বিশ্বব্যবস্থা (Global Order) বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম মৌলিক ধারণা হিসেবে বিবেচিত, যা ক্ষমতার বণ্টন, রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সম্পর্কের ধরন এবং প্রচলিত মূল্যবোধের সমষ্টিকে ধারণ করে।
ইতিহাসজুড়ে যখনই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, সমগ্র সভ্যতা এর সাথে আবর্তিত হয়েছে। কখনো কখনো এই পরিবর্তনগুলো অগ্রগতি, স্থিতিশীলতা এবং সহযোগিতা বয়ে এনেছে; আবার কখনো এগুলো বিভিন্ন জাতিকে খণ্ড-বিখণ্ড, দুর্বল এবং লক্ষ্যহীন করে রেখে গেছে।
মুসলিম বিশ্ব কখনোই এই শক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) সমাপ্তি এবং এর রাজনৈতিক প্রভাবসমূহ ইসলামী বিশ্বের জন্য এক গভীর ঐতিহাসিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই যুদ্ধের পর উসমানী খিলাফতের পতন ঘটে, যা ছিল ইসলামী ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রতীকী ভিত্তি; এবং এর ফলে ইসলামী বিশ্ব খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে। সাইকস-পিকট চুক্তির মতো ঔপনিবেশিক চুক্তিগুলো ইসলামী বিশ্বকে কৃত্রিম সীমানা দিয়ে বিভক্ত করে ফেলে এবং সেগুলোর পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলোর উত্থান ঘটে, যার মধ্যে অনেকগুলোই ছিল পশ্চিমা শক্তিগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাবাধীন।
ফলস্বরূপ, ইসলামী বিশ্ব একটি তুলনামূলক ঐক্যবদ্ধ ও প্রভাবশালী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দুর্বলতা, নির্ভরশীলতা এবং অধীনতার মধ্যে পতিত হয়। যদিও এই পরিবর্তনটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরেরই একটি অংশ ছিল, তবুও এটি ইসলামী উম্মাহর জন্য নেতিবাচক পরিণতি বয়ে এনেছিল; কারণ অভ্যন্তরীণ সংহতির স্থান দখল করেছিল বিভক্তি, আর স্বাধীনতার স্থান নিয়েছিল পরনির্ভরশীলতা।
সমসাময়িককালে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আবারও একটি পরিবর্তনশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একমেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা, যা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো, তা ধীরে ধীরে একটি বহুমেরুভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো কেবল ক্ষমতার বণ্টনেই পরিবর্তন আনছে না, বরং আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী, জোট এবং কৌশলগত মিথস্ক্রিয়ার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব অনুযায়ী, ‘বাস্তববাদ’ (Realism) এই বিষয়ের ওপর জোর দেয় যে, রাষ্ট্রগুলোকে ক্ষমতা সর্বোচ্চকরণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে; অন্যদিকে ‘গঠনবাদ’ (Constructivism) পরিচয়, মূল্যবোধ এবং আদর্শের ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। সেই অনুযায়ী, চলমান বৈশ্বিক পরিবর্তনগুলোকে কেবল হুমকি হিসেবে না দেখে, বরং সেগুলোকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো ইসলামী উম্মাহর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামী বিশ্বকে সবার আগে নিজেকে চিনতে হবে এবং নিজের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক বিভেদ, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতা এমন কিছু উপাদান, যা বিদেশী হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দেয়। তা সত্ত্বেও, যৌথ মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক পরিচয় এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সহযোগিতা ও ঐক্যের সম্ভাবনা এখনও বিদ্যমান।
ইসলামী উম্মাহ যদি এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সময়কালকে প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে পারে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে শক্তিশালী করতে পারে এবং অন্য কারো শর্তে নয়, বরং নিজস্ব শর্তে এই পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সাথে যুক্ত হতে পারে, তবে বৈশ্বিক অঙ্গনের প্রান্তিক অবস্থান থেকে কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত বাস্তব। এটি কোনো কাল্পনিক অতীতে ফিরে যাওয়া নয়, বরং এমন এক সভ্যতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যা নিজের গুরুত্ব বোঝে এবং অবশেষে তা বহন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
