​মিম্বরের বন্দিত্ব!

✍🏻 ​আজমল গজনবী

সমসাময়িক রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার সমীকরণে, আখ্যান বা ‘ন্যারেটিভ’-এর যুদ্ধ এখন অস্ত্রের যুদ্ধের চেয়েও গভীর ও জটিল হয়ে উঠেছে। এখানে সত্য কেবল তথ্যের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয় না; বরং বিভিন্ন পক্ষের উপস্থাপিত ব্যাখ্যার মাধ্যমেই তা নির্ধারিত হয়।

কিছু নির্দিষ্ট সমালোচনামূলক ও রাজনৈতিক আখ্যানের দাবি এই যে, পাকিস্তানের সামরিক যন্ত্র তাদের কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখতে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি ব্যবহারের মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে এক প্রবল ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। তদুপরি, কিছু বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির ছায়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে তাদের অস্তিত্ব, কর্মকাণ্ড, অথবা অন্ততপক্ষে তাদের দমনে ঘাটতি থাকার বিষয়ে অভিযোগ ও বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছে। তবে, এই জাতীয় সমস্ত দাবি আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরস্পরবিরোধী আখ্যান, প্রতিবেদন এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিহিত এবং একে কোনো একক বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।

ধর্মীয় আলেমদের ভূমিকা এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিতর্কিত দিক হিসেবে বিবেচিত। এই প্রসঙ্গে কিছু সমালোচনামূলক আখ্যানের দাবি হলো, পাকিস্তানের একদল আলেম দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশংসা করেন এবং এর মাধ্যমে সামরিক আখ্যানকে ধর্মীয় ও নৈতিক বৈধতা প্রদান করেন। এই বিশ্লেষণগুলো অনুসারে, এ ধরনের প্রশংসা কেবল ধর্মীয় বা তাত্ত্বিক অবস্থান নয়, বরং ক্ষমতার আখ্যানকে শক্তিশালী করার একটি ‘সফট ইনস্ট্রুমেন্ট’ বা কোমল হাতিয়ার হিসেবে গণ্য।

এটি স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন যে, এটি কোনো একমুখী বা অভিন্ন ঘটনা নয়। আলেম সমাজ কোনো একক ব্লক নয়; বরং এর মধ্যে বিচিত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা, মতপার্থক্য এবং এমনকি পরস্পরবিরোধী অবস্থানও বিদ্যমান। কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় আখ্যানের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন, অন্যরা সমালোচনামূলক অবস্থান বজায় রাখেন এবং কেউ কেউ রাজনৈতিক মেরুকরণ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। তবুও, সাধারণ সমালোচনামূলক আলোচনায় এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় যে, কেন কিছু ধর্মীয় কণ্ঠস্বর ক্ষমতা ও সামরিক আখ্যানের সমর্থনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং এই সমর্থন জনমত গঠনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে।

এই সমালোচনামূলক আখ্যানগুলোর মধ্যে মাঝেমধ্যে এটিও দাবি করা হয় যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী দাবি ও অভিযোগ বিদ্যমান। তবে এই বিষয়গুলো বৈশ্বিক গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনীতি এবং নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, এবং এ ধরনের যেকোনো দাবির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ ও নথিবদ্ধ প্রমাণের প্রয়োজন।

এই সমস্ত মতপার্থক্য সত্ত্বেও এমন একটি নীতি রয়েছে যা কোনো রাজনৈতিক, সামরিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক আখ্যান খণ্ডন করতে পারে না, আর তা হলো মানবজীবনের পবিত্রতা। যেখানেই সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেখানেই সমস্ত রাজনৈতিক যৌক্তিকতা নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়ে। নিরপরাধ মানুষের রক্ত কখনোই কোনো কৌশল, নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তা বা রাজনৈতিক আখ্যানের অধীন হতে পারে না।

ঠিক এখানেই আলেমদের দায়িত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একজন আলেম কেবল গ্রন্থের ব্যাখ্যাকারী নন, বরং তিনি সমাজের নৈতিক ভারসাম্যের প্রতিনিধিও। যখন ধর্ম ক্ষমতার সমর্থক বা স্তুতিমূলক আখ্যানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়, তখন জনমানসে সত্য ও প্রোপাগান্ডার মধ্যকার সীমারেখা সরু হয়ে আসে; আর যখন এই রেখাটি মুছে যায়, তখন প্রশ্ন করার সাহসও দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিটি ক্ষমতার পাশাপাশি এমন কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় বলয় থাকে যা তাকে বৈধতা দেয়—তা বিশ্বাস থেকে হোক, প্রশাসনিক চাপে হোক বা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফলাফল একই হয়, আলেমদের কণ্ঠস্বর ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে, যা তাদের স্বাধীনতার ক্ষয় ঘটায়।

অন্যদিকে, এটিও এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে আলেম সমাজ একটি বৈচিত্র্যময় ও বহুমুখী জগত। এর মধ্যে এমন কণ্ঠস্বরও রয়েছে যা শান্তি, ন্যায়বিচার এবং মানবজীবনের সুরক্ষার পক্ষে দাঁড়ায় এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতার যৌক্তিকতার বিরুদ্ধে গভীর প্রশ্ন তোলে। এই অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যগুলোই প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় পরিমণ্ডল কোনো একরৈখিক ব্যবস্থা নয়, বরং এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের একটি ক্ষেত্র।

পরিশেষে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার রেখা স্লোগানের স্তরে নয়, বরং নীতির স্তরে সংজ্ঞায়িত হয়। সত্য হলো তা-ই যা মানবজীবনকে শ্রদ্ধা করে, যুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং বাস্তবতার অনুসন্ধানকে বাঁচিয়ে রাখে। আর মিথ্যা হলো তা-ই যা সত্যকে ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে এবং রাজনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধার বেদিতে নৈতিকতাকে বিসর্জন দেয়।

যেসব আলেম সামরিক জান্তাকে সমর্থন করেন, তাদের উচিত সেই পশ্চিমা পেয়ালা থেকে পানি পান করা থেকে বিরত থাকা যা ইসলামের রক্তে রঞ্জিত। পাকিস্তানি আলেমদের উচিত মিম্বরের এই বর্তমান বন্দিত্বের অবসান ঘটানো; অন্যথায় মাদরাসা হাফসা ও লাল মসজিদের আর্তনাদ এবং আাফিয়া সিদ্দিকীর মযলুম দীর্ঘশ্বাস তাদের বিবেকের পর্দা ছিঁড়ে ফেলবে।

Exit mobile version