কারা শহীদ করেছেন শায়খ মুহাম্মাদ ইদরিস (রহ.)-কে, এবং তারা এখন কোথায়?

গত মঙ্গলবার (১৮ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি), পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার চারসাদ্দা শহরে দাঈশি খারিজিদের এক কাপুরুষোচিত হামলায় প্রখ্যাত আলেম শায়খ মুহাম্মাদ ইদরিস শাহাদাত বরণ করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
শায়খ মুহাম্মাদ ইদরিস ছিলেন পাকিস্তানের অন্যতম শ্রদ্ধেয় আলেম, যার তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ইলম অর্জন করছিল। তাকে শহীদ করার মাধ্যমে আইএস (ISIS) আবারও মুসলিম বিশ্বের কাছে তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করেছে, এমন একটি গোষ্ঠী যারা মূর্তিপূজারী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের উপেক্ষা করে সমস্ত আক্রোশ ইসলামের অনুসারীদের ওপর উগড়ে দেয়।

এই নিবন্ধে, আল মিরসাদ তার পূর্ববর্তী প্রতিবেদন এবং নতুন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শায়খ মুহাম্মাদ ইদরিস সাহেব ও অন্যান্য আলেমদের হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে দায়ীদের পরিচয়ের ওপর আলোকপাত করছে।

পাকিস্তানে আলেমদের টার্গেট করা নতুন কিছু নয়। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা কর্তৃক শত শত আলেমকে বন্দি বা শহীদ করা হয়েছে। যারা তাদের হাত থেকে বেঁচে গেছেন, তাদেরকে গত কয়েক বছর ধরে আইএস তাদের ধারাবাহিক গুপ্তহত্যা অভিযানের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

২০২৩ সালের শুরুর দিকে এই হত্যাকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত হয়, যখন আফগানিস্তানে আইএসের সেলগুলো (cells) ভেঙে ফেলা হয় এবং তাদের নেতৃত্বকে ডুরান্ড লাইন পেরিয়ে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। ধর্মীয় আলেমদের বিরুদ্ধে এই অভিযান ছিল একটি সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার অংশ, যা সম্পর্কে আল মিরসাদ ২০২৩ সালের আগস্টেই রিপোর্ট করেছিল।

সেই সময় আল মিরসাদের সূত্রগুলো সতর্ক করেছিল যে, আইএস আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ইরানে ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলন ও ধর্মীয় আলেমদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তিন দেশেই তাদের অপেরাটরদের মোতায়েন করেছে।

আফগানিস্তান ইসলামি ইমারাত (IEA) আফগানিস্তানে এই পরিকল্পনার প্রধান বাস্তবায়নকারী ডক্টর উমার হায়দার (আইএস-কে’র ডেপুটি গভর্নর) এবং তার পুরো সেলকে নির্মূল করতে সক্ষম হয়। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা থেকে আইএএ পাকিস্তান সরকারকে এই চক্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক করেছিল এবং খান নামক এক আইএস সদস্যের গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করেছিল, যাকে পাকিস্তানের ভেতরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আল।মিরসাদের সূত্রমতে, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ খানকে গ্রেপ্তার করলেও কিছুকাল পরেই তাকে ছেড়ে দেয়।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের আগস্টে বাজৌরে জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের সমাবেশে বোমা হামলার পর তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়, যে হামলায় প্রায় ৬৩ জন নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছিল।

আল মিরসাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শুধুমাত্র বাজৌরেই আইএসের হাতে নিম্নলিখিত বিশিষ্ট আলেমরা শহীদ হয়েছেন:
• মাওলানা সালাহুদ্দিন, জেইউআই সদস্য (৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)
• মাওলানা আলতাফ হোসাইন, জেইউআই সদস্য ও ব্যবসায়ী (৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)
• মাওলানা নূর মুহাম্মাদ, জেইউআই সদস্য (২২ জুন, ২০২৩)
• মুআয খান, স্থানীয় জেইউআই-এফ কর্মকর্তা (১৮ এপ্রিল, ২০২৩)
• কারী ইসমাঈল, সালাফি আলেম (২৯ অক্টোবর, ২০২৩)
• কারী যাইনুল আবিদিন, মসজিদের ইমাম (২৭ অক্টোবর, ২০২৩)
• মাওলানা তালা মুহাম্মাদ, সালাফি আলেম ও শিক্ষক (৪ অক্টোবর, ২০২৩)

সূত্রগুলো আল মিরসাদকে জানিয়েছে যে, খাইবার পাখতুনখোয়ার বিশেষ করে বাজৌরের এই হত্যাকাণ্ডগুলো একটি নির্দিষ্ট সেল দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যার সদস্যদের মধ্যে ছিল আবু বকর বাজৌরি (ইমরান), ইদরিস (ইউসুফ) এবং মোল্লা ইমরান।

আবু বকর এবং ইদরিস গত ফেব্রুয়ারিতে নওশেরা’র হাকিমাবাদে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তারা ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করেছিল যাতে ৩১ জন নিহত ও ১৬০ জন আহত হয়। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলেমদের হত্যাকাণ্ডে এই সেলের কার্যক্রমের প্রতি চোখ বুজে ছিল; কার্যত তাদের কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজধানীতে হামলার পর তারা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

আইএস পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে অনেক আলেমকে শহীদ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই এসব হত্যার দায় স্বীকার করেনি। আফগানিস্তানে শায়খ মুজিবুর রহমান আনসারি এবং শায়খ সরদার ওয়ালি অন্যতম। পাকিস্তানে শায়খ হামিদুল হককেও জুমুআর নামাযের সময় হামলায় শহীদ করা হয়, যার দায়ও তারা স্বীকার করেনি।

নতুন সূত্র আল মিরসাদকে জানিয়েছে যে, হামিদুল হকের ওপর হামলাটি চালিয়েছিল আবু জিহাদ আশ শামি নামক এক আইএস সদস্য, যে বেলুচিস্তানের ক্যাম্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সূত্রগুলো ওই ব্যক্তির একটি ছবিও আল-মিরসাদের কাছে পাঠিয়েছে।

আলেমদের নির্মূল করা আইএসের শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্রমতে, গোষ্ঠীটি জেইউআই পাকিস্তানের প্রধান মাওলানা ফযলুর রহমানসহ আরও বেশ কয়েকজন আলেম ও রাজনীতিবিদকে টার্গেট করার পরিকল্পনা করছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আইএসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক থেকে উদ্ধার করা একটি হিট লিস্টে তাদের নাম পাওয়া গেছে।
শায়খ মুহাম্মাদ ইদরিসকে কে শহীদ করেছে?
এটি এখন সুপ্রতিষ্ঠিত যে আইএস তাদের অপেরাটর এবং অবকাঠামো ডুরান্ড লাইন পেরিয়ে পাকিস্তানে সরিয়ে নিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে নওশেরায় ইদরিস ও আবু বকরের মৃত্যু, মার্চ মাসে পেশোয়ারে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে জালমাই বাদাখশি (সালমান)-এর মৃত্যু এবং ২০২৫ সালের আগস্টে খাইবার এলাকায় আবদুল মালিক নামক এক পরিচিত আইএস নেতার মৃত্যু—সবই একটি সক্রিয় ও পরিবর্তনশীল নেটওয়ার্কের দিকে ইঙ্গিত করে। এই প্রত্যেকটি ব্যক্তিরই ডুরান্ড লাইনের উভয় পাশে পদচিহ্ন ছিল।

নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, বর্তমানে খাইবার পাখতুনখোয়ায় আইএসের দুই কমান্ডার সক্রিয় রয়েছে, যাদের নাম সিদ্দিকইয়ার এবং হুযাইফা।

তারা দুজনেই আবদুল মালিকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং এই অঞ্চলে আইএস-কে (ISIS-K)-এর প্রধান সহায়ক হিসেবে বিবেচিত। সূত্রগুলো বিশ্বাস করে, শায়খ মুহাম্মাদ ইদরিসের হত্যাকাণ্ড এই দুই কমান্ডারের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমেই সংঘটিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

 

Exit mobile version