বালুচ প্রতিরোধ: পাকিস্তানি শাসনের নিপীড়ন ও নির্যাতনের ফলাফল!

✍🏻 আকবার জিন্নাহ

বেলুচিস্তান প্রদেশে চলমান সহিংসতা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যর্থতা, মানবাধিকারের ক্রমাগত লঙ্ঘন এবং সামরিক কেন্দ্রিক নীতির প্রত্যক্ষ ফলাফল; এটি কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ফসল নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রিপোর্ট এবং স্বাধীন তদন্তগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে—জবরদস্তি মূলক গুম, ব্যাপক সামরিক অভিযান, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা হলো সেইসব কারণ যা বছরের পর বছর ধরে বেলুচিস্তানকে একটি স্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্বকে আরও গভীর করেছে এবং দ্বন্দ্বের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কর্তৃক বালুচ কর্মী, ছাত্র, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের গুম করার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। হাজার হাজার পরিবার আজও তাদের নিখোঁজ প্রিয়জনদের পরিণতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি এই বার্তাও দেয় যে, রাষ্ট্র রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগকেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে। এই চাপের ফলেই বালুচ জনগণের অসন্তোষ এখন প্রতিরোধে রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে, তথ্য-প্রমাণ ও লভ্য তথ্যানুযায়ী বালুচ নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের আসল কেন্দ্রগুলো বেলুচিস্তানের ভেতরেই বিদ্যমান। যুদ্ধের সংগঠন, অভিযানের তদারকি এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো সেই মাটি থেকেই নেওয়া হয় যেখানে এই সমস্যার জন্ম হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক রিপোর্ট, গোপন নথি বা স্বাধীন বিশ্লেষণ এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি যে, বালুচ সশস্ত্র নেতৃত্ব আফগানিস্তান বা অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্র থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই সত্যকে অস্বীকার করা একটি বিশ্লেষণাত্মক দুর্বলতা এবং ইচ্ছাকৃত বিকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়।

তা সত্ত্বেও পাকিস্তানি মিডিয়া এবং সামরিক জান্তা বারবার এই সংকটের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রগুলোকে, বিশেষ করে আফগানিস্তানকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করে। এই ধরনের দাবিগুলো সাধারণত রাজনৈতিক চাপ কমাতে, আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করতে, বিদেশি সাহায্য পেতে এবং অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ধামাচাপা দিতে ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে আফগানিস্তানের নাম নেওয়া সমস্যা সমাধানের পথ নয়, বরং বাস্তবতা থেকে পালানোর একটি সহজ পথ মাত্র।

আফগানিস্তান ইসলামী আমিরাত তার সরকারি নীতি ও মৌলিক নীতি অনুযায়ী সর্বদা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে অটল রয়েছে। এই অবস্থান কেবল বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাস্তবেও প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামী আমিরাত একাধিকবার ঘোষণা করেছে এবং প্রায়োগিক রাজনীতিতে দেখিয়েছে যে, তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতা সমর্থন করে না এবং আফগানিস্তানের ভূমিকে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেয় না। এই নীতি অনুসরণ করাকে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মনে করা হয়।

প্রকৃত সত্য হলো, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যদি এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবে ভিত্তিহীন অভিযোগের পরিবর্তে তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রতিবেশীদের ওপর দোষারোপ করলে না যুদ্ধ শেষ হয়, না বেলুচিস্তানের জনগণের ক্ষত উপশম হয়। বরং পাকিস্তানের উচিত রাজনৈতিক সমাধানের পথ অবলম্বন করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা, বেলুচিস্তানের জনগণকে ন্যায্য রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলোর সাহায্য নেওয়া, যাতে এই সমস্যাগুলোর যৌক্তিক, ন্যায়সংগত এবং স্থায়ী সমাধান করা যায়।

পরিশেষে বলা যায় যে, বালুচ এবং পাকিস্তানের মধ্যে চলমান এই সহিংসতা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নিজস্ব নীতিরই স্বাভাবিক পরিণতি। তারা যা বপন করেছিল, আজ তাই কাটছে। যতক্ষণ না সমস্যার মূলে নজর দেওয়া হচ্ছে এবং তার বদলে অন্যদের ওপর দোষারোপ করা হচ্ছে, ততক্ষণ এই সংকট চলতেই থাকবে।

বাস্তবতা অত্যন্ত পরিষ্কার; বেলুচিস্তান সংকটের জন্ম পাকিস্তানে এবং এর সমাধানও এখানেই আছে, কাবুলে নয়।

Exit mobile version