আবাবিল ও হাতি: শক্তি, ওজন এবং আদর্শের এক সহজ গল্প!

✍🏻 ​আকবার জামাল

আজ সচেতন বা অবচেতনভাবে ইসলামের শত্রুরা প্রোপাগান্ডার জন্য সব ধরনের ভয়াবহ পদ্ধতি প্রকাশ্যেই ব্যবহার করছে। ইসলামের অনুসারীদের অদ্ভুত সব নামে ডাকা হচ্ছে। তাদের ওপর নানা ধরনের কটূক্তি, অপবাদ এবং উপহাস ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে।

নিঃসন্দেহে, মুমিনদের যদি তাদের পরাক্রমশালী ও সাহায্যকারী রবের ওপর ঈমান না থাকত, তবে তারা অনেক আগেই বিলীন হয়ে যেত। মুমিনদের সৌভাগ্য যে, তারা আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর সাহায্যকারী সত্তার ওপর বিশ্বাস রাখে এবং নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর শাফায়াতের ওপর আস্থা রাখে। আর একারণেই তারা আজ পর্যন্ত অটল ও টিকে আছে।

ইসলামী ইমারাত আফগানিস্তানের একজন মুজাহিদের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন যে, ইসলামের ইতিহাসে বৈষয়িক উপকরণের দিক থেকে এমন সুযোগ খুব কমই এসেছে যখন মুসলিমরা জাগতিকভাবে ততটাই শক্তিশালী ছিল যতটা তারা ঈমানে মজবুত ও দৃঢ় ছিল। বরং অধিকাংশ সময়ই মুসলিমরা বৈষয়িক দিক থেকে দুর্বল ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বৈষয়িক দুর্বলতাও আল্লাহ তাআলার একটি নিয়ামত।

মানুষের স্বভাব এমন যে, সে যখন অসুস্থ থাকে তখন সুস্থ ও শক্তিশালী অবস্থার তুলনায় আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে এবং তাঁর নিকটবর্তী হয়।

অতএব, সম্পদের এই সীমাবদ্ধতাকেও আল্লাহ জল্লা জালালুহুর একটি নিয়ামত হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এভাবেও বোঝা যেতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনুগত এবং ইসলামের অনুসারীদের বিভিন্ন মাধ্যমে সফলতা দান করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুসলিমদের এই সীমিত বৈষয়িক সম্পদ কি প্রভাবের দিক থেকেও দুর্বল? মোটেও না। মুসলিমদের এই উপকরণগুলো আকার বা সংখ্যায় কম বা দুর্বল হলেও, প্রভাবের দিক থেকে মক্কা মুকাররমার সেই ছোট পাথরের মতো যা আল্লাহ তায়ালা ছোট ছোট আবাবিল পাখির ঠোঁটে রেখে বিশালাকার হাতিদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

এ কারণেই যখন ঈমানদারদের পক্ষ থেকে ইসলামের রক্ষায় বা শত্রুর প্রোপাগান্ডার জবাবে কোনো কথা বলা হয়, তখন শত্রু আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি যন্ত্রণা অনুভব করে। যেভাবে আবরাহা ছোট পাথরের আঘাতে চিৎকার করছিল এবং কাঁদছিল, আবাবিলের ঘটনা শক্তির বিচারে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ঈমানি দৃঢ়তার প্রতীক।

এই ঘটনাটি বোঝার জন্য একটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন করা যেতে পারে, যুদ্ধের জন্য একটি বিশাল হাতির সমান হতে কতগুলো আবাবিল প্রয়োজন হবে? এই প্রশ্নের দুটি দিক আছে; একটি বৈজ্ঞানিক এবং অন্যটি আদর্শিক।

যদি কেবল বৈজ্ঞানিক দিক থেকে ওজনকে দেখা হয়, তবে একটি আবাবিলের গড় ওজন প্রায় ২০ গ্রাম, যেখানে একটি যুদ্ধংদেহী হাতির ওজন প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার কিলোগ্রাম পর্যন্ত হয়। এই হিসেবে দুটির মধ্যে পার্থক্য বিস্ময়কর। যদি কেবল ওজনের ভিত্তিতে তুলনা করা হয়, তবে প্রায় সোয়া দুই লক্ষ (২,২৫,০০০) আবাবিল মিলে পাঁচ হাজার কেজি ওজনের একটি হাতির সমান হবে। এটি নিছক একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক তুলনা, যার উদ্দেশ্য সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা নয়, বরং কেবল শারীরিক পার্থক্য স্পষ্ট করা।

তবে আসল কথা ওজন নয়, বরং অর্থ ও আদর্শের। আবাবিল শারীরিকভাবে হাতিকে পরাজিত করতে পারে কি না তা গৌণ প্রশ্ন; আসল প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধে শক্তির প্রকৃত সংজ্ঞা কী? কুরআন মাজিদ সূরা ফিলে যেভাবে এই ঘটনাটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, তাতে শক্তি কেবল শারীরিক বিশালতার নাম নয়, বরং আসল শক্তি থাকে কর্তৃত্ব ও নির্দেশের মধ্যে।

কাবার চারপাশে কোনো সৈন্যদল ছিল না, ছিল না কোনো অস্ত্র, বাহ্যিক শক্তি বা সামরিক প্রশিক্ষণ। সেখানে ছিল কেবল আল্লাহর ঘর, যা ইসলামের একটি নিদর্শন। এটাই ছিল তার আসল শক্তি। একইভাবে আবাবিলদের কাছে কোনো সুসংগঠিত সেনাবাহিনী ছিল না, ছিল না তলোয়ার, গুলি বা মিসাইলের ভাণ্ডার। তাদের শারীরিক শক্তি যুদ্ধের যোগ্য ছিল না এবং তারা কারো কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণও নেয়নি। আবাবিলদের পাঠানো হয়েছিল কেবল কাবা রক্ষার জন্য। তাদের কাছে ছিল কেবল আল্লাহর নির্দেশ, আর এই নির্দেশই ছিল তাদের আসল শক্তি।

বৈজ্ঞানিক নীতি অনুযায়ী, প্রায় ২০ গ্রাম ওজনের একটি আবাবিল তার ঠোঁটে বড়জোর এক বা দুই গ্রাম ওজন বহন করতে পারে, যাতে তার উড়ন্ত অবস্থায় কোনো সমস্যা না হয়। অর্থাৎ, দুই-তিন গ্রাম বেশি ওজন নিলেই তার উড্ডয়ন ব্যাহত হতে পারে। এক বা দুই গ্রাম ওজন খুবই সামান্য। এই কণাগুলো কোনো অস্ত্র ছিল না বা কোনো ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরকও ছিল না, বরং ছিল স্রেফ একটি ছোট নুড়ি পাথর। কিন্তু যখন এই সামান্য কণা আল্লাহর নির্দেশ ও ইচ্ছার অনুগত হয়ে নড়াচড়া করে, তখন তা নিজের জাগতিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শক্তির প্রতীকে পরিণত হয়। এভাবেই শক্তির ধারণা বদলে যায়।

দুনিয়ার বাহ্যিক যুক্তি বলে যে, যার কাছে শক্তি ও অস্ত্র আছে সেই বিজয়ী, আর যার কাছে সৈন্যদল আছে সেই বিজেতা। কিন্তু হস্তীবাহিনীর ঘটনা আমাদের অন্য এক যুক্তি শেখায়। এখানে বিশাল দেহ অর্থহীন হয়ে যায়, হাতির আকার মূল্যহীন হয়ে পড়ে, সৈন্যসংখ্যার গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়। তখন আসল প্রশ্নটি দাঁড়ায়, আল্লাহ কী চান? তিনি কাকে উচ্চে তুলে ধরেন আর কাকে নিচু করেন? তাঁর ইচ্ছায় কে বিজয়ী আর কে পরাজিত?

এ কারণেই এই ঘটনায় আবাবিল কেবল একটি পাখি থাকে না, বরং একটি বার্তায় পরিণত হয়। এমন এক রূপক যা বলে দেয় যে, কেউ যদি সত্যের সাথে থাকে তবে দুর্বলও শক্তিশালী হতে পারে। তাই এই প্রশ্নটি কেবল জীববিজ্ঞান বা প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ঈমান ও চিন্তাদর্শের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। সংখ্যার বিচারে সোয়া দুই লক্ষ আবাবিল হোক বা দুই কোটি, বাস্তবতা হলো—আল্লাহ যখন চান, তখন একটি অতি সামান্য সৃষ্টিকেও ইতিহাসের সিদ্ধান্তকারী চরিত্রে রূপ দান করেন।

এই কাহিনী আসলে আবাবিল ও হাতির নয়, বরং ঈমান ও বস্তুবাদের ধারণার কাহিনী। এটি আমাদের শেখায় যে, শক্তিকে কেবল বৈষয়িক মাপকাঠিতে মাপা উচিত নয়। আসল শক্তি তা-ই যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু বিদ্যমান থাকে, সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

অতএব, ঈমানদারদের শত্রুর অস্ত্র ও প্রোপাগান্ডায় ভীত হওয়া উচিত নয়। রণক্ষেত্রে ঈমানদারের ছোঁড়া একটি গুলি বা মিডিয়ায় বলা একটি শব্দও শত্রুর হাজার হাজার সৈন্য ও পৃষ্ঠার ওপর ভারী হতে পারে। ঠিক যেভাবে ২০ গ্রামের আবাবিলের দুই গ্রামের নুড়ি পাথর পাঁচ হাজার কেজি ওজনের হাতি এবং তার ওপর সওয়ার আবরাহার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়েছিল।

এ কারণেই যখন কোনো সত্যবাদী মুজাহিদ ও দ্বীনের সেবক শত্রুর সামরিক বা প্রচারণামূলক আক্রমণের মোকাবিলা করে, তখন শত্রুর শক্তি ও প্রোপাগান্ডা একইভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, যেভাবে আবরাহার শরীর টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

Exit mobile version