আধুনিক শাসনব্যবস্থা অনেকগুলো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তবে এর মধ্যে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। একটি হলো নিরাপত্তা, অন্যটি রাষ্ট্র নির্মাণ।
ইসলামী ইমারত আফগানিস্তানের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে আসার সময় দেশটি ছিল এমন এক সংকটময় অবস্থায়, যখন প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে আফগানিস্তান ভিত থেকে এমনভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তার পতন ছিল প্রায় অনিবার্য। অথচ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দখলদার শক্তি ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার গঠন, রাষ্ট্র নির্মাণ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল।
তথাকথিত রাষ্ট্র নির্মাণের সবচেয়ে লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত ছিল একই সময়ে দুই প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের ঘটনা। গোটা বিশ্বের সামনে এই দৃশ্য আফগান জনগণের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। এমনকি পশ্চিমা গণতন্ত্রের তথাকথিত আধুনিক নীতিগুলোকেও তারা পদদলিত করেছিল। নিজেদের নির্বাচন, নিজেদের কমিশন, নিজেদের অভিযোগ, নিজেদের ফলাফল এবং নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করার পর শেষ পর্যন্ত নিজেদের ঘোষিত ফলাফলের বিরুদ্ধেই তারা বিদ্রোহে নেমেছিল। এর চেয়ে বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। এ দেশের প্রতিটি নাগরিক জানে, মানুষ তখন এমনকি ব্যবস্থা শব্দটিতেও বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। তথাকথিত সরকার শব্দটির প্রতিও তাদের আস্থা ও আগ্রহ হারিয়ে গিয়েছিল।
নিরাপত্তার অবস্থাও ছিল একই রকম স্পষ্ট। লক্ষাধিক সেনা এবং তাদের পেছনে থাকা আরও বিপুলসংখ্যক বিদেশি দখলদার বাহিনী, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রশস্ত্রের বিপুল সহায়তা থাকা সত্ত্বেও শহরগুলোর ভেতরেই সরকারবিরোধী আওয়াজ শোনা যেত। নিরাপত্তাহীনতা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ক্ষমতা, পদ ও অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষ এবং বিদ্রোহও থামেনি।
ইউনিফর্ম পরা কোনো পুলিশ বা সেনাসদস্য দিনের বেলায় বাহ্যিকভাবে দায়িত্ব পালন করত, অথচ রাত নামলেই সেই ব্যক্তিই হয়ে উঠত চোর, মাদকাসক্ত, ডাকাত কিংবা মানুষের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী। এরপর কোনো লজ্জাবোধ ছাড়াই এসব অপরাধের দায় চাপানো হতো ইসলামী ইমারতের ওপর। অথচ ইসলামী ইমারতের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে মানুষ স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করত, বিদ্যালয়গুলো চালু ছিল, স্বাস্থ্যসেবা এগিয়ে যাচ্ছিল এবং মানুষের মামলা ও বিরোধগুলো ন্যায়সংগতভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হতো।
এমন বহু ঘটনাও রয়েছে যে শহরাঞ্চল থেকে মানুষ নিজেদের সমস্যা নিয়ে ইসলামী ইমারতের আদালতে আসত এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের বিরোধের সমাধান পেয়ে ফিরে যেত।
প্রজাতন্ত্র যখন নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি ভোগ করে পতনের মুখে পড়ল, তখন সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলা হচ্ছিল তা হলো রাষ্ট্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর অবশিষ্ট নেই। ইসলামী ইমারতের বিজয়ের পরও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল, এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব হবে।
যারা প্রজাতন্ত্রের তথাকথিত রাষ্ট্র নির্মাণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কোটি কোটি ডলারের প্রকল্প এবং বিদেশ থেকে আনা বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে দেখেছিল, তারা স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত ছিল যে এখন এই বিশাল কাজ কীভাবে সম্পন্ন হবে।
কিন্তু বাস্তবতা তার সাক্ষ্য দিয়েছে। ইসলামী ইমারতের বিজয়ের প্রথম দিন থেকেই এই কাজ থেমে থাকেনি। কারণ ইসলামী ইমারতের বাহিনী ও কর্মকর্তারা নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র নির্মাণের এই দুই মৌলিক বিষয়ের প্রতি পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা ও দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রশাসনিক কার্যক্রম ও আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। সরকার পরিবর্তন ও দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা যাদের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত ছিল, তাদের অনেকের কাছেই এই দৃশ্য ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য।
নিরাপত্তার বিষয়ে এই মুহূর্তে বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। কারণ কোনো বিষয় যখন মানুষের নিজের চোখের সামনে এতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন সেটি প্রমাণ করার জন্য আলাদা বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না।
তবে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং তা গড়ে তোলার পদ্ধতি নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। কারণ বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি অনেক দিক থেকেই ব্যতিক্রমী। মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত পুনর্গঠন এবং পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো, বিধিবিধান ও কার্যক্রমের সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে জনগণের জন্য স্বস্তি ও সন্তুষ্টির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আজ জনগণ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যকার দূরত্ব অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। একজন মন্ত্রী, মহাপরিচালক কিংবা অন্য কোনো সরকারি কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের মতোই চলাফেরা করেন। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাতায়াত করেন, শহরের পথে হাঁটেন এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ নাগরিকের মতোই সফর করেন। প্রকৃত শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা এবং জনগণের আস্থা গড়ে ওঠে মূলত এই ধরনের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই।
তবে এখানেই জনগণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যেমন নেতৃবৃন্দের কাছে পরামর্শ দেওয়া, সমালোচনা করা এবং সংশোধন ও উন্নতির জন্য নিজেদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ রাখা হয়েছে, তেমনি প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিক ও দেশের প্রতিটি মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজ নিজ জাতীয় ভূমিকা পালন করা।
রাষ্ট্রব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং এ পর্যন্ত অর্জিত সাফল্যগুলোকে রক্ষা ও সমর্থন করাও জনগণের দায়িত্ব। কারণ সরকার ও জনগণের মধ্যকার এই পারস্পরিক দায়িত্ববোধ একটি জাতীয় অঙ্গীকার। একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকা, শক্তিশালী হওয়া এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এমন পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার কোনো বিকল্প নেই।





















