ইসলাম ও মুসলিমদের প্রথম কিবলার (বাইতুল মুকাদ্দাস) স্বাধীনতা আজ আরব ও অনারবের শক্তি-সামর্থ্যের ঊর্ধ্বে একটি অনন্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কারণ, গত কয়েক দশক ধরে বাইতুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে এমন এক সংকল্প, প্রতিরোধ ও শক্তির উত্থান ঘটেছে যে, অতীতের মতোই ইহুদি, ক্রুসেডার, নামধারী মুসলমান এবং জায়নবাদীরা সবাই এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। এই শক্তি এবং আল-আকসার স্বাধীনতার ডাকের সামনে বরাবরের মতোই কুফরের ঘণ্টা বেজে উঠেছে এবং এই আওয়াজ তোলা হচ্ছে যে: “হয় তাদের (ফিলিস্তিন) বেছে নাও, না হয় আমাদের।”
এই ঘোষণা ও শোরগোল নামধারী মুসলিমদের এতটাই ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে যে, তারা গাযযার মুসলিমদের ওপর চলমান বর্বরতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে শুধু নীরবতাই অবলম্বন করেনি, বরং গোটা কুফর ও বাতিলের পাশবিক অত্যাচারের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। গাযযায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নেমে এসেছে, কিন্তু এই মুসলমানরা তাদের না দিয়েছে পানি, না দিয়েছে খাবার; বরং উম্মাহর হকের পক্ষে আওয়াজ তোলাদের এবং মুজাহিদদের ‘সন্ত্রাসী’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।
উম্মাহ যখন দখলদারদের নির্মমতায় হতাশ হয়ে পড়েছিল, তখন এমন এক দীর্ঘ সংগ্রাম ও প্রতিরোধের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল, যা দমন ও নস্যাৎ করতে গোটা কুফর শক্তি মাঠে নেমে এসেছে। গাযযাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে, কিন্তু উম্মাহর এই মুখলিস (একনিষ্ঠ) ও বীর মুজাহিদরা নিজেদের বাহ্যিক সংকটগুলোকে যুদ্ধ ও প্রতিরোধের পথে কখনো বাধা হতে দেননি। বরং তাদের বিস্ময়কর অবিচলতা দিয়ে কাফের ও জায়নবাদীদের এই কথা মানতে বাধ্য করেছেন যে, তারা যেন তাদের নিজেদের সুরক্ষার গ্যারান্টি এই মুজাহিদদের কাছেই চায়।
এটি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ ও জিহাদের শক্তির বহিঃপ্রকাশ, যা অতীতের মতোই ঈমানদারদের শক্তিকে সময়ের গোলাম ও ঈমান বিক্রেতাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলেছে। আমরা জামানার সেই বাহিনী, যাদের তলোয়ার ঈমানের আলোয় কুফরের দুর্গ ও প্রাচীরগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। আজ এ কারণেই গোটা উম্মাহর তলোয়ারের উপাধি ফিলিস্তিনকে দেওয়া হচ্ছে, এবং সে বাইতুল মুকাদ্দাস অর্থাৎ প্রথম কিবলার ঋণ শোধ করতে গিয়ে সমগ্র কুফরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মুসলিম উম্মাহ কখনো খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মতো বীর সেনানীদের থেকে শূন্য থাকেনি। শহীদ ইয়াহইয়া সিনওয়ার থেকে শুরু করে ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদ পর্যন্ত—এসব শাহাদাত আমাদের সেই কোরবানির কথা মনে করিয়ে দেয়, যার জন্য নুরুদ্দীন জঙ্গী নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, কিন্তু উম্মাহর আত্মমর্যাদা, সংকল্প ও চেতনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। আজ হাদ্দাদের শাহাদাতও ইতিহাসের দীর্ঘ সফরে আমাদের সেই ত্যাগেরই একটি পুনরাবৃত্তি। এই পুনরাবৃত্তিই আমাদের শক্তিশালী করে তোলে, এবং ত্যাগের এই ধারাবাহিকতাই আমাদের জায়নবাদী, ইহুদি ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও জাগ্রত রাখে।
এই কাফেলা থেকে শহীদ ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদের বিদায় নেওয়া একটি বড় ক্ষতি, যার পর আমরা নিজেদের এক এতিমত্বের অনুভূতিতে আচ্ছন্ন পাচ্ছি। কিন্তু আমরা জায়নবাদী ও ইহুদিদের সামনে ততক্ষণ পর্যন্ত কখনোই মিটে (ধ্বংস হয়ে) যেতে পারি না, যতক্ষণ বাইতুল মুকাদ্দাস টিকে আছে। যতক্ষণ সে থাকবে, আমরাও টিকে থাকব। আমরা এভাবেই শাহাদাত, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করতে থাকব। এই পুনরাবৃত্তি আমাদের ক্লান্ত করবে না, বরং বহু কাফের ও বাতিলের অনুসারীদের তলোয়ারের ধাড়ে নিয়ে আসবে।
উম্মাহর মুজাহিদ বাহিনী ও কাতারগুলোর এটাই রহস্য যে, মুজাহিদরা সংখ্যায় কম শহীদ হলেও, কাফের ও বাতিলের অনুসারীরা এমনভাবে ধ্বংস হয় যে সুবিস্তীর্ণ ময়দানও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের জিহাদি প্রতিরোধ কখনো দুর্বল বা শেষ হতে পারে না, কারণ এটি এমন এক ভূখণ্ড যেখানে খালিদ (রা.) এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মতো মহান চরিত্রদের পদচিহ্ন ও উত্তরাধিকারীরা বিদ্যমান। যে মাটিতে উম্মাহর বীরদের কদম পড়েছে, সেখানে মুসলিম জাতি মিটে যাওয়া অসম্ভব। আমরাও থাকব এবং প্রথম কিবলাও অক্ষুণ্ণ থাকবে। আল্লাহ তাআলা শহীদ ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদের শাহাদাত কবুল করুন। আমীন।
