আইএসআইএস পাকিস্তান শাখা: সন্ত্রাসের এক নতুন হাতিয়ার এবং আইএসআই-এর সেই পুরনো রণকৌশল!

✍🏻 ​আকবার জামাল

পাকিস্তানের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অঞ্চলের পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্র এবং আইএসআইএস (ISIS) পাকিস্তান শাখার মধ্যকার সম্পর্ক আবারও আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন অসংখ্য ঘটনা ও প্রমাণ সামনে এসেছে যা এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) ও এমআই (MI) তাদের নির্দিষ্ট কৌশলগত স্বার্থ অর্জনের জন্য আইএসআইএস-এর মতো সন্ত্রাসী উপাদানগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

এই প্রসঙ্গে, খাইবার পাখতুনখোয়ার ওরাকযাই অঞ্চলে “মুহাম্মাদ ইকবাল বিন মুহাম্মাদ শামদার” নামক এক ব্যক্তির নিধন এবং তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত নথিপত্র এই গোপন যোগসূত্র উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই উদ্ঘাটন যে একজন ব্যক্তি একই সাথে আইএসআই-এর হয়ে কাজ করছিলেন এবং আইএসআইএস-কে রসদ সরবরাহের দায়িত্বেও ছিলেন, সেই পুরোনো অভিযোগ ও আখ্যানকেই নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তানে বিদ্যমান উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর শিকড় কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সাথে যুক্ত।

আল মিরসাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নথিপত্রগুলো ইঙ্গিত দেয় যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি আইএসআইএস-এর সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন নামে সক্রিয় রয়েছেন। তাদের উদ্দেশ্য সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা নয়, বরং নিজেদের লক্ষ্য অনুযায়ী এর কার্যক্রমকে পরিচালনা করা।

এই ধারাবাহিকতার অন্য অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে শায়খ ইদরিস (রহ.)-এর শাহাদাত এবং কয়েক মাস আগে ইসলামাবাদে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি উপাসনালয়ে আত্মঘাতী হামলা। বিশ্লেষকরা এই ঘটনাগুলোকে আইএসআইএস এবং পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে দেখছেন।

এসব ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যখনই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে বা কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন আইএসআইএস-এর মতো ভাড়াটে খুনিদের মাধ্যমে তাদের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে তাদের পররাষ্ট্র নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এই অঞ্চলে আইএসআইএস-এর নিরবিচ্ছিন্ন তৎপরতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমাবিশ্বকে এটা দেখানোর প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হয় যে, এই অঞ্চলটি চরম হুমকির সম্মুখীন—যাতে নিরাপত্তা সহায়তা এবং রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায় করা যায়।

এই পদ্ধতিটি সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক এবং জেনারেল পারভেজ মোশাররফের আমলের সেই পুরনো কৌশলেরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হয়, যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী মার্কিন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছিল।

এটিও উল্লেখযোগ্য যে, খাইবার পাখতুনখোয়ার তিরাহ উপত্যকার পরিস্থিতিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং আইএসআইএস-এর মধ্যকার সহযোগিতার একটি ব্যবহারিক উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

তীব্র শীতের মধ্যে অভিযানের নামে স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল; ঠিক সেই সময়েই ওই এলাকায় আইএসআইএস-এর উপস্থিতির খবর আসতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে আইএসআইএস উপাদানগুলো সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠে। একে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র এবং বিশ্লেষকদের দাবি, সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার উদ্দেশ্য ছিল আইএসআইএস-খারিজিদের জন্য নিরাপদ আস্তানা তৈরি করা এবং সুশৃঙ্খলভাবে তাদের উপস্থিতি সংগঠিত করা। একারণেই ওই এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার পর হঠাৎ করে আইএসআইএস-এর তৎপরতা ও হামলা বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে, যা স্থানীয় উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং আইএসআইএস-এর মধ্যে আদর্শিক মিল না থাকলেও, স্বার্থ এবং ব্যবহারিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে অবশ্যই মিল দেখা যায়। উভয় পক্ষই নিজ নিজ উদ্দেশ্যে সহিংসতা এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্যবস্তু করাকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত।

বেলুচিস্তানে মাসতুং এলাকায় আইএসআইএস-এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো বেলুচ স্বাধীনতা কামী সংগঠনগুলোর দ্বারা লক্ষ্যবস্তু ও ধ্বংস হওয়ার খবর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খোলার জন্য আইএসআইএস-কে এখন খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এসব কর্মকাণ্ডের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো বিশ্বকে এটা দেখানো যে পাকিস্তান নিজেই সন্ত্রাসবাদের শিকার, অথচ পর্দার আড়ালে একই সহিংস উপাদানগুলোকে পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই সমস্ত প্রমাণ সেই তিক্ত বাস্তবতার দিকেই আঙুল তোলে যে, নির্দিষ্ট কায়েমী স্বার্থের জন্য অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে, যেখানে আইএসআইএস এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মনে হয়।

ইসলামাবাদে শিয়া উপাসনালয়ে হামলা থেকে শুরু করে খাইবার পাখতুনখোয়ার তিরাহ উপত্যকা ও ওরাকযাইয়ের ঘটনাগুলো—সবই পাকিস্তানি সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের এই বিপজ্জনক এবং বিতর্কিত প্রক্সি গেম বা ছায়া যুদ্ধের বিভিন্ন দিক হিসেবে বিবেচিত।

Exit mobile version