ইসলামী ইমারাত ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পাকিস্তানি সামরিক রেজিম অনুভব করেছে যে, কয়েক দশক পর আফগানিস্তান এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পূর্ণ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উপভোগ করছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আফগান ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপের সব সম্ভাবনাই স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে সামরিক রেজিম নিজেদের তৈরি প্রক্সি ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর সমর্থনও হারাতে শুরু করেছে। কারণ, জনগণের মধ্য থেকে উঠে আসা এই সরকার নিজ জনগণের মাঝেই থেকে তাদের জাতির জন্য কাজ করছে।
গত পাঁচ বছর ধরে সামরিক রেজিমের নেতৃবৃন্দ এবং পাঞ্জাবের ধনী শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চিন্তা ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রেই আফগানিস্তানবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে এবং নিজেদের সব দুর্বলতা ও ব্যর্থ নীতির দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মুসলিম জনগণ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে, সামরিক রেজিমই সম্পূর্ণভাবে দায়ী এবং তারা ভুল পথে এগিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা নিজেদের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং এই দুই মুসলিম জাতির মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে, যদিও দুই দেশের জনগণের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য।
বর্তমানে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বেলুচ স্বাধীনতাকামীদের যুদ্ধ, টিটিপির মুজাহিদদের সংগ্রাম, পিটিএমের প্রচারণা, পিটিআই সমর্থকদের বিক্ষোভ এবং আরও বহু গোষ্ঠী কিংবা পাকিস্তানের নিজেদের তৈরি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হামলা চলছে। এসবই এমন কর্মকাণ্ড, যেগুলো পাকিস্তান প্রথমে নিজেদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি ও পরিচালনা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি তাদের হাতের বাইরে চলে যায়। বিপুলসংখ্যক সেনা, প্রযুক্তি ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। এরপর নির্লজ্জভাবে নিজেদের জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে এসবের সম্পূর্ণ দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়েছে এবং দাবি করেছে, আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় এসব কর্মকাণ্ড আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এই অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এখন আর বিশ্ব এতটা অন্ধ নয় যে, এই দ্বিমুখী খেলা বুঝতে পারবে না।
কোনো ব্যবস্থা টিকে থাকা ও বৈধতা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জনগণের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ও জনসমর্থন। এই জনসমর্থনই একটি সরকারকে বৃহৎ শক্তির মোকাবিলা করতে এবং নিজের পরিচয়, ভূখণ্ড ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম করে। কিন্তু সামরিক রেজিমের মধ্যে এসব কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই। তাদের জনগণের সমর্থন নেই, আবার নিজেদের আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচিত ব্যবস্থা হিসেবেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। তারা মূলত সামরিক জেনারেলদের এমন একটি গোষ্ঠী, যারা পশ্চিমাদের সন্তুষ্ট করতে নিজেদের জনগণের রক্ত নিয়েই বাণিজ্য করছে।
এই কারণেই পাকিস্তানের জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতে এবং নিজেদের দুর্বলতা আড়াল করতে তারা নির্লজ্জভাবে জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা করে। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ও মিথ্যাবাদী মুখপাত্রদের সহায়তায় তারা পাকিস্তানের জনগণের মনোযোগ সামরিক রেজিমের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাগুলো থেকে সরিয়ে আফগানিস্তানের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করে। তারা প্রথমেই আফগানিস্তানকে দায়ী করে দাবি করে যে, তাদের বিরোধীদের নাকি সেখানে অস্ত্র ও সহায়তা দেওয়া হয় এবং পরে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। অথচ প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কর্মকাণ্ডই সামরিক রেজিমের নিজস্ব কর্মকৌশলের অংশ।
বাস্তবতা হলো, সামরিক রেজিম ইসলামী ইমারতের সেই অঙ্গীকারের কথা ভুলে যায়, যেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে আফগান ভূখণ্ড কখনো কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না এবং এই ভূমি কখনো অন্যদের জন্য অনিরাপত্তার উৎসে পরিণত হবে না। এর বিপরীতে, সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও প্রতিবেশীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মূল কারণ হিসেবে পাকিস্তানই দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছে। সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত প্রজননকেন্দ্রও তারাই তৈরি করেছে।





















