নবীজি ﷺ-এর যুগ
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি যে, অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই যুগে মানবজাতিকে সুখ, আলো ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করার জন্য কোনো নবী প্রেরণের প্রয়োজন ছিল কি না। এ নিবন্ধে আমি আরও একটি প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। এই মহান দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ মিশন বাস্তবায়নের যোগ্যতা কার ছিল?
এর উত্তর হলো, এমন এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধনের জন্য বিশেষ যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় গুণাবলির অধিকারী ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিল। অর্থাৎ, এত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের জন্য এমন একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল, যিনি নবুওয়াতের নেয়ামত ও সুস্পষ্ট ঐশী সমর্থনের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও প্রভাবশালী হবেন এবং মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার সক্ষমতা রাখবেন। তাঁর বংশমর্যাদা হতে হবে উন্নত, সাধারণ মানুষের নৈতিকতা ও প্রচলিত রীতিনীতি সম্পর্কে থাকতে হবে গভীর ধারণা, চারপাশের জগতের পরিবর্তন সম্পর্কে থাকতে হবে সচেতনতা এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয়, সে সম্পর্কেও থাকতে হবে সম্যক জ্ঞান। বিষয়টি নিজেই অত্যন্ত ব্যাপক। তবে মহান আল্লাহ অল্প কয়েকটি অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শব্দে এ সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا﴾
“আর আমরা কখনো শাস্তি প্রদান করি না, যতক্ষণ না কোনো রাসূল প্রেরণ করি।”
(সূরা আল-ইসরা, আয়াত ১৫)
এ কারণেই মহান আল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ﷺ-কে নবী হিসেবে মনোনীত করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে করেছেন নবুওয়াতের ধারার পূর্ণতাদানকারী, সর্বশেষ রাসূল এবং খাতামুন নাবিয়্যিন। নিঃসন্দেহে, সর্বশেষ নবী হিসেবে তাঁর ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব অন্যান্য নবীদের দায়িত্বের তুলনায় আরও গুরুতর ছিল।
ড. আল-সিবাঈ তাঁর দ্য লাইফ অব প্রফেট মুহাম্মদ: হাইলাইটস অ্যান্ড লেসনস (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ: দুরূস ওয়া ইবার) গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যেসব গুণাবলি তুলে ধরেছেন, তা তাঁর যোগ্যতা ও এই মহান দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। একই সঙ্গে এতে মহান আল্লাহর নিখুঁত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ মনোনয়নের বিষয়টিও প্রতিফলিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, তিনি এই মহান মর্যাদার যথার্থ অধিকারী ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রতিকূলতা ও কঠিন পরীক্ষাগুলো সফলভাবে অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি এবং মুহাম্মদি শরিয়তের গোড়াপত্তন হয়। সভ্যতা নির্মাণ এবং মানবজাতিকে দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও দুর্দশা থেকে উদ্ধার করার পথে প্রথম পদক্ষেপটিও সেখান থেকেই সূচিত হয়েছিল।
ইসলামের মহান নবী ﷺ-এর নবুওয়াতের মাধ্যমে এক নতুন ইসলামী সভ্যতার প্রথম নিদর্শনগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। এটি ছিল এক স্বতন্ত্র ও উন্নত বৈশিষ্ট্যের সভ্যতা, যা মানবজাতির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল মানবজাতিকে আত্মবিনাশ ও ধ্বংস, বিদ্বেষ ও অসম্মান, হত্যা ও লুণ্ঠন, চুরি ও বিশ্বাসঘাতকতা, অশ্লীলতা ও অসদাচরণ, বিশৃঙ্খলা ও সংকট, জুলুম ও সীমালঙ্ঘন, আগ্রাসন এবং পবিত্রতা লঙ্ঘনের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা। অন্যদিকে, মানুষকে জীবন, ঈমান ও আস্থা, নিরাপত্তা ও প্রশান্তি, আল্লাহ তাআলার পরিচয় ও বিশুদ্ধ আকিদা এবং ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ ও সৌভাগ্যের পথে পরিচালিত করাই ছিল এর লক্ষ্য। মানবজাতিকে হিদায়াতের মহান পথ দেখানো এবং তাদের বিজয় ও সফলতা নিশ্চিত করাই ছিল এই সভ্যতার অভীষ্ট উদ্দেশ্য।





















