পরামর্শ ও সহযোগিতা, বিশেষ করে শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী শক্তিগুলোর সহায়তা নিয়ে তারা বর্তমান ইসলামী ব্যবস্থার সামনে নানা সমস্যা ও সংকট তৈরি করতে চাইছে।
পবিত্র স্লোগানের আড়ালে আবারও অন্যের সন্তানদের ব্যবহার করে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাদের এই স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না। এর পেছনে দুটি বড় ও শক্তিশালী কারণ রয়েছে।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, আফগান জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে শিখেছে। কে সত্যিকার অর্থে ইসলামের প্রতি অনুগত আর কে ইসলামী মূল্যবোধকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, তা তারা এখন বুঝতে পারে। এ কারণেই বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ফাঁকা স্লোগান দিয়ে তাদের আর বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় কারণ হলো, ইসলামী ইমারত কেবল এমন একটি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নয়, যারা ধর্ম সম্পর্কে ধারণা রাখে। এটি একই সঙ্গে একটি সামরিক শক্তিও। আঞ্চলিক পর্যায়ে এই বাহিনী যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছে। ইসলাম ও ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করেছে, এখন পর্যন্ত তাদের কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে।
এসব বিদ্রোহীর ব্যাপারে শরিয়াহর সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। বিদ্রোহীদের দমন ও নির্মূলের মাধ্যমে ইসলামী বাহিনী তাদের জিহাদ অব্যাহত রেখেছে এবং দেশ ও জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
বিদ্রোহী এবং যারা বিদ্রোহের ঢোল পেটাচ্ছে, তাদের বুঝতে হবে যে তারা আল্লাহ তাআলার পথে নেই। একই সঙ্গে জনগণের দাবির প্রতিনিধিত্ব করার দাবিও তারা করতে পারে না। তারা আসলে নিজেদেরই প্রতারণা করছে এবং নিজেদের এমন পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার কারণে ইসলামী ইমারতের মুজাহিদ বাহিনীর ক্রোধ ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
এই বাহিনী তাদের আমির ও ইসলামী শরিয়াহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অনুমোদন নিয়ে কাজ করছে। বর্তমান নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে এবং যেকোনো বিদ্রোহ দমন করতে তারা প্রয়োজনে নিজেদের জীবন ও শাহাদাত পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
তাই তাদের প্রতি যুক্তিসংগত পরামর্শ হলো, নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন না এবং বরাবরের মতো বাস্তবতা থেকে দূরে সরে থাকবেন না। এই নিপীড়িত জাতির এখন প্রয়োজন সেবা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা। ইসলামী শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা তাদের ছিল, তা ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়েছে। এখন সেই আকাঙ্ক্ষার দ্বিতীয় ধাপ হলো দেশ ও ভূখণ্ডকে রক্ষা করা, তাকে উন্নত করে তোলা এবং বিশ্বদরবারে তার মর্যাদা আরও উঁচু করা।
স্বাভাবিকভাবেই যারা এই আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের জন্য এই দেশ ও দেশের মানুষের মাঝে আর কোনো জায়গা থাকবে না। তারা চিরকাল অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েই থাকবে।





















