ইতিহাস তোমাকে কীভাবে মনে রাখবে?

✍🏻 ​মুফতি সুলতান মুহাম্মাদ সাকিব

ইতিহাস হলো একটি জাতির বিবেকের জীবন্ত দলিল। বিশ্বের যে জাতিই সত্যনিষ্ঠ, নীতিবান এবং সত্যের অনুসারী উলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনা পেয়েছে, তারা কখনো পরাধীনতার শিকলে বন্দি থাকেনি; বরং সর্বদা স্বাধীনতার নিয়ামত নিয়ে বেঁচে থেকেছে।

এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, জাতিসমূহের মধ্যে আলেমদের মর্যাদা সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে সম্মানজনক। কারণ তাঁরাই দ্বীনের উত্তরাধিকারী এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার গুরুদায়িত্ব তাঁদের কাঁধেই ন্যস্ত। তাঁরাই সমাজকে বুদ্ধিভিত্তিক ও শারীরিক দাসত্ব থেকে উদ্ধার করেন এবং চিন্তার স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সম্মানের পথে আহ্বান করেন।

ইসলামী উম্মাহ তখনই সম্মান, মর্যাদা ও আলোকবর্তিকা লাভ করে, যখন জ্ঞান (ইলম) সজীব থাকে এবং আলেমদের সত্য বলার সাহস থাকে। কিন্তু ইতিহাস এও দেখায় যে, যখন জ্ঞান নীরব হয়ে যায় এবং সত্যের কণ্ঠকে রোধ করা হয়, তখন কেবল মিথ্যাই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে না, বরং অনেক সময় মিথ্যার ওপর সত্যের পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয়। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা: যখন জ্ঞানের ছায়ায় মিথ্যার আস্ফালন ঘটে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, আজ ইসলামকে দুর্বল করার জন্য বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক ও রাজনৈতিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. ইসলামী রাজনীতির নামে বিচ্যুতি ছড়ানো।
২. কৌশল বা ‘মাসলাহাত’-এর অজুহাতে সত্যকে বিকৃত করা।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, মুসলিম সমাজে এই উভয় এজেন্ডা কিছু আলেমের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং হে পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম, আপনারা সম্ভবত অজান্তেই এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।

ইসলামী রাজনীতি কেবল বইপুস্তকে পড়ার বিষয় নয়, কিংবা এর ওপর বড় বড় ভলিউম লিখে নিজেকে রাজনৈতিক চিন্তাবিদ দাবি করার নামও এটি নয়। বরং ইসলামী রাজনীতি হলো—কার্যত বিশ্বব্যাপী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং কাফেরদের রাজনৈতিক চক্রান্ত থেকে উম্মাহকে রক্ষা করা।

আমরা যদি আমাদের পূর্বসূরিদের জীবনের দিকে তাকাই, তবে দেখি যে তাঁরা দ্বীন রক্ষার জন্য অকাতরে কোরবানি দিয়েছেন। তাঁরা কারাবরণ, কষ্ট ও শাহাদাত বরণ করেছেন, কিন্তু সত্য বলা ছাড়েননি। কৌশলের নামে তাঁরা কখনো সত্যকে বিসর্জন দেননি; বরং শরীয়তের অস্তিত্বের জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছেন। এই পথই ইতিহাসে তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ স্থান করে দিয়েছে এবং তাঁদের ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিশিষ্ট পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে কেন আপনারা আজ ‘মাসলাহাত’ ও রাজনীতির নামে গণতন্ত্রের দোলনায় দুলছেন? সময় এসেছে পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করার, কৌশলের আড়ালে সত্য বলা থেকে বিরত না থাকার এবং সাহস ও দৃঢ়তার সাথে উম্মাহকে পথপ্রদর্শনের দায়িত্ব পালন করার।

ইতিহাস আপনাদের নীরবতা এবং আপনাদের অবস্থান—উভয়ই লিপিবদ্ধ করবে। তাই সত্যের পাশে দাঁড়ানোই শ্রেয়, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আপনাদের তিরস্কারের বদলে সম্মানের সাথে স্মরণ করে। কারণ ফিকহী মূলনীতি হলো:
“ক্ষতি দূর করা কল্যাণ অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।” (درء المفاسد مقدم علی جلب المصالح)
যদি কোনো তথাকথিত কৌশল সত্য গোপনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটি কৌশল নয়, বরং ক্ষতি।

সত্যের নামে মিথ্যার গুণকীর্তন
পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং এর মুসলিম জনগণ সম্মানের যোগ্য, তাদের প্রশংসা ন্যায়সঙ্গত। তেমনিভাবে আলেমদের দ্বীনি খেদমতও স্বীকৃতির দাবি রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আপনারা কোন শরয়ী যুক্তিতে পাকিস্তানের প্রশংসার ব্যানারে অপরাধী চক্রকে সমর্থন দিচ্ছেন? কিসের ভিত্তিতে আপনারা তাদের স্তুতি গাইছেন? কোন অর্জনের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানের সম্মান বা মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে?

আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের বর্তমান ব্যবস্থার বিশেষ চক্রটি কি কোনো দৃশ্যমান কাজের জন্য প্রশংসার যোগ্য? কোন কাজের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানকে উচ্চে তুলে ধরেছে? এগুলো কেবল কথার কথা নয়; এগুলো এমন প্রশ্ন যার উত্তর ইতিহাস ইতিমধ্যে লিখে রেখেছে।

১. তারা গাযযার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সাথে সামরিক সহযোগিতা গ্রহণ করেছে।
২. এই চক্রটি কি আফগানিস্তানে ইসলামী ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য ন্যাটোর কাছে নিজেদের জমি ও আকাশপথ ছেড়ে দেয়নি?
৩. এই একই চক্র কি বিশ্বকুফরি জোটের সাথে শত্রুতার অভিযোগে আমাদের ডজন ডজন প্রথিতযশা আলেম ও নেতাকে গুম করেনি?
৪. আমাদের রক্তের যদি আপনাদের কাছে কোনো মূল্য না-ও থাকে, তবে অন্তত লাল মসজিদের নিষ্পাপ ছাত্রদের রক্ত এবং তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা স্মরণ করুন। আপনাদের বোন ডক্টর আফিয়া সিদ্দিকীর কথা মনে করুন, যাকে ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। শহীদ শায়খ নসীব খান (রহ.)-এর বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া বুকের কথা মনে করুন। হক্কানিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা সামিউল হক (রহ.)-এর নির্মম শাহাদাত এবং তাঁর ছেলে মাওলানা হামিদুল হক (রহ.)-এর ক্ষতবিক্ষত দেহের কথা ভেবে কি আপনাদের লজ্জা হয় না?
৫. আপনারা যদি আগের কথা ভুলে গিয়ে থাকেন, তবে যা নিজেদের চোখে দেখেছেন তা কেন অস্বীকার করছেন? দ্বিতীয়বার আফগানরা কীভাবে তাদের পূর্ববর্তী ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল? আপনারা এর সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

কিন্তু এরপর এই শাসকচক্রই মার্কিন স্বার্থে ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, আফগানিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করে এবং বিভিন্ন প্রদেশে নিরপরাধ শিশু ও বয়স্কদের রক্ত ঝরায়। ‘ওমিদ ক্যাম্প’ হামলায় ৪০০-এর বেশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শহীদ করা হয়েছে—এমন নিষ্ঠুরতা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

হে পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম!
আমি আপনাদের বলছি যে, উপরোক্ত অপরাধগুলোর পাশাপাশি আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন এই বিশেষ চক্রটি পাকিস্তানের নামকে কলঙ্কিত করেছে। এটি ইতিহাসের পাতায় জনগণের জন্য অগণিত তিরস্কার রেখে গেছে, পূর্বসূরিদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করেছে, আলেমদের বন্দি করেছে এবং তাঁদের শহীদ ও আহত করেছে।

তাই জেগে উঠুন! এই মার্শাল পাকিস্তানের জন্য সম্মান বয়ে আনেনি; বরং সে পরাধীনতার ময়দানে পাকিস্তানের নামকে এমনভাবে প্রদর্শন করেছে যে স্বয়ং পরাধীনতাও এতে লজ্জিত।

হে পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম, গভীরভাবে চিন্তা করুন!
প্রতিটি যুগ আলেমদের জন্য পরীক্ষা নিয়ে আসে। কখনো এই পরীক্ষা দারিদ্র্যের রূপে আসে, কখনো জুলুমের রূপে, আবার কখনো ক্ষমতার নৈকট্যের মাধ্যমে। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো যখন একজন আলেম সত্য বলার পরিবর্তে নীরবতা বা কৌশল (এপিয়েন্সমেন্ট) বেছে নেন। আলেমদের এই নীরবতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন এক গভীর ও বেদনাদায়ক প্রশ্ন তুলেছে:
“কেন রব্বানী আলেম ও পণ্ডিতরা তাদেরকে পাপের কথা বলা এবং হারাম খাওয়া থেকে বাধা দেয় না?” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৬৩)

এটি কেবল প্রশ্ন নয়; এটি একটি ঐশী সতর্কতা যা আলেমদের নীরবতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কারণ আলেমদের নীরবতা মানে নিরপেক্ষতা নয়; বরং এটি হলো: মিথ্যার জন্য ক্ষেত্র তৈরি করা, যালিমকে শক্তিশালী করা, উম্মাহর বিচ্যুতির সূচনা এবং অন্যায়ের এক প্রকার সমর্থন।

হে উলামায়ে কেরাম! আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“তোমরা জালিমদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না, অন্যথায় জাহান্নামের আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে।” (সূরা হুদ: ১১৩)

‘রুকুন’ বা ঝুঁকে পড়া কেবল জালিমের পাশে দাঁড়ানো নয়; বরং যালিমের প্রশংসা করা, তার যুলুমের যৌক্তিকতা খোঁজা, অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা বা মিথ্যার ওপর ধর্মের পোশাক পরিয়ে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। এটি সেই সূক্ষ্ম স্তর যেখানে একজন আলেম সত্যের শিবির ত্যাগ করে পরোক্ষভাবে মিথ্যার শিবিরে প্রবেশ করেন।

রব্বানী আলেম তাঁরাই, যাঁদের ইলম আমলের সাথে যুক্ত, যাঁদের দুনিয়াবী চিন্তা দ্বীনের অধীন এবং যাঁদের কাছে সত্যের স্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। যুগের চাপে তাঁরা ভেঙে পড়েন না। তাঁরা জানেন যে: “অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলাই শ্রেষ্ঠ জিহাদ।” রব্বানী আলেমের পরিচয় কেবল তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যে নয়, বরং সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁর সত্য বলার সাহসের মধ্যে নিহিত।

ইতিহাস আপনাদের কীভাবে স্মরণ রাখবে?
আপনাদের ঐশী দায়িত্বের কথা মাথায় রেখে আল্লাহ তায়ালার কঠোর শাস্তিকে ভয় করুন। পরাধীনতার কোলে লালিত এই সামরিক জান্তার কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে উন্মোচন করুন এবং সতর্কতা ও কৌশলের নামে যে নীরবতা আপনাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, তা ভেঙে ফেলুন। স্পষ্টভাবে সত্য প্রকাশ করুন।

আপনারা যদি তা না করেন, তবে ইতিহাস কখনো নীরব থাকবে না। প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি আচরণ এবং প্রতিটি নীরবতা বিচারের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। ইতিহাস যদি আপনাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক ভাড়াটে সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের সমর্থক ও সহযোগী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়, তবে তার চেয়ে বড় লজ্জার আর কিছু থাকবে না। ইতিহাস কেবল কর্মকাণ্ডই নয়, নীরবতাকেও লিখে রাখে।

Exit mobile version