বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন: যা সংজ্ঞার পরিবর্তন থেকে শুরু হয়ে সমাজের ধ্বংসের মাধ্যমে শেষ হয়!

✍🏻 ​নু‘মান সাঈদ

বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন বা Ideological war হলো এমন এক বিপজ্জনক আক্রমণ যা বন্দুক বা বোমার মতো নয়; বরং এটি শুরু হয় মন ও চিন্তা জগত থেকে। এটি এমন এক যুদ্ধ যা মানুষের আকিদা (বিশ্বাস), চিন্তাধারা এবং সংস্কৃতিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, যাতে জাতিগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া যায়।

বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের প্রথম ধাপ হলো জনগণের মনস্তত্ত্ব, ধারণা এবং পরিভাষাগুলো পরিবর্তন করে দেওয়া। অর্থাৎ, যে বিষয়গুলো আগে ভালো হিসেবে গণ্য হতো, সেগুলোকে মন্দ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; আর যা মন্দ ছিল, সেগুলোকে স্বাধীনতা ও সভ্যতার নামে আকর্ষণীয় করে দেখানো হয়।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম ও ইসলামি ভূখণ্ডগুলো বিভিন্ন যুদ্ধ এবং বৈদেশিক দখলের সম্মুখীন হচ্ছে। এই যুদ্ধগুলোতে শুধু মুসলিমদের ভূমি ও সম্পদই দখল করা হয় না, বরং তাদের ইতিহাস, পরিচয় এবং সংস্কৃতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করা হয়।

বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের অর্থ হলো জাতীয় চিন্তাধারা, পরিভাষা ও মূল্যবোধ পরিবর্তন করে সেখানে নতুন ধারণা ও পরিভাষা চাপিয়ে দেওয়া। এটি আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, যা দখলদাররা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করতে ব্যবহার করে, যাতে জাতিগুলোকে ভেতর থেকে বিভক্ত করা যায় এবং তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার সহজ হয়।

কেউ যদি আফগান-আমেরিকা যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করে থাকেন এবং এর পেছনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও পশ্চিমা সংস্থাগুলোর লুকিয়ে থাকা চেহারা খুঁজে দেখেন, তবে তার কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে যাবে যে—সামরিক হামলার পাশাপাশি বিশ্বাস, আদর্শ, মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির ওপরও যুদ্ধ চলছিল।

আমরা দেখেছি যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বোমাবর্ষণের পাশাপাশি শত শত পরিভাষা, ধারণা এবং বিষয়বস্তু ছড়িয়ে দিচ্ছিল, যাতে বাস্তবতাকে বিকৃত করা যায়, আমাদের পরিচয় ও ইতিহাসকে কলঙ্কিত করা যায় এবং মানুষের আকিদা ও বিশ্বাস পরিবর্তন করা যায়।

গত বিশ বছরের যুদ্ধে আমরা নিজস্ব চোখে যা দেখেছি তা হলো—দখলদাররা প্রথম দিন থেকেই সম্ভাব্য সব উপায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এই উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন শিরোনাম এবং ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসী মাধ্যম ব্যবহার করেছে যাতে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, ইতিহাস, সভ্যতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, চিন্তার অভ্যাস এবং ধর্মীয় নিদর্শনগুলো ধ্বংস করা যায়।

দখলদাররা আমাদের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ক্ষতি করেছে, প্রত্নসম্পদ লুট করেছে এবং ধর্মীয় স্মৃতিস্তম্ভগুলোকে ধ্বংস করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের হাজার বছরের পুরনো বিশুদ্ধ চিন্তা ও সংস্কৃতিকে দুর্বল করা, আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ বদলে দেওয়া এবং তার পরিবর্তে পশ্চিমা ও বিদেশি মূল্যবোধের একটি মিশ্র ব্যবস্থা কায়েম করা, যাতে আমাদের সামষ্টিক পরিচয় তার মূল উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তারা সর্বপ্রথম আমাদের জাতীয় ভাষাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, সত্যকে বিকৃত করেছে এবং ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছে। পরিভাষা পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা একটি বড় লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছে: আমাদের সামাজিক, নৈতিক, ধর্মীয় এবং পারিবারিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা। এটিই ছিল তাদের কৌশল, যার পেছনে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। কারণ, এই ভিত্তিগুলোই তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ঐক্য নিশ্চিত করে।

দখলদাররা আংশিকভাবে তাদের লক্ষ্যে সফলও হয়েছে। বুদ্ধি ও চিন্তা চুরি করা, সত্য বিকৃত করা এবং কিছু মূল্যবোধ ও ধারণা বদলে দেওয়ার মাধ্যমে তারা এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে যে—ইসলাম মানেই সন্ত্রাসবাদ, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ ও প্রতিরোধ মানেই সহিংসতা এবং নিজ ভূমি ও পবিত্র স্থানের প্রতিরক্ষা মানেই হলো উগ্রবাদ।

প্রতিষ্ঠিত আদর্শ ও মূল্যবোধ ধ্বংস করার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, দখলদাররা চেয়েছিল বিশুদ্ধ ধারণাগুলোকে গুলিয়ে ফেলতে এবং সত্য-মিথ্যার মাঝখানের পার্থক্য মুছে দিতে। বাস্তবেও তাই হয়েছে; মন্দকে ভালোর সমান দেখানো হয়েছে, দুর্নীতিবাজকে ভদ্র হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে, যালেমকে মাযলুমের সমার্থক বানানো হয়েছে, আক্রমণকারীকে রক্ষক হিসেবে এবং দখলদারকে হকদার হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটাই ছিল তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।

আসল কথা হলো, বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হয় মানুষের চিন্তা। কারণ যখন কোনো জাতির মৌলিক বিশ্বাস ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সেই জাতি পথ হারিয়ে ফেলে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে যায়। একারণেই পশ্চিমারা সবসময় স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের মতো সুন্দর স্লোগানের আড়ালে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচি চালাতে ব্যস্ত থাকে, যাতে সমাজে প্রভাব বিস্তার করা যায়।

যদিও আফগানিস্তান এখন বস্তুগত দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনাগুলো চিনতে না পারার কারণে আমাদের সমাজ এখনও আংশিকভাবে সেই আগ্রাসনের অধীনে রয়েছে। যদি এই বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ঝুঁকি ও ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি না করা হয় এবং প্রতিরোধের শক্তিশালী উপায়গুলো গ্রহণ না করা হয়, তবে এখানে রয়ে যাওয়া পশ্চিমা ধারণাগুলোই আগামী প্রজন্মের মৌলিক চিন্তাধারায় পরিণত হবে। যা আফগান সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক কাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

সমাজ রক্ষার জন্য সামাজিক স্থিতিশীলতা মজবুত করা, চিন্তার ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়া এবং আমাদের মৌলিক মূল্যবোধগুলোকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

তাই যখন আমরা এমন এক আক্রমণের মুখোমুখি, যা আমাদের আকিদা, চিন্তা, সংস্কৃতি, পরিচয়, ইতিহাস এবং সভ্যতাকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে—তখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আমাদের ওপর বেশি দায়িত্ব বর্তায় যে আমরা নিজেদের এবং আমাদের জাতিকে সম্ভাব্য সব উপায়ে রক্ষা করি। কারণ যখন কোনো জাতির অস্তিত্বের স্তম্ভ, সংস্কৃতি, ভূমি এবং সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে, তখন সেই জাতির জন্য সমস্ত সম্পদ ও শক্তি দিয়ে তা রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়ে।

এই কাজ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ না চিন্তা ও বুদ্ধিকে বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত করা হবে, আমাদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বিরোধী প্রতিটি বিদেশি আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করা হবে এবং আমাদের বিশুদ্ধ ইসলামি মূলনীতি ও মূল্যবোধের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা হবে। কারণ এটাই আমাদের প্রকৃত উৎস এবং টিকে থাকার একমাত্র গ্যারান্টি।

 

Exit mobile version