স্বল্পবয়স ও অপরিপক্বতা: দূরদৃষ্টিহীন আবেগী উদ্দীপনার বিপদ
খাওয়ারিজদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য, যার কথা রাসূলুল্লাহ ﷺ উল্লেখ করেছেন, তা হলো তাদের স্বল্পবয়স ও অপরিপক্বতা। এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য যুবক কিংবা কম বয়সীদের নিন্দা বা হেয় করা নয়; বরং এমন একটি অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করা, যখন মানুষ জ্ঞান ও চিন্তাগত পরিপক্বতা অর্জন না করেই আবেগ ও অনুভূতির বশবর্তী হয়ে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জড়িয়ে পড়ে এবং পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়াই ঈমান, কুফর, জিহাদ, সমাজ ও মানুষের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরা সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে মুসলমানদের কাফের ঘোষণা করে এবং তাদের ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মনে করে। মুসলমানদের দ্রুত তাকফির করার পেছনে তাকফিরকারীদের স্বল্পবয়স ও চিন্তাগত অপরিপক্বতাও একটি কারণ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«يَخْرُجُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ قَوْمٌ، أَحْدَاثُ الْأَسْنَانِ، سُفَهَاءُ الْأَحْلَامِ، يَقُولُونَ مِنْ خَيْرِ قَوْلِ الْبَرِيَّةِ»
“শেষ যুগে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যাদের বয়স হবে কম এবং বুদ্ধি হবে অপরিপক্ব। অথচ তারা সৃষ্টিজগতের সর্বোত্তম কথাগুলোর মতো কথা বলবে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬১১)
এই হাদিসে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ কেবল তাদের কথার বাহ্যিক রূপের প্রতি ইঙ্গিত করেননি; বরং স্লোগানের সৌন্দর্য ও সঠিক উপলব্ধির মধ্যকার পার্থক্যও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কখনো কোনো ব্যক্তির কথা সম্পূর্ণ দ্বীনসম্মত, সুন্দর ও প্রভাবশালী মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে যদি জ্ঞান ও সঠিক উপলব্ধি না থাকে, তাহলে তার পরিণতি শরিয়তের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত হতে পারে।
এ কারণেই এই হাদিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, দ্বীনি বিষয়ে জ্ঞান ও চিন্তাগত পরিপক্বতার গুরুত্ব অপরিসীম। ঈমান, কুফর, জিহাদ, রক্তপাত ও মুসলমানদের অধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুতর ও সংবেদনশীল। কেবল আবেগ, শোনা কথা কিংবা ব্যক্তিগত উপলব্ধির ভিত্তিতে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না। তবে ইসলাম যুবকদের দ্বীনি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করেনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বহু সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুম যৌবনেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সুতরাং সমস্যা যৌবনে নয়; বরং যৌবনের সঙ্গে যখন অজ্ঞতা, অযাচিত তাড়াহুড়া ও দূরদৃষ্টির অভাব যুক্ত হয়, তখন তা ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের জ্ঞানগত ও চিন্তাগত প্রশিক্ষণের গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্বীনি আবেগ ও অনুভূতি তখনই প্রশংসনীয়, যখন তা জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা এবং পবিত্র কুরআন ও নববী সুন্নাহর সঠিক উপলব্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। অতএব, এই হাদিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, সংবেদনশীল দ্বীনি বিষয়ে আমাদের কেবল উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান ও আকর্ষণীয় কথায় প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়; বরং বক্তা তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি কোথা থেকে গ্রহণ করছেন, পবিত্র কুরআন ও নববী সুন্নাহ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি কতটুকু এবং তাঁর কথা ও কাজ শরিয়তের স্বীকৃত মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
সকল মুসলমানের উচিত এ ধরনের বিষয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া। অন্যদেরও এই গোষ্ঠীর তাকফিরি চিন্তাধারা ও আকিদা সম্পর্কে অবহিত করা তাদের দায়িত্ব। বর্তমান যুগে দাঈশ খাওয়ারিজরাও এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের যাবতীয় মনোযোগ এখন মুসলমানদের দিকেই নিবদ্ধ হয়েছে এবং সমকালীন সময়ে ইসলাম ও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলো তাদের পক্ষ থেকেই সাধিত হয়েছে। তারা ইসলামী বিশ্বের বহু দেশে উম্মাহর বিশিষ্ট আলেম ও নেতৃবৃন্দকে নির্মূল করার চেষ্টা করেছে। তাদের সব যুদ্ধই মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে এবং এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এই গোষ্ঠীও প্রাথমিক যুগের খাওয়ারিজদের মতো সেই একই অভ্যাস ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেগুলোর কথা রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর হাদিসসমূহে উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত তাদের সব বৈশিষ্ট্য ও অভ্যাস সম্পর্কে নিজে অবগত হওয়া এবং তাদের চিন্তাধারা ও আকিদার মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে ইসলামী ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা করা।



















