পাকিস্তানি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক ও সামরিক হিপনোটিজম!

✍🏻 ​আকবার জামাল

পাকিস্তানি জনগণকে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থার মধ্যে নিমজ্জিত করা হয়েছে, যাকে সহজ ভাষায় “রাজনৈতিক ও সামরিক হিপনোটিজম” বলা যেতে পারে। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে মানুষ নিজের দুঃখ, ক্ষতি এবং শোষণ দেখতে পায়, কিন্তু তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব সাহস হারিয়ে ফেলে।

বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার জন্য বলা যেতে পারে যে, নাস্তিকরা সাধারণত দাবি করে, ধর্ম একটি আফিম (নেশা), যা মানুষকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাদের মতে, ধর্মপ্রাণ মানুষরা একটি কাল্পনিক তৃপ্তি, কাল্পনিক জান্নাত এবং অবাস্তব জীবনে বাস করে এবং জাগতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা রাখে না। এই বয়ানটি অন্যান্য ধর্মের পাশাপাশি বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, যদিও একজন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি এবং কুসংস্কারপূর্ণ অভিযোগ।

কিন্তু একটি তিক্ত সত্য হলো, আজ নেশা বা আফিমের এই ধারণাটি ধর্মের চেয়ে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অনেক বেশি সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। পাকিস্তানে গত ৭৮ বছর ধরে এমন একটি রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো চেপে বসে আছে যা ক্রমাগত জনগণের কাছ থেকে আত্মত্যাগ দাবি করে আসছে, কিন্তু বিনিময়ে তাদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর স্পষ্ট উদাহরণ হলো দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।

রেকর্ড মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামের ক্রমাগত বৃদ্ধি, রুপির মান কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি—এই সবকিছুই জনগণকে, বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে এমন এক অসহনীয় চাপের মুখে ফেলেছে যে কিছু মানুষ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার কারণে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই সবকিছুর ফলাফল হলো, একটি সম্মানজনক জীবনযাপন করা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে। ক্রমাগত রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচনী বিতর্ক, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বাচিত সরকার উৎখাত, ঘোষিত ও অঘোষিত মার্শাল ল এবং গঠনমূলক সংলাপের অভাব; এই সবকিছু একটি টেকসই ও জনবান্ধব শাসনের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় শক্তি জনসমস্যার সমাধানের পরিবর্তে ক্ষমতার লড়াইয়ে অপচয় হচ্ছে, যার সরাসরি ক্ষতি সাধারণ নাগরিককে বইতে হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তানে সশস্ত্র সহিংসতার ঘটনা ক্রমাগত ঘটছে, অন্যদিকে বড় শহরগুলোতে স্ট্রিট ক্রাইম, পারস্পরিক শত্রুতা, চুরি, ডাকাতি এবং নারীদের ওপর প্রকাশ্য হয়রানি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বোধ সম্পূর্ণ ছিনিয়ে নিয়েছে। যে রাষ্ট্র একসময় নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো, তা ধীরে ধীরে জনগণের জন্য এক অজানা পরিণতির প্রতীকে পরিণত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে মানবাধিকারের সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গুম ও গ্রেফতার এবং মিডিয়ার ওপর চাপ—এসব বিষয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই পরিবেশে ভিন্নমতকে দেশদ্রোহিতা এবং প্রশ্ন তোলাকে বিদ্রোহের সমতুল্য মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আচরণ এবং মানবিক ট্র্যাজেডিগুলো এই অবিশ্বাসকে আরও গভীর করছে। মুরিদকে-র মতো ঘটনা, তিরাহ উপত্যকা এবং অন্যান্য উপজাতীয় এলাকায় সামরিক অভিযান, প্রাণহানি এবং ক্রমাগত বাস্তুচ্যুতি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে মারাত্মক মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সব উপাদান জনগণ, সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বাহ্যিক ও বৈশ্বিক চাপও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক, যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর শর্তাবলি কেবল জাতীয় সার্বভৌমত্বকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং এর শেষ বোঝাও সাধারণ নাগরিকের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সব বাস্তবতা একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে যে, “পাকিস্তান একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের শিকার হয়েছে।”

এতদসত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায়, পরিস্থিতি যখন এতই শোচনীয়, তখন জনগণ চুপ কেন?
• তারা কেন এই অত্যাচারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে না?
• কেন তাদের কলার ধরে জবাব চায় না?
• আর কেনই বা নিজেদের এই হায়েনাদের সহজ শিকারে পরিণত করে রেখেছে?

ট্র্যাজেডি হলো, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সেই দাবিতেই পাওয়া যায় যা উপরে নাস্তিকদের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, একই মনস্তাত্ত্বিক দিক এখানে আবার সামনে আসে, যার অভিযোগ তারা ধর্মের ওপর আরোপ করে। পাকিস্তানি জনগণকে অত্যাচারী শাসক এবং সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে—যদি এই সেনাবাহিনী, এই রাজনৈতিক দলগুলো এবং এই বর্তমান ব্যবস্থা টিকে না থাকে, তবে দেশ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে; বিদেশি শক্তি আক্রমণ করবে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে এবং তাদের অবস্থা লিবিয়া বা গাযযার মতো হবে। অথচ তিক্ত ও বেদনাদায়ক সত্য হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলোই গত ৭৮ বছর ধরে নিজ জনগণের ওপর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং এমনকি সরাসরি গণহত্যা চাপিয়ে দিচ্ছে।

অন্য কথায়, পাকিস্তানি জাতির ওপর এটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তার জীবন এই পাকিস্তানি হত্যাকারী সেনাবাহিনীর সাথেই জড়িত; অর্থাৎ তাকে প্রতি মুহূর্তে এই বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে হবে যে তার আসল রক্ষক এই ঘাতক সেনাবাহিনীই। এটাই হলো রাজনৈতিক ও সামরিক হিপনোটিজম—একটি মানসিক নেশাগ্রস্ত অবস্থা—যেখানে মজলুম পাকিস্তানি মুসলমান নিজ সেনাবাহিনীর যুলুমও দেখছে, কিন্তু তবুও চুপ থাকছে। তাকে এটা ভাবতে দেওয়া হচ্ছে না যে, প্রকৃত নিরাপত্তা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থেকে নয়, বরং ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং জনসচেতনতা থেকে জন্ম নেয়।

যতক্ষণ না মযলুম পাকিস্তানি মুসলিম নিজের চিন্তাধারায় পরিবর্তনের সাহস সঞ্চয় করছে, যতক্ষণ না সে প্রশ্ন তুলছে—“আমরা কেন এসব সহ্য করছি?” ততক্ষণ কোনো স্লোগান, কোনো দল বা কোনো শক্তি তাদের ভাগ্য বদলাতে পারবে না।

কারণ ইতিহাসের নীতি অত্যন্ত স্পষ্ট! যে জাতি চিন্তা করা এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া ছেড়ে দেয়, তাদের ওপর অত্যাচারী ও যালেমরা চেপে বসে, যারা ধীরে ধীরে তাদের ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে।

 

Exit mobile version