ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ: সেই বীর, শাহাদাত যাঁর পরিচয়কে উন্মোচিত করেছে!

✍🏻 ​আজমল

যুদ্ধ এবং আগ্রাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোতে, যখন জায়নবাদী শত্রু ভাবত যে গাযযার প্রতিটি নড়াচড়া তাদের গোয়েন্দা ও যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে, ঠিক তখনই এক নির্ভীক মুজাহিদ লড়াইয়ের মূল ময়দানে বুক চিতিয়ে চলছিলেন। দখলদাররা তাঁকে দেখতে পায়নি, কিন্তু প্রতিটি বেদনাদায়ক আঘাতের মাধ্যমে তারা তাঁর অভিযানের প্রভাব টের পেয়েছিল। সেই মানুষটি ছিলেন ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ, যিনি আবু সুহাইব নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

শত্রুরা নিজে থেকেই তাঁকে “আল-কাসসামের ছায়া” (The Shadow of al-Qassam) নাম দিয়েছিল। এটি কোনো উপহাস ছিল না, বরং এমন একজন কমান্ডারের সামনে তাদের ভয় এবং হতাশার এক অনিচ্ছাকৃত স্বীকৃতি ছিল, যাঁকে ট্র্যাক করা ছিল অসম্ভব এবং পরাজিত করা ছিল আরও কঠিন।

কিন্তু ১৫ মে, শুক্রবার রাতে সেই ছায়া আকাশে বিলীন হয়ে যায় এবং তাঁর আত্মাকে তাঁর স্রষ্টার কাছে ফিরিয়ে দেয়; তিনি শামিল হন সেইসব শহীদদের মিছিলে যাঁরা কখনোই অপমানের কাছে মাথা নত করেননি।

১৯৭০ সালে গাযযার এক দরিদ্র পাড়ায় জন্ম নেওয়া ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন নিভৃত সাধনা আর সচেতন আত্মগোপনের মধ্য দিয়ে। তিনি সাক্ষাৎকার দেওয়া, জনসমক্ষে আসা বা নিজের প্রচার করার মানুষ ছিলেন না। যুদ্ধক্ষেত্রই ছিল তাঁর আসল জগৎ।

তিনি আল-কাসসাম ব্রিগেডের অধীনস্থ ‘গাযযা ব্রিগেড’-এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা ছিল প্রতিরোধ আন্দোলনের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ফর্মেশনগুলোর একটি। শহুরে যুদ্ধ, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ এবং জটিল নিরাপত্তা অভিযানে তাঁর অসামান্য দক্ষতা জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক চিরস্থায়ী দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। গাযযা সিটির বুকে কেবল তাঁর উপস্থিতিই বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সেনাবাহিনীকে অস্থির করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল।

যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করা যাদের মজ্জাগত স্বভাব, সেই দখলদার বাহিনী আবারও তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে গাযযা সিটিতে বিমান হামলা চালায়। এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না। এটি ছিল তাদের ব্যর্থতার এক স্পষ্ট স্বীকারোক্তি। কয়েক বছর ধরে শত্রু তাঁকে হত্যার চেষ্টা করে আসছিল। বারবার তিনি গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যান। এমনকি ইসরায়েলি গণমাধ্যমও স্বীকার করেছে যে তিনি বারবার তাদের হাত ফসকে বেরিয়ে গেছেন। তবে এবার বোমাগুলো সরাসরি তাঁর বাড়িতে আঘাত হানে, যখন তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যার সাথে বসে ছিলেন। মুখোমুখি লড়াইয়ে জিততে না পারলে বাড়িঘর আর পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু করা—এটাই তো কাপুরুষ শত্রুর পুরোনো অভ্যাস।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আল-আকসা ফ্লাড (তুফান আল-আকসা) অভিযান শুরু হওয়ার পর ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদের নাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নিজে কোনো পরিচিতি চাননি বলে নয়, বরং বর্ষীয়ান নেতাদের শাহাদাতের পর প্রতিরোধ আন্দোলনকে সমন্বয় করা এবং এর কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠনে তিনি অত্যন্ত নিষ্পত্তিমূলক ভূমিকা পালন করেছিলেন। শত্রুরা তাঁকে হামাসের সবচেয়ে সক্ষম সামরিক কৌশলবিদদের একজন হিসেবে বিবেচনা করত—এমন একজন মানুষ যিনি অবিরাম বোমাবর্ষণের মধ্যেও একটি অত্যন্ত পরিশীলিত কমান্ড নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রেখেছিলেন।

নিজে শাহাদাত বরণ করার আগেই তিনি তাঁর দুই ছেলে সুহাইব ও মুমিনকে এই পবিত্র পথে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি কেমন পিতা, যিনি জেরুজালেমের মুক্তির জন্য নিজের হৃদয়ের টুকরোকে একের পর এক বিলিয়ে দিতে পারেন? এবং সবশেষে, তিনি নিজেও তাঁদের পথ অনুসরণ করলেন; স্ত্রী ও কন্যাসহ লাভ করলেন কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত।

হামাস এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকে সম্মান জানানোর অর্থ হলো মূলত সেইসব নারী-পুরুষদের সম্মান জানানো, যাঁরা সীমিত উপায় নিয়ে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সামরিক যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।

ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ ছিলেন সেইসব কমান্ডারদের একজন, যাঁর নাম হয়তো সবসময় সংবাদপত্রের শিরোনামে আসেনি, কিন্তু যাঁর বীরত্ব প্রতিরোধের প্রতিটি সম্মুখ সমরে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তিনি কোনো ছায়া ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক বাস্তব, যা শত্রু চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছিল। এবং তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে কোনো অধ্যায় শেষ হয়ে যায়নি। বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। কারণ শহীদদের রক্তই মুক্তির পথকে আলোকিত করে, আর সেই পথ কুদসের (জেরুজালেম) মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত শেষ হওয়ার নয়।

আজ রাতে গাজার আকাশে এক নতুন তারার উদয় হয়েছে। তাঁর নাম ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ। স্ত্রী ও কন্যাসহ তাঁর এই শাহাদাত আবারও এমন এক শাসকগোষ্ঠীর আসল চেহারা উন্মোচন করেছে, যারা চুক্তির প্রতি কোনো আনুগত্য বা যুদ্ধবিরতির প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি। জায়নবাদী আগ্রাসনের ইতিহাস ভঙ্গ করা প্রতিশ্রুতির কালিতে লেখা, আর এই সর্বশেষ হামলাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। রণাঙ্গনে ফিলিস্তিনি মুজাহিদদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে না পেরে তারা ঘরবাড়ি, জনসমাগমস্থল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে তাদের আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে চলেছে।

ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ এবং তাঁর পরিবারকে হত্যা করা কোনো গৌরবময় সামরিক সাফল্য নয়। এটি ছিল একটি স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ এবং এমন একজন মানুষের সামনে শত্রুর চূড়ান্ত অসহায়ত্বের প্রকাশ, যাঁকে তারা কখনোই জীবিত ধরতে পারেনি। দখলদাররা বারবার যা বুঝতে ব্যর্থ হয় তা হলো—নেতাদের শাহাদাত প্রতিরোধকে দুর্বল করে না। বরং একে পুনরুজ্জীবিত করে। ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর দুই সন্তানের রক্তে এবং সবশেষে নিজের ও তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগের মাধ্যমে তিনি যে পথ তৈরি করে গেছেন, তা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং সুদৃঢ়।

তাঁর মতো পুরুষদের মাদরাসায় হামাসের মুজাহিদদের এক নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠেছে—এমন সব পুরুষ যাঁরা আড়ালে থেকে লড়াই করেছেন এবং সম্মানের সাথে শাহাদাতকে আলিঙ্গন করেছেন। আজ রাতে গাযযা শোকাহত। কিন্তু গাযযা মাথা নত করেনি। আল-কাসসামের ছায়া হয়তো আকাশে বিলীন হয়ে গেছেন, কিন্তু তাঁর নাম বেঁচে থাকবে প্রতিটি টানেলে, প্রতিটি গলিতে এবং প্রতিটি প্রতিরক্ষামূলক ঘাঁটিতে—যেখানে আজও প্রতিরোধের চেতনা নিঃশ্বাস নেয়।

Exit mobile version