গতকাল পেশোয়ারের চারসাদ্দার উসমানযাই এলাকায় প্রখ্যাত আলেম শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সেই ক্ষতগুলোকে আবারও রক্তাক্ত করে তুলেছে যা কখনোই শুকায়নি। যে ক্ষত এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্ক এবং সবচেয়ে মুখলেস (একনিষ্ঠ) ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের রক্তে ভেজা। এটি কেবল একটি অপরাধ ছিল না; এটি এমন একটি প্রকল্পের সর্বশেষ অধ্যায় যার শিকড় রাওয়ালপিন্ডি থেকে রসদ পায় এবং যার ফলস্বরূপ এই অঞ্চলে একের পর এক নতুন কবরের সৃষ্টি হচ্ছে।
আইএস (ISIS) এবং পাকিস্তানের সামরিক জান্তার মধ্যে সম্পর্ক কোনো প্রান্তিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। এটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আইএস মূলত ভিন্ন নামে একটি আইএসআই (ISI)। এটি একটি প্রক্সি মিলিশিয়া, যাকে প্রয়োজন অনুযায়ী সক্রিয় করা হয় এবং এমন সব কাজে মোতায়েন করা হয় যা সেনাবাহিনী নিজে করলে ধরা পড়ার ভয় থাকে। রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা চান তাদের তলোয়ার অন্য কারো হাতে থাকুক। তারা চান জনমনে প্রভাব বিস্তারকারী পণ্ডিতদের, যারা সত্য বলার মতো সাহসী, তাদেরকে মুছে ফেলতে। আর আইএস হলো সেই হাতিয়ার যাকে তারা অর্থায়ন করে এবং এই লক্ষ্য পূরণে লেলিয়ে দেয়।
এই হামলাগুলো শূন্য থেকে হয় না। এগুলো এমন এলাকায় ঘটে যা নিরাপত্তা চৌকি এবং নজরদারিতে ঘেরা। তাহলে কীভাবে একটি সশস্ত্র আইএস সেল সেখানে প্রবেশ করে, একজন সিনিয়র আলেমকে লক্ষ্যবস্তু করে এবং কোনো চিহ্ন না রেখেই অদৃশ্য হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
আইএসের ট্র্যাক রেকর্ড বা অতীত কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে একটি ধরণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্পষ্ট হয়ে ওঠে; অন্য কোনো ‘খারিজি’ গোষ্ঠী আলেমদের হত্যার পেছনে এতটা নিরবচ্ছিন্ন ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে মনোনিবেশ করেনি। এটি আকস্মিক নয়, এটি তাদের মতবাদ। তারা বোঝে যে, একজন শিক্ষিত মানুষ হাজার হাজার তরুণকে উগ্রবাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন। তাই তারা সেই সুযোগ দেওয়ার আগেই তাকে নির্মূল করে। তারা একে তাদের ডার্ক মেথডোলজি বা অন্ধকার পদ্ধতি বলে। আর আমরা একে যা বলার তাই বলি, ধর্মীয় নেতৃত্বকে পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্নকরণ।
এমনকি মঙ্গোল বা ক্রুসেডারদের আমলেও নয়—পুরো ইসলামি ইতিহাসে আলেমদের বিরুদ্ধে এমন নিয়মতান্ত্রিক ও লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক প্রচারণার নজির নেই। এটিই বলে দেয় আইএস আসলে কোথা থেকে নির্দেশ পায়। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে কোনো ধর্মতত্ত্ব নেই; এটি একটি গোয়েন্দা এজেন্ডা। যে কেউ এই কর্মসূচির সেবায় নিয়োজিত হবে না, তার জন্যই বরাদ্দ হয় মৃত্যুপরোয়ানা।
মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিসের হত্যাকাণ্ড সেই সত্যকেই আরও দৃঢ় করেছে যা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। পাকিস্তানের আইএস এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সামরিক বাহিনী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং প্রভাবশালী কণ্ঠস্বরগুলোকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিতে চায়, যাতে তাদের অপরাধের কথা উচ্চকণ্ঠে বলার মতো সাহস বা অবস্থান কারো না থাকে। তারা শুধু চায় ট্রিগারটা অন্য কেউ চাপুক, যাতে তাদের হাত পরিষ্কার দেখায়।
এই অঞ্চলে আলেমদের সাথে যা ঘটছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়। এটি একটি সমন্বিত গোয়েন্দা অপারেশন। আর যতক্ষণ পর্যন্ত আইএস এবং সামরিক জান্তার এই অশুভ আঁতাত টিকে থাকবে, ততক্ষণ এটি আলেম, চিন্তাবিদ এবং সমাজসেবীদের প্রাণ কেড়ে নিতেই থাকবে। শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিসের হত্যাকাণ্ড একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে, কেউ একজন চরমপন্থীদের হাতে ওই তলোয়ার তুলে দিয়েছে। এর সমাপ্তি তখনই সম্ভব যখন মানুষ চিনতে পারবে সেই ‘কেউ’ আসলে কে, এবং ঐক্যবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
