ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ হারালো এক মহান মুজাহিদ, কমান্ডার ও অনুপ্রেরণাদায়ী নেতাকে!

✍🏻 ​খালিদ আহরার

গাযযার আকাশ আরও একবার জায়নবাদী দখলদারদের যুলুম, বর্বরতা আর নির্মমতার আগুনে জ্বলে উঠেছে। ১৫ মে ২০২৬ তারিখে জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী গাযযা সিটির ঘনবসতিপূর্ণ আর-রিমাল এলাকার একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট এবং একটি বেসামরিক গাড়িকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু বানায়। এই অপরাধমূলক ও নৃশংস হামলায় বেশ কয়েকজন নিরীহ ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন, যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশিষ্ট, প্রভাবশালী ও উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন হামাসের সামরিক শাখা (আল-কাসসাম ব্রিগেডস)-এর অন্যতম প্রধান কমান্ডার ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদ (আবু সুহাইব) রাহিমাহুল্লাহ।

এই হামলা আবারও প্রমাণ করে যে, জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী কেবল সশস্ত্র প্রতিরোধের নেতাদেরই নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের মনোবল, সংকল্প ও আত্মাকেও লক্ষ্যবস্তু করতে চায়। কিন্তু ইতিহাস সর্বদাই এই সত্যের সাক্ষী যে, মজলুমের রক্ত স্বাধীনতার জন্য সর্বোত্তম সঞ্জীবনী সুধা (আবে-হায়াত) হিসেবে প্রমাণিত হয়।

ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদ (রাহিমাহুল্লাহ) কে ছিলেন?
ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদ ছিলেন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের একজন বীর, অভিজ্ঞ, বুদ্ধিদীপ্ত এবং উচ্চপর্যায়ের মুজাহিদ। তিনি বহু বছর ধরে হামাসের সামরিক শাখায় দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এবং উত্তর গাজার যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক অভিযানের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর। সুড়ঙ্গের জটিল নেটওয়ার্ক পরিচালনা, স্থলযুদ্ধ, দখলদার বাহিনীর সাঁজোয়া যানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক কৌশল এবং মুজাহিদদের মনোবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে তাঁকে সেইসব অন্যতম প্রধান কমান্ডার হিসেবে গণ্য করা হতো, যারা প্রতিরোধের শক্তি বৃদ্ধিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

মুজাহিদ এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের সমর্থকরা তাঁকে “গাযযার আত্মা”, ”আল-কাসসাম ব্রিগেডের হৃৎপিণ্ড” এবং “অপরাজেয় সংকল্পের প্রতীক” মনে করতেন। ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদ তাঁর পুরো জীবন, যৌবন, মেধা ও শক্তি ফিলিস্তিন ও আল-কুদসের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং মুসলিম উম্মাহর সম্মান ও মর্যাদার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি কেবল একজন কমান্ডারই ছিলেন না, বরং এমন একজন অনুপ্রেরণাদায়ী নেতাও ছিলেন যিনি তরুণদের জিহাদ, কোরবানি ও প্রতিরোধের পাঠ দিতেন।

তাঁর শাহাদাত সমগ্র প্রতিরোধ ফ্রন্টের জন্য একটি বড় এবং বেদনাদায়ক ক্ষতি, কিন্তু একই সাথে এটি হাজার হাজার তরুণের জন্য নতুন সংকল্প, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক মহান আলোকবর্তিকা ও অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছে। প্রতিটি শহীদ প্রতিরোধের বৃক্ষকে নতুন জীবন দান করেন এবং এর ফলে হাজার হাজার নতুন উদ্যমী, সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুজাহিদ জেগে ওঠেন।

জায়নবাদী বর্বরতা ও গাযযা প্রতিরোধ
জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী এই হামলাকে তাদের “বিজয়” এবং “গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য” হিসেবে প্রচার করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই হামলাগুলো মূলত সেই দীর্ঘ ও অমানবিক অবরোধ, গাযযার আকাশ, পানি ও ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ, প্রতিদিনের নির্মম হত্যাকাণ্ড, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং ফিলিস্তিনি ভূমিতে ক্রমাগত দখলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের একটি বৈধ, পবিত্র ও মানবিক প্রতিক্রিয়ারই প্রতিশোধ মাত্র।

৭ অক্টোবর ২০২৩-এর ‘তুফান আল-আকসা’ অভিযানের পর থেকে জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী গাজায় মানব ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও নৃশংসতম যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে। হাজার হাজার শিশু, নারী, ডাক্তার, শিক্ষক এবং বয়োবৃদ্ধদের শহীদ করেছে; হাসপাতাল, স্কুল, মসজিদ ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তা সত্ত্বেও, গাযযার জনগণ ও মুজাহিদদের প্রতিরোধের সংকল্প আজ পর্যন্ত ভাঙা সম্ভব হয়নি।

গাজার বীর ও ধৈর্যশীল জনগণ গত আড়াই বছরে অভূতপূর্ব ধৈর্য, অবিচলতা ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মৃত্যু, রক্তপাত, সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্ভিক্ষ, পানি ও বিদ্যুতের অনুপস্থিতি এবং সব ধরনের মানসিক ও শারীরিক চাপ সত্ত্বেও তাদের প্রতিরোধের চেতনা দিনে দিনে আরও শক্তিশালী ও বেগবান হচ্ছে। আজ গাজার প্রতিরোধ পুরো পৃথিবীর মজলুম, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের জন্য আশা, সাহস ও সাফল্যের এক মহান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

আল-কাসসাম ব্রিগেডস: উম্মাহর আশার আলো
হামাস হলো একটি ইসলামি, জাতীয়, বিপ্লবী ও গণ-প্রতিরোধ আন্দোলন, যা ফিলিস্তিনের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং মুসলিম উম্মাহর মর্যাদার জন্য আত্মপ্রকাশ করেছে। এর সামরিক শাখা ‘আল-কাসসাম ব্রিগেডস’ এই পুরো ঐতিহাসিক সংগ্রামে কেন্দ্রীয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তারা কেবল সশস্ত্র সংগ্রাম, রকেট হামলা, স্থল অভিযান এবং সুড়ঙ্গের যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক সেবা, ত্রাণ কার্যক্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণমূলক কাজেও ব্যাপক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

আল-কাসসাম ব্রিগেডের মুজাহিদদের বীরত্ব, কৌশল, আন্তরিকতা ও ত্যাগের গল্পগুলো আজ বিশ্বজুড়ে মজলুম মুসলিম এবং স্বাধীনতাকামীদের জন্য আশা ও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল মিনার হয়ে উঠেছে। সুড়ঙ্গ থেকে শুরু করে ড্রোন পর্যন্ত, রকেট থেকে স্থলযুদ্ধ পর্যন্ত এবং মিডিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় পর্যন্ত তাদের এই সংগ্রাম এই সত্যকে স্পষ্ট করে যে, দৃঢ় ঈমান, ঐক্যবদ্ধ সংকল্প এবং আন্তরিকতা যেকোনো প্রযুক্তি ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিপরীতে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারে।

ইতিহাস আমাদের বারবার এই শিক্ষাই দেয় যে, মজলুমের প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত সফল হয়। আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, লেবাননসহ অন্যান্য উদাহরণ এই বাস্তবতার সাক্ষী যে—দখলদার শক্তি যতই শক্তিশালী, নিষ্ঠুর ও সশস্ত্র হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই তাদের নিয়তি হয় এবং ইতিহাস মজলুমদের পক্ষেই বিজয়ের মহাকাব্য লেখে।

ইজ্জুদ্দীন হাদ্দাদ (তাকাব্বালাহুল্লাহ)!
আপনার শাহাদাত কবুল হোক। আপনার পবিত্র রক্ত ইনশাআল্লাহ স্বাধীনতার বৃক্ষের জন্য সর্বোত্তম সেচ হিসেবে প্রমাণিত হবে এবং এই বৃক্ষ থেকে অসংখ্য নতুন, শক্তিশালী, সফল ও ফলপ্রসূ শাখা গজিয়ে উঠবে। মুসলিম উম্মাহ এ থেকেই তাদের তুফানি প্রতিরোধ কাফেলার তৃষ্ণা মেটাবে, এবং আল-কুদস শরীফের স্বাধীনতার মশাল কখনো নিভে যাবে না, বরং তা আরও উজ্জ্বল এবং আরও উচ্চে প্রজ্জ্বলিত হতে থাকবে।

Exit mobile version