দীন ও মাদরাসার বাণিজ্যিকীকরণ: পাকিস্তানি রেজিমের পুরোনো ব্যবসা

✍🏻ড. আজমল

পাকিস্তানি রেজিমের পক্ষ থেকে নিজেদের মনমতো ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তোলা মাদরাসাগুলোকে রাজনৈতিক দরকষাকষির পণ্য বানানো কোনো নতুন ঘটনা নয়। এই দেশের সামরিক শাসকেরা এবং সামরিক শক্তিতে ভর করে বেসামরিক সরকার উচ্ছেদকারী একনায়কেরা নিজেদের ক্ষমতার স্থায়িত্ব, ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষা এবং বৈশ্বিক অত্যাচারী শক্তিগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বরাবরই দীনের অপব্যবহার করেছে। তারা নিজেদের পছন্দসই মুফতি ও মাদরাসা দাঁড় করায়, তারপর সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে তাদের সেকুলার মানসিকতা ও রাজনীতিতে ধর্মীয় রঙ চড়ানোর প্রয়াস চালায়। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো—জামিয়াতুর রশীদের কথিত মুফতিদের পক্ষ থেকে সেই সামরিক কর্মকর্তাদের প্রশংসা, যাদের হাত রঞ্জিত রয়েছে নিজেদের নাগরিক ও হাজারো নিরপরাধ মানুষের রক্তে, এবং যারা দিনরাত বৈশ্বিক শক্তির সন্ত্রাস, দাঈশি খারিজিদের ফিতনা ও অন্যান্য বিদেশি এজেন্ডার সেবায় নিয়োজিত।

পাকিস্তানি সামরিক রেজিমের সার্বিক ইতিহাসই ইসলামবিরোধী অপরাধে পরিপূর্ণ। এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই অপরাধসমূহ বারবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে, যা পাকিস্তানের মুসলিম জনগণের কপালে এক কালো কলঙ্ক হয়ে আছে। এই অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে লাল মসজিদে গণহত্যা, জামিয়া হাফসায় নারীদের উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, দীনদার উলামাদের প্রকাশ্য ও গোপন হত্যা, ড. আফিয়া সিদ্দিকীকে বিক্রি করে দেওয়া, তেহরিক লাব্বাইক কর্মীদের হত্যা, এবং ফিলিস্তিনের চলমান সংগ্রামের সময়ে ইয়াহুদি রেজিমের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এসবের প্রতি চোখ বুজে থাকা কোনোভাবেই ছোট গুনাহ নয়।

দুঃখজনক হলো, মুফতি আবদুর রহীমের মতো সেনাবাহিনীর এজেন্ট ও ভুয়া মুফতিরা এই সেনাবাহিনীকে “ইসলামী ফৌজ” বলে, কুরআন-হাদীসের ব্যবসা করে এবং ফাতাওয়া দেয় যে এই নামসর্বস্ব “ইসলামী” বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা নাজায়েয। জামিয়াতুর রশীদের এজেন্ট-মুফতিরা তো ইসলামী ইমারাত আফগানিস্তান সম্পর্কেও অসংযত ভাষায় কথা বলেছে এবং সেনাবাহিনী ও ইসলামাবাদ রেজিমের নির্দেশে পাকিস্তানি জনগণের মনে এটা প্রোথিত করতে চেয়েছে যে তারা কোনো ইসলামী ব্যবস্থা নয়; বরং পাকিস্তানের সব সমস্যার মূল দায়ভার এবং টিটিপির সমর্থক। কিন্তু কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ে কাফেলার যাত্রা কখনো থামে না। ইসলামী ইমারাত এক পবিত্র ইসলামী ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী রাষ্ট্র হিসেবে সমগ্র দুনিয়ায় আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে; তারা বাস্তবে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করে আফগানিস্তানে পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অর্ধ-শতাব্দীর দীর্ঘ যুদ্ধসমাপ্ত করেছে।

এখন পাকিস্তান তার নিজস্ব কুকর্মের ফল নিজেই ভোগ করছে। টিটিপি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীগুলোর যুলুম-নিপীড়নেরই ফল, যা খাইবার পাখতুনখোয়া ও অন্যান্য অ-পাঞ্জাবি এলাকায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুফতি আবদুর রহীমের মিথ্যা ও বিশ্বাসঘাতকতারও দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে। সে ভেবেছিল আফগানিস্তানে গিয়ে আবার মানুষকে ধোঁকা দেবে; কিন্তু ইসলামী ইমারাত সত্য-মিথ্যার মুখচ্ছবি, প্রকৃত আলেম এবং আইএসআই-নির্মিত ভুয়া মুফতিদের খুব ভালোই চেনে। সেই কারণেই তাকে তার প্রকৃত অবস্থান দেখিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। হয়তো এই অপমানই কারণ—এখন জামিয়াতুর রশীদ ও তার মুফতিগণ সেনাবাহিনীর মুখপাত্র হয়ে ইসলামী ইমারাতবিরোধী বিষ ঝরাচ্ছে। কিন্তু এর ক্ষতি শেষ পর্যন্ত তারাই ভোগ করবে ইনশাআল্লাহ। এদের এই ঈমান-বিক্রেতা গোষ্ঠী এবং ইসলামাবাদের রক্তপিপাসু সেনাবাহিনী।

আরেকটি তিক্ত সত্য হলো, বর্তমান পাকিস্তানি রেজিম সম্পূর্ণভাবে জনসমর্থন ও গণতান্ত্রিক বৈধতা থেকে বঞ্চিত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার পুরো মন্ত্রিসভা ও দলীয় নেতৃত্বসহ অযথা কারাবন্দী; সেনাপ্রধান নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে তার পদমর্যাদাকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে; যার প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্ট ও পার্লামেন্টের বহু সদস্য পদত্যাগ করেছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যম এসব ধামাচাপা দিচ্ছে। তারপরও ঈমান-বিক্রেতা দরবারি আলেমরা ধর্মের নামে তাদের উপর বৈধতার আবরণ চড়িয়ে চলছে।

তারা ভুলে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ইসরায়েলসহ সকল ইসলামবিরোধী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের তোষণমূলক আচরণ লুকিয়ে নেই। তাই কোনোভাবেই এই ভাড়াটে বাহিনীকে ইসলামী বা জাতীয় বাহিনী হিসেবে অভিহিত করার কারণ অবশিষ্ট নেই। বাস্তবতা হলো এটি এক এজেন্ট বাহিনী, ভাড়াটে ঘাতকদের দল, যেখানে সাধারণ সৈন্যরাই আসল বলির পাঁঠা।

শেষপর্যায়ে কেবল এটিই বলা যায়, জামিয়াতুর রশীদ ও তার মুফতিরা এমন এক ব্যবস্থার প্রশংসা করছে, যে ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী ইয়াহুদিদের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে, শত শত হক্কানি আলেমকে হত্যা করেছে, তাদের বদনাম করেছে এবং বৈশ্বিক শক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে; যে সেনাবাহিনীর ওপর খাইবার পাখতুনখোয়ার শত শত মসজিদ, মাদরাসা, মাকতব ও সাধারণ নাগরিক হত্যার দায় বর্তমান। যে বাহিনী মসজিদে কুকুর ছেড়ে দেয় এবং কুরআনের পবিত্র নুসখাগুলোকে নিজের নোংরা বুটে পিষ্ট করে।

এদের জানা উচিত, সত্যনিষ্ঠ মুসলিম ও পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ কখনো এসব দরবারি মুফতি ও কয়েকটি মাদরাসার তোষামোদে প্রতারিত হয় না; এবং সেই ভুয়া জাতীয় নেতারাও, যাদের নিজেদের অলিগলিতেই কেউ চেনে না এবং যারা সেনাবাহিনীর প্রশ্রয়ে ইসলামী ইমারাতের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলে, কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। ইসলামী ইমারাত হক্কানি আলেমদের পরামর্শ ভিত্তিক শরঈ ব্যবস্থা—যা জনগণের অন্তরে গভীর শিকড় গাড়ে আছে; এবং ঈমান-বিক্রেতাদের প্রচারণা কখনোই তাকে দুর্বল করতে পারবে না।

Exit mobile version