আপনাদের হয়তো মনে আছে, ২০২৬ সালের মে মাসে হুরাম সাঈদ পাঠান নামের প্রায় বারো বছর বয়সী এক কিশোরী পেশোয়ার থেকে অপহৃত হয়েছিল। পরে তাকে সিন্ধুর কাচা অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয়। কাচা অঞ্চলের যেসব চোর তাকে অপহরণ করেছিল, তারা নিজেদের দলেরই এক নিকৃষ্ট তরুণ চোরের সঙ্গে ওই কিশোরীর জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তখন সম্ভবত অপহরণের ঘটনাটি প্রায় এক মাস ধরে চলছিল।
তার মা-বাবা গভীর দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণও আদায় করা হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখে মনে হচ্ছিল, শিশুটিকে মুক্ত করার জন্য সিন্ধু সরকার কোনো চেষ্টাই করেনি। সরকারের এই উদাসীনতার কারণেই রাষ্ট্রের সহায়তার আশা ছেড়ে দেওয়া ‘সম্মানবোধসম্পন্ন সশস্ত্র ব্যক্তিরা’ বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে গাড়িবহর নিয়ে নিজেরাই কাচা অঞ্চলের উদ্দেশে রওনা হন, যাতে বারো বছর বয়সী হুরাম সাঈদ পাঠানকে উদ্ধার করা যায়। এরপর শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।
এখন ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের আইন ও বিচারবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী আজম নাজির তারার নিজস্ব এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমা গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সামনে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন,
“খাইবার পাখতুনখাওয়ার পশতুনরা তাদের ছোট ছোট মেয়েকে জোর করে বিয়ে দিয়ে থাকে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও গুরুতর একটি সমস্যা। এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ফেডারেল সরকার অনুভব করেছে। এ কারণেই আমরা খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি করছি।”
অন্যদিকে, এই একই আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার পাকিস্তানের জনগণকে বলছেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সন্ত্রাসবাদ রয়েছে, আর সে কারণেই সেখানে গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি করা হচ্ছে। পাকিস্তানের ওপর নিজেদের চাপিয়ে দেওয়া পাঞ্জাবের শাসকেরা নিজেদের জনগণের সঙ্গে এমন দ্বিমুখী আচরণ করেন কেন?
পশ্চিমা বিশ্ব ও অবিশ্বাসীদের সামনে তাঁরা বলছেন, “অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া বন্ধ করতে গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।” অথচ পাকিস্তানের জনগণের কাছে তাঁরা সন্ত্রাসবাদকে এর কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
প্রশ্ন হলো, এই পশ্চিমা বিশ্ব আসলে কে? অবিশ্বাসীদের এই জগৎকে আপনারা এত গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন কেন? আপনাদের নিজেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আপনারা কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রদেশে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছেন।
পশ্চিমা বিশ্ব কি আপনাদের পথপ্রদর্শক, যে আপনাদের কর্তৃত্ব প্রদান করে? পশ্চিমা বিশ্ব কি আপনাদের উপাস্য? ইসলাম নয়, পশ্চিমা বিশ্বই কি আপনাদের রিজিক, আপনাদের কন্যাসন্তান এবং তাদের বিয়ের বিষয়ে কর্তৃত্ব ও আইনকানুন নির্ধারণ করে দেয়?
আপনারা যদি পাঞ্জাবে বসে খাইবার পাখতুনখাওয়ার বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে এসব ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, তাহলে পেশোয়ার থেকে পাঞ্জান পেরিয়ে সিন্ধু পর্যন্ত বারো বছর বয়সী হুরাম সাঈদ পাঠানকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া, কাচা অঞ্চলের এক নিকৃষ্ট তরুণ চোরের সঙ্গে ওই নিষ্পাপ শিশুর জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং এসব ঘটনায় সিন্ধু ও পাঞ্জাব সরকারের নীরবতা সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বকে ব্যাখ্যা দেননি কেন?
খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ের অপপ্রচার চালিয়ে তাঁদের বদনাম করা পাঞ্জাবের ফেডারেল আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার কি পশ্চিমা সাংবাদিকদের এ কথাও জানিয়েছেন যে,
“পাঞ্জাব পুলিশের সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সমগ্র পাঞ্জাবে নারীদের ধর্ষণের ৪,৪৪৬টি এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের ৯৪০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় এমনকি পুলিশ সদস্যরাও নিজেদের পাঞ্জাবের কন্যাদের সম্ভ্রমহানির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।”
লাহোরের গাজী আবাদ থানায়ও এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। পাকিস্তানের স্বাধীনতার মাস আগস্টের ২ তারিখ, রবিবার, ঘটনাটি ঘটে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক নিষ্পাপ কিশোরীকে ধর্ষণ করে গাজী আবাদ থানার মালখানায় আটকে রাখা অপরাধীর নাম ছিল ইমরান। তিনি তদন্ত শাখায় সহকারী উপপরিদর্শক বা এএসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তা কিশোরীটিকে থানার ওপরতলার একটি কক্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে পাঞ্জাব পুলিশের এই ‘গর্বিত সন্তান’ নিজের প্রদেশেরই এক কন্যার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালান।
একইভাবে সিন্ধুর জ্যাকোবাবাদ এলাকাতেও পুলিশের ধর্ষণের একটি ঘটনা ঘটেছিল। ২০২৬ সালের ১৮ ও ১৯ জানুয়ারির দিকে থুল তহসিলের আরডি-৫২ থানায় ঘটনাটি ঘটে।
একটি হত্যা মামলার তদন্তের অজুহাতে পুলিশ ওই থানায় এশিয়া খোসো নামের সতেরো বছর বয়সী এক কিশোরীকে বেআইনিভাবে আটক করে রেখেছিল। তার সঙ্গে তার বোন ও দাদিকেও আটক করা হয়েছিল। পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী বিয়ের জন্য নির্ধারিত আঠারো বছর বয়স তখনও তার পূর্ণ হয়নি। থানার এএসআইসহ ছয়জন পুলিশ সদস্য সতেরো বছর বয়সী এশিয়া খোসোকে ধর্ষণ করেন। চিকিৎসা পরীক্ষাতেও ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছিল।
পাঞ্জানের ফেডারেল আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার কি পশ্চিমা সাংবাদিকদের এ কথাও জানিয়েছেন যে,
“উপরে উল্লিখিত পাঞ্জাব পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পাঞ্জানে নারীদের অপহরণের ৫,৮১৪টি এবং ধর্ষণ কিংবা জোরপূর্বক বিয়ের উদ্দেশ্যে অপহরণের ১৩,২০৮টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।”
একইভাবে, পশ্চিমা বিশ্বের সামনে এসব ব্যাখ্যা দেওয়া আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার কি ইংরেজিভাষী সাংবাদিকদের ইংরেজিতে এ কথাও জানিয়েছেন যে,
“অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে ও জোরপূর্বক বিয়ের বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং বেসরকারি সংস্থা সাহিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে নথিভুক্ত এ ধরনের মামলার সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭৪ থেকে ৭৮ শতাংশই ঘটে পাঞ্জাবে।”
যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়াই জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারির কারণ হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো, খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকার কি সরকারি উদ্যোগে এসব বিয়ে সম্পন্ন করেছে? যদি এটাই কারণ হয়, তাহলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ের ৭৮ শতাংশ ঘটনা যখন পাঞ্জাবেই ঘটে, তখন সেই যুক্তি অনুযায়ী সবার আগে পাঞ্জাবেই জরুরি অবস্থা জারি করা উচিত। অবশ্য জনগণের ভাষায় বললে, সেখানে ‘গভর্নর শাসন’ তো এমনিতেই চলছে!
এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, পাঞ্জাব ও ফেডারেল সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া এবং সেখানকার খনিজ সম্পদ লুট করা। এর ফলে কেবল পাঞ্জান, আর পাঞ্জানের মধ্যে কেবল সামরিক ব্যক্তিরাই লাভবান হবে। অন্যদিকে, রাজনীতিবিদেরা দশ টাকার একটি চকলেটের মতো তুচ্ছ সুবিধার বিনিময়ে ‘আদর-যত্নে রাখা সেনাবাহিনীর সম্মানিত অধীনস্থ’ হিসেবে দিন কাটাবেন। সশস্ত্র বিরোধিতা ও মেয়েদের বিয়ের বিষয়গুলো নিছক অজুহাত মাত্র।
এ কারণে কেউ যদি মনে করেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি করলে পাকিস্তানে সশস্ত্র বিরোধিতা বন্ধ হয়ে যাবে, তাহলে তিনি সম্পূর্ণ ভুল ভাবছেন। কারণ, পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী গভর্নর শাসন সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। আর এই ছয় মাসের মধ্যে প্রদেশে জনগণের নতুন সরকার গঠন করা ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব। এটাও সবার কাছে স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের প্রকৃত শাসক হলো সেনাবাহিনী।
এখন সেনাবাহিনী যখন খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটি অজুহাত পেয়ে গেছে, তখন কে বিশ্বাস করবে যে, তারা তাদের পরামর্শদাতা জিয়াউল হকের মতো মধ্যরাতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করবে না? নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দশ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকবে না? আর ছয় মাস পর নিশ্চিতভাবেই খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করবে?
যে ব্যক্তি এসব বিশ্বাস করেন, তাঁর কাছে কি হোয়াটসঅ্যাপে কোনো ‘দলিল ও সনদ’ পাঠানো হয়েছে যে, সেনাবাহিনী নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে?
আর ছয় মাস কিংবা তার কিছু বেশি সময় পর যদি কোনো রাজনৈতিক সরকার গঠিতও হয়, তাহলে সেটি কি সত্যিই জনগণের সরকার হবে? সেই কথিত জনগণের সরকার কি নিজেই জানতে পারবে যে, জনগণের ভোটে তার নির্বাচন হয়েছে? এসবের নেপথ্যে থাকবে পাঞ্জাব সরকার ও সেনাবাহিনী।
জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের প্রসঙ্গে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। পাকিস্তানে বন্দুকের সংস্কৃতি এত গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে যে, একে শুধু ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করাটা অত্যন্ত সরলীকরণ। প্রকৃতপক্ষে, একে ‘সামরিক সন্ত্রাসবাদ’ বলা উচিত। এ কারণে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সেনাবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখতে এখন একই ধরনের সশস্ত্র সহিংসতা আরও বাড়ানো হবে। এমন সহিংসতা, যেখানে সেনাবাহিনী নিজেই বোমা হামলা ও এ ধরনের ঘটনা ঘটায়, অথবা অন্যদের দিয়ে ঘটায়, তারপর সেগুলোকে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে।
এ বিষয়ে মেজর আদিল রাজা, সেনাবাহিনীর হাতে গুম হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে নিহত জেনারেল শহীদ আজিজ এবং বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফের আগের ও সাম্প্রতিক বক্তব্য নথিভুক্ত রয়েছে। এসব বক্তব্যের পক্ষে শক্ত প্রমাণও রয়েছে।





















