দেশীয় শিল্প: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি!

✍🏻 ​নকীব আহমাদ হামিদি

আফগানিস্তান তার পুরো ইতিহাস জুড়ে পরিশ্রম, সাহস এবং নিরন্তর সংগ্রামের দেশ হিসেবে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দখলদারিত্ব ও আগ্রাসনের কারণে দেশটি সবদিক থেকে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে, যার প্রভাব অন্যান্য খাতের পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আজ এই দেশ আবারও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে এবং এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে এর বাসিন্দারা নিজেদের পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতা রাখে। এখন অন্যের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে আমরা আমাদের দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করতে পারি। দেশীয় শিল্প আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সহায়ক হতে পারে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

ইসলাম পরিশ্রম, হালাল উপার্জন এবং উৎপাদনকে উৎসাহিত করে। শরিয়তে হালাল রুজি অন্বেষণ করা একজন মুসলিমের জন্য ইবাদতের মর্যাদা রাখে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই হাতের প্রশংসা করেছেন যা অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়ার পরিবর্তে নিজের শ্রমে রিযিক আহরণ করে। দেশীয় শিল্প মূলত এই নীতিরই ব্যবহারিক রূপ, কারণ এটি মানুষের জন্য হালাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, বেকারত্ব হ্রাস করে এবং সমাজকে পরনির্ভরশীলতা থেকে রক্ষা করে।

দেশীয় শিল্প কেবল একটি অর্থনৈতিক অবস্থান নয়, বরং এটি সামাজিক শৃঙ্খলা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধেরও প্রতিফলন। ইসলামী চিন্তা অনুযায়ী, মুসলিম উম্মাহর উচিত তাদের প্রয়োজনীয়তা যতটা সম্ভব নিজস্ব সম্পদ ও সক্ষমতার মাধ্যমে পূরণ করা, যাতে মানুষের আত্মমর্যাদা সংরক্ষিত থাকে। যখন দেশে উৎপাদনের চাকা সচল থাকে, তখন জনগণকে জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজনে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না; আর এটি অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় অবস্থা।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার কাল্পনিক সীমান্তে বাণিজ্যিক পথ বন্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের এই সত্যটি শিখিয়েছে যে, দেশীয় উৎপাদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমাদের দেশে কুটির শিল্প বা দেশীয় শিল্প না থাকত, এবং যদি পূর্ববর্তী সরকারের মতো আমাদের নেতারা হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন এবং সময়মতো অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন না করতেন, তবে বাজারের স্থিতিশীলতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ আরও অনেক বেশি সংকটে পড়ত। এই অভিজ্ঞতাই স্পষ্ট প্রমাণ দেয় যে, বিদেশি আমদানির ওপর পূর্ণ নির্ভরতা কোনোভাবেই টেকসই সমাধান হতে পারে না।

দেশীয় শিল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং তরুণদের জন্য সম্মানজনক জীবনের পথ সুগম করে। ফিতনা, বেকারত্ব এবং অভাবের দুয়ার বন্ধ করে হালাল রুজির পথ খোলা রাখা সমাজের কাঁধে একটি বড় দায়িত্ব। প্রতিটি কারখানা এবং উৎপাদন কেন্দ্র এই কল্যাণ ও মঙ্গলের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

আফগানিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদের এক অতুলনীয় ভাণ্ডার, যা দেশীয় শিল্পের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করে। প্রয়োজনীয় শিল্পের জন্য কাঁচামাল সহজেই সংগ্রহ করা সম্ভব। যদি এই সম্পদগুলোকে দেশের অভ্যন্তরে শিল্পোন্নয়নে কাজে লাগানো হয়, তবে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, জাতীয় আয়ের উৎস বৃদ্ধি পাবে এবং এই পথে পা বাড়ানো প্রতিটি শিল্পোদ্যোক্তা দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অংশীদার হিসেবে গণ্য হবেন।

আফগানরা যদি তাদের দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করে এবং উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, তবে কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণই সম্ভব হবে না, বরং রপ্তানির মাধ্যমে তারা তাদের মূল্যবান পণ্যগুলো বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারবে। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় আয় বাড়বে। যখন তাদের ফ্যাক্টরি এবং কারখানাগুলো উচ্চমানের পণ্য তৈরি করবে, তখন বিদেশি দেশগুলোর আস্থা বাড়বে এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে; যার ফলে দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপরও সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এটি উল্লেখ্য যে, ‘ইমারতে ইসলামিয়া’র নেতৃবৃন্দ শিল্পের উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক ও নজিরবিহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সুযোগ-সুবিধা প্রদান, বিনিয়োগে উৎসাহ দান এবং দেশীয় উৎপাদনের পৃষ্ঠপোষকতা—এসবই জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ।

পরিশেষে বলা যায়, দেশীয় শিল্প আফগানিস্তানের জন্য কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি একটি শরয়ী ও জাতীয় দায়িত্বও বটে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, দেশীয় উৎপাদনের শক্তিশালীকরণই সম্মান ও স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ। আসুন, আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আফগান পণ্যের সমর্থন করি, আমাদের শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করি এবং এমন এক সমাজ গঠনে অংশ নিই যার অর্থনীতি হালাল পরিশ্রমের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

Exit mobile version