যে আফগানিস্তান শতাব্দীর পর শতাব্দী যুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও অনিরাপত্তার কঠিন ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে এসেছে, আজ তার ইতিহাস এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যাকে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের এক মাইলফলক বলা যায়। সম্ভবত এই জাতির ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি সময় এসেছে, যখন শুধু কামান ও বন্দুকের শব্দই স্তব্ধ হয়নি, বরং বিশাল এই দেশের প্রতিটি প্রান্তে সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনও স্বাভাবিক গতিতে ফিরে এসেছে। এই নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কোনো সাময়িক কিংবা উপরিতলের অর্জন নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর গভীরে সংঘটিত এক মৌলিক পরিবর্তনের ফল, যা ইসলামী ব্যবস্থার ছায়াতলে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বিশ্বের সামনে আফগানিস্তানের একটি নতুন চিত্র তুলে ধরেছে।
আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার কথা উঠলেই মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই এই ভূখণ্ডের অশান্ত অতীত ভেসে ওঠে। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের খুব কম মানুষই হয়তো এমন কোনো দিন দেখেছে, যেদিন বিস্ফোরণ, যুদ্ধ কিংবা হত্যাকাণ্ডের খবর শোনা যায়নি। কিন্তু আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সড়কগুলোতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিজেদের কাজকর্মে ব্যস্ত। বাজারগুলো গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে এবং জমজমাট বেচাকেনা চলে। স্কুলে যাওয়া শিশুরা খেলাধুলা ও পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা মাথায় নিয়ে পথে বের হয় না। পরিবারগুলোও রাতে অন্ধকারের মধ্যেই উদ্যান ও জনসাধারণের চলাচলের পথে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়, কোনো ধরনের নিরাপত্তাহীনতার ভয় ছাড়াই।
এই দৃশ্য ইতিহাসের বইয়ে পড়া সেই আফগানিস্তানের কথাই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু জীবিত প্রজন্মের স্মৃতিতে এমন আফগানিস্তানের বাস্তব অভিজ্ঞতা খুব কমই আছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো পুরো দেশে আইন ও শৃঙ্খলার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ইসলামী ব্যবস্থা সুসংগঠিত ও সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলে বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় এবং বিভক্তিকে ঐক্য ও সমন্বয়ে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে সব নিরাপত্তা বাহিনী একটি একক কমান্ড ও অভিন্ন কৌশলের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। দায়িত্বের পারস্পরিক সংঘাত, স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ড কিংবা বেআইনি হস্তক্ষেপের মতো বিষয়গুলোও এখন আর আগের মতো দেখা যায় না।
একক নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামো দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং হুমকি প্রতিরোধের সামর্থ্যকে নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সম্ভাব্য যেকোনো হুমকি দ্রুত শনাক্ত করে মোকাবিলা করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শত্রুরা এখন আর ক্ষমতার শূন্যতা কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশের নিরাপত্তার ক্ষতি করার মতো পরিস্থিতি খুঁজে পাচ্ছে না।
বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামী ব্যবস্থা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে ভেঙে পড়া আস্থা পুনর্গঠনে সক্ষম হয়েছে। জনগণ এখন আর কেবল নিরাপত্তা পরিস্থিতির নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়। নিরাপত্তা রক্ষায় তারা নিরাপত্তা বাহিনীর পাশে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
সময়মতো তথ্য প্রদান, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা দৃঢ় পারস্পরিক সম্পর্কের স্পষ্ট নিদর্শন। এই সহযোগিতার ফলে এমন শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে যে, কোনো বিদেশি হুমকি কিংবা অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ব্যাপক আকার ধারণ করে সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই জনগণের সম্মিলিত সংকল্প ও প্রতিরোধের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে।
এই স্থিতিশীলতার আরেকটি স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায়। বছরের পর বছর অনিরাপত্তা বিনিয়োগ ও উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় সড়কগুলো নিরাপদ বাণিজ্যপথে পরিণত হয়েছে। বিনিয়োগকারীরাও আগের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রহ নিয়ে অবকাঠামো ও উৎপাদনমুখী প্রকল্পের দিকে এগিয়ে আসছেন।
এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে তুলনামূলক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে, বেকারত্ব কমছে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে উন্নত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের প্রত্যাশা বাড়ছে। নিরাপত্তা এখন অর্থনীতির অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। শান্তি ও উন্নতির এই পারস্পরিক সম্পর্কই প্রমাণ করে যে বর্তমান স্থিতিশীলতা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এর বাস্তব প্রভাব মানুষের প্রতিদিনের জীবনেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।
কোনো অতিরঞ্জন ছাড়াই স্বীকার করতে হয়, আফগানিস্তানের বর্তমান অভূতপূর্ব নিরাপত্তা অন্য যেকোনো বাহ্যিক কারণের তুলনায় ইসলামী ব্যবস্থার দৃঢ় সংকল্প এবং জনগণের পূর্ণ সহযোগিতারই বেশি ফল। কোনো বিদেশি শক্তি আফগানিস্তানকে এই শৃঙ্খলা ও শান্তি উপহার দেয়নি। বরং এই জাতিই নিজেদের ঈমান, ঐক্য এবং নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নিতে সক্ষম হয়েছে।
আজকের নিরাপত্তাকে আফগানিস্তানের অতীত পরিস্থিতি থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে মূলত এ বিষয়টিই। সংকটে জর্জরিত একটি দেশে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি নিজেদের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা একটি নিজস্ব মডেল হিসেবেও সামনে এসেছে।
আজকের স্থিতিশীল আফগানিস্তান কেবল কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। ইতিহাসে অতুলনীয় এই নিরাপত্তা শুধু বেদনাদায়ক অতীতের স্মৃতির পাতা উল্টে দেয়নি, বরং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য একটি নতুন দিগন্তও উন্মোচন করেছে।
এই মহান অর্জন একটি মূল্যবান উত্তরাধিকার। প্রজ্ঞা, জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে একে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমানত হিসেবে তুলে দিতে হবে।





















