দায়িত্ব থেকে পলায়ন! ​

সালামত আলী খান

গত শুক্রবার, জুমার নামাজের ঠিক আগ মুহূর্তে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের শহরতলী তর্লাই এলাকার একটি শিয়া ইমামবারগায় এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। এর ফলে বেশ কিছু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। ঘটনাটি তখন ঘটে যখন জুমার নামাজ চলছিল, এক রাকাত শেষ হয়ে দ্বিতীয় রাকাত শুরু হয়েছিল।

ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রত্যক্ষদর্শীদের কোনো বয়ান জনসমক্ষে আসেনি, কেবল সরকারি বক্তব্যই সামনে এসেছে। তবে বেসরকারি বক্তব্যগুলোতে একে অপরের সাথে বড় ধরনের বৈপরীত্য পাওয়া যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক ব্যবহারকারী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এলাকার মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে লিখেছেন যে, এই ঘটনাটি বেশ কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তির হামলার ফল। ওই সশস্ত্র ব্যক্তিরা নামাজের দ্বিতীয় রাকাতের সময় নিরীহ মুসল্লিদের ওপর অস্ত্র চালিয়েছে, যার ফলে ডজনখানেক মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।

আবার কেউ কেউ বলছেন যে, প্রথমে গুলিবর্ষণ হয়েছে এবং এরপর একটি বড় বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু সেই বিস্ফোরণটি কিসের ছিল? সে বিষয়ে তাদের কাছেও কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই, কেবল অনুমান করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বলে আসছেন যে, এই হামলাটি একজন আত্মঘাতী হামলাকারী চালিয়েছে এবং সে মুসল্লিদের মাঝে নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছে। একইভাবে দায়েশ (আইএস) খাওয়ারিজদের পক্ষ থেকেও এই ঘটনার দায় স্বীকার করা হয়েছে এবং একজন আত্মঘাতী হামলাকারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনার পর বিভিন্ন দেশ থেকে নিন্দাসূচক বিবৃতি এসেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল আফগানিস্তানের ইসলামি আমিরাতের পক্ষ থেকে আসা বিবৃতি। তারা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করেছে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, পাকিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এই নিন্দাকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে বরাবরের মতো ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপবাদের পথ বেছে নিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তি কোনো প্রমাণ বা যুক্তি ছাড়াই অত্যন্ত অপেশাদার ভঙ্গিতে দাবি করেছেন যে, এই ঘটনার সম্পর্ক আফগানিস্তানের সাথে এবং এই হামলার পরিকল্পনা সেখানেই করা হয়েছে। হামলাকারীকেও আফগান নাগরিক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবি নাকচ করে দিয়ে জানায় যে, হামলাকারী আফগান নয় বরং পাকিস্তানি ছিল। পাশাপাশি অন্যান্য কর্মকর্তা এবং সরকারি অনুদানভোগী কিছু আলেমও ময়দানে নেমে এই ঘটনার জন্য আফগানিস্তানকে অভিযুক্ত করেছেন।

এই ঘটনার পর হামলাকারীর একটি পরিচয়পত্রও (আইডি কার্ড) মিডিয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছে, যা হামলাকারীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রতিক্রিয়ার কারণগুলো স্পষ্ট, কারণ ওই পরিচয়পত্রটি আপাতদৃষ্টিতে একদম অক্ষত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে; কেবল এক জায়গায় সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত বা কাটা। যে জায়গাটি কাটা, সেখানে সিম কার্ডের মতো একটি ধাতব চিপ থাকে, যেখানে বিশেষজ্ঞদের মতে সমস্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে।

এখন প্রশ্ন জাগে যে, প্রথমত হামলাকারী কেন নিজের পরিচয়পত্র সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাবে? ঠিক আছে, হয়তো কোনো প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু যখন একটি বিস্ফোরণ ঘটে এবং এত বড় মাপের ক্ষয়ক্ষতি হয় যে ডজনখানেক মানুষ প্রাণ হারায়, তখন সেই অবস্থায় একটি পরিচয়পত্র পুরোপুরি অক্ষত থাকে কীভাবে? আর যদি কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও থাকে, তবে ঠিক সেই অংশটিই কেন হলো যেখানে তথ্য সংরক্ষিত থাকে? এসবের অর্থ কী?

এর মানে কি এই নয় যে—হয় এই কার্ডটি হামলাকারীর নয় এবং জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য এটি দেখানো হয়েছে, অথবা কার্ডটি আসলেই হামলাকারীর কিন্তু তাকে শাসকগোষ্ঠীর কোনো মহল এই হামলার জন্য প্রস্তুত করেছিল এবং কার্ডটি তার কাছ থেকে আগেই নিয়ে রাখা হয়েছিল? এরপর হামলার সময় কার্ডটি প্রদর্শন করা হয়েছে, তবে চিপ বা তথ্য সমৃদ্ধ অংশ ছাড়াই, যাতে হামলাকারী ও অপরাধী চক্রের মধ্যকার গোপন তথ্যগুলো সংরক্ষিত থাকে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, কর্মকর্তাদের এই স্ববিরোধী বক্তব্য, অযৌক্তিক পদক্ষেপ এবং প্রাথমিক পর্যায়েই কোনো তদন্ত ছাড়া অন্যের ওপর দোষ চাপানো পরিষ্কারভাবে দায়িত্ব থেকে পলায়নের লক্ষণ। একারণেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী এক কথা বলছেন আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন অন্য কথা। প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ অধিকাংশ কর্মকর্তা অভিযোগের তীর আফগানিস্তানের দিকে ছুড়ছেন, কিন্তু অন্যদিকে পাকিস্তানের সচেতন রাজনীতিবিদরা স্পষ্টভাবে বলছেন, “যদি এত সন্ত্রাসী আফগানিস্তান থেকে আসে, তবে আপনারা প্রতিরক্ষার যে দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন, তা কতটুকু পালন করছেন?”

ইসলামাবাদ থেকে সীমান্ত পর্যন্ত শত শত কিলোমিটার দূরত্ব, ডজন ডজন চেকপোস্ট, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং অসংখ্য তল্লাশি চৌকি রয়েছে। এরপরও একজন হামলাকারী সমস্ত অস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে কীভাবে তার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়? কোনো কোনো রাজনীতিবিদ ব্যঙ্গ করে বলেছেন যে, খাইবার পাখতুনখাওয়ার মতো বড় প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আপনাদের পাহারার কারণে তার দলীয় নেতা ইমরান খানের সাথে একটি সাক্ষাৎ পর্যন্ত করতে পারেন না, অথচ এখানে হামলাকারী অনায়াসে লক্ষ্যে পৌঁছে সফল হয়ে যাচ্ছে! তাহলে আপনারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন কেন?

পর্যবেক্ষকরা আরও বলছেন যে, নিজ জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক শাসকচক্রের ব্যর্থ ও দমনমূলক নীতি তাদের সমস্ত পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং বিশ্বের সামনে তাদের আসল চেহারা উন্মোচিত করেছে যে—না তাদের শক্তি আছে, না আছে গোয়েন্দা দক্ষতা। কারণ কয়েকদিন আগেই বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বেলুচিস্তানের ডজনখানেক বড় শহরে একযোগে হামলা চালিয়ে রাজধানী কোয়েটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল। কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ইসলামাবাদের এই হামলার পথ প্রশস্ত করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাতে দোষ আফগানিস্তান ও অন্যান্য দেশের ওপর চাপিয়ে বেলুচিস্তানের ব্যর্থতা ধামাচাপা দেওয়া যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ময়দানেও নিজ জনগণের ওপর জুলুম এবং তাদের ভোটের অধিকারকে সামরিক শাসকচক্র দুই বছর আগেই পদদলিত করেছে। জনগণ বিপুল ভোটে ইমরান খান ও তার দলকে জয়ী করেছিল, কিন্তু তাকে কারাবন্দি করে একটি ব্যর্থ সরকার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ ইমরান খান ছিলেন জনগণের প্রতিনিধি এবং জনগণের অধিকারের জন্য কাজ করছিলেন, যা সামরিক শাসকচক্রের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল।

এখন যেহেতু পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ইমরান খানের সমর্থনে জেগে উঠেছে এবং তারা ৮ই ফেব্রুয়ারিকে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের দিন হিসেবে ঘোষণা করেছিল (যা একটি বিশাল আন্দোলনে রূপ নেওয়ার কথা ছিল), তখন শাসকগোষ্ঠী জনগণের মনোযোগ মূল সমস্যা থেকে সরিয়ে দিতে এই ধরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই যুক্তির সপক্ষে আরও বলা হচ্ছে যে, দায়েশ খাওয়ারিজরা পুরোপুরি পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের আস্তানা পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ঠিক করে দেয় এবং তাদের দিয়ে নিজেদের অশুভ উদ্দেশ্য হাসিল করে। গত কয়েক মাসে এই বিষয়টি বারবার প্রমাণিত হয়েছে, তাই পর্যবেক্ষকদের এই মন্তব্য যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

Exit mobile version