পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তার কলঙ্কিত ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় কখনোই পাকিস্তানি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজন পূরণ করেনি। বরং তারা সর্বদা সহিংসতা, নৃশংসতা এবং সমস্ত মানবিক আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী প্রমাণ করতে এবং তাদের বিদেশি প্রভুদের কাছ থেকে প্রশংসা ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই সামরিক ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত না তার নিজের ভূখণ্ডকে কোনো প্রকৃত জাতীয় মর্যাদা দিয়েছে, আর না তার জনগণকে কোনো গর্ব করার মতো সাফল্য উপহার দিয়েছে। এর বিপরীতে, তারা সর্বদা আমেরিকা, ব্রিটেন এবং অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোর সন্তুষ্টি ও আর্থিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজেদের নাগরিক এবং জাতীয় মূল্যবোধকে বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা ও অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে, যা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), বালুচ লিবারেশন আর্মি (বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী) এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর উত্থানের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নয়, বরং তার পররাষ্ট্রনীতিরও সবচেয়ে বড় শত্রু প্রমাণিত হয়েছে। তারা বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের পরিচয়কে এমন একটি চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছে যা দালালি, টার্গেট কিলিং এবং প্রক্সি সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত। এর সাম্প্রতিক লজ্জাজনক উদাহরণ হলো মজলুম গাযযা এবং সেখানকার অসহায় মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে দখলদার ইসরায়েলের প্রতি পরোক্ষ সমর্থনের প্রকাশ; এমন একটি পদক্ষেপ যা কোনো বিবেকবান ও সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ সমর্থন করতে পারে না।
এই আচরণ আসলে বিস্ময়কর নয়, কারণ সামরিক জান্তা এবং ইসরায়েলের প্রকৃতির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। উভয়ই এমন সামরিক কাঠামো যা ভাড়টে যোদ্ধা এবং রক্তপিপাসু উপাদানে গঠিত, যাদের পেছনে স্বার্থান্বেষী শক্তি, পুঁজিবাদী গোষ্ঠী এবং নির্দিষ্ট বৈশ্বিক লবি কাজ করছে—যাদের উদ্দেশ্য হলো ইসলাম এবং মুসলিমদের ঐক্য ও সমৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করা।
এই উপাদানগুলো না কোনো আদর্শের অনুসারী, না আইনের, আর না তারা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির তোয়াক্কা করে। তাদের আসল লক্ষ্য কেবল অর্থ উপার্জন, অবৈধ ক্ষমতার স্থিতিশীলতা এবং সামরিক সম্প্রসারণবাদ, যার জন্য তারা যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে প্রস্তুত থাকে।
সামরিক জান্তা তাদের সাম্প্রতিক বর্বরতায় রামাদানের পবিত্র মুহূর্তে নানগারহার এবং পাক্তিকায় অন্ধ ও নির্মম অপারেশন চালিয়েছে। পুরো বিশ্ব দেখেছে যে এটি একটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি ছিল। কোনো বিদেশি সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়নি, কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়নি, বরং কয়েক ডজন আফগান নাগরিককে শহীদ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরাও ছিলেন।
নানগারহারের বেহসুদ জেলায় একজন সাধারণ নাগরিকের ঘরে চালানো হামলার ধ্বংসযজ্ঞ এবং সেখানকার কান্না যেকোনো মানবতাবাদী ও সংবেদনশীল হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। মানুষের বিবেক সম্ভবত সন্ধ্যার অন্ধকার এবং রামাদানের রোযার মধ্যে এই ব্যথা ও আর্তনাদ সহ্য করতে পারবে না। এর পাশাপাশি সামরিক জান্তা দাবি করেছে যে তারা তাদের শত্রু এবং সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো আফগানিস্তান এখন সন্ত্রাসীদের আবাসস্থল নয়, বরং সামরিক জান্তার আসল শত্রু এখন খোদ আফগান জনগণ। একদিকে সেখানকার নিরুপায় ও দরিদ্র শরণার্থীদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করা হচ্ছে, তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের জমিতে এমন নৃশংস হামলা চালানো হচ্ছে যার কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা নীতিমালা বৈধতা দিতে পারে না।
যদিও আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে সামরিক জান্তার এই কর্মকাণ্ড বিনা জবাবে পার পাবে না এবং উপযুক্ত সময়ে এর জবাব দেওয়া হবে। এই বার্তা আফগান মুজাহিদ জনগণের সংকল্প ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়। তবে পাকিস্তানি জনগণেরও বোঝা উচিত যে, ইমারাতে ইসলামিয়া এবং আফগান মযলুম জাতি সর্বদা সত্যের পথে থেকেছে। তারা কখনো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেআইনি পদক্ষেপ নেয়নি, বরং এই সামরিক জান্তাই নিজের জনগণের ওপর দয়ামায়া দেখায়নি এবং বিদেশেও পাকিস্তানের জন্য কোনো সুনাম রাখেনি। এই কারণেই এটি অগ্রহণযোগ্য এবং কোনো দেশই এর সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে না।
আজকের আফগানিস্তান সেই পুরনো দেশ নয় যার ভাগ্য আমেরিকা বা ন্যাটো নির্ধারণ করবে, কিংবা যার সরকারি যন্ত্র গোপন বা প্রকাশ্য স্বার্থের কারণে এমন পদক্ষেপের সামনে চুপ থাকবে। বর্তমান আফগানিস্তান অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, তারা নিজস্ব প্রতিরক্ষা ক্ষমতা রাখে, তাদের অবস্থান সুদৃঢ় এবং আদর্শ স্পষ্ট। তারা অবশ্যই প্রতিশোধ নেবে এবং যেকোনো মূল্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখবে।
আসল সত্য হলো সামরিক জান্তা এখনো এই বাস্তবতা স্বীকার করে না। তারা নিজেদের দুর্বলতা এবং ভুল পদক্ষেপের ফলাফল অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়, আর এটাই সেই রাজনীতি যা দিয়ে পাকিস্তানের অতীতের কালো ইতিহাস কখনো পরিষ্কার হতে পারে না। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে যে, এই সামরিক জান্তা ইসলাম এবং মুসলিমদের নামে দুর্নীতি ও অবৈধ ব্যবসা করেছে; ইসলামকে কলঙ্কিত করার জন্য তারা কোনো কিছুতেই পিছপা হয়নি। এর বিপরীতে, আফগান মুসলিম জাতি সর্বদা ইসলামকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে, এর ওপর কখনো আপস করেনি, বরং কোরবানি ও শাহাদাতের দীর্ঘ ইতিহাস রচনা করে স্বাধীনচেতা থেকেছে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, রমজানের মোবারক মুহূর্তে বিশেষ করে রাতে শহীদ হওয়া আফগান শিশু ও নারীদের চিৎকার, আর্তনাদ এবং চোখের পানি অবশ্যই বৃথা যাবে না। শহীদদের উত্তরাধিকারী ইমারাতে ইসলামিয়া যেকোনো মূল্যে নিজ জনগণের প্রতিরক্ষা করবে। একটি পশতু প্রবাদ আছে যে, “পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে”।
এখন আমরা পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পতনের দিন ঘনিয়ে এসেছে এবং খোদায়ী ইনসাফ পাকিস্তানের জনগণ ও এই ভাড়টে খুনিদের মধ্যে হিসাব চুকিয়ে দেবে।
পাকিস্তানি বেসামরিক সরকার, যারা আপাতদৃষ্টিতে দেশটির ক্ষমতা ও শাসনের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের দায়িত্ব হলো জনগণের চোখে আর ধুলো না দেওয়া। তাদের স্পষ্টভাবে স্বীকার করা উচিত যে তারা জেনারেল মুনির এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রভাব ও চাপের মুখে জীবন অতিবাহিত করছে। এই পুতুল সরকার এতটাই দুর্বল যে নিজ দেশের ভেতরে জনগণকে নেতৃত্ব ও সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না; তারা সমস্যা ও দুর্ঘটনার দায় অন্যের ওপর চাপায় এবং নিজেদের জন্য কৃত্রিম মর্যাদা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যায়।
