​তিরাহ উপত্যকায় সামরিক অভিযান: নিপীড়ন ও ক্ষমতার রাজনীতি! ​

✍🏻 আকবার জামাল

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের তিরহ উপত্যকায় সেনাবাহিনীর নির্দেশে স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা কেবল একটি নিরাপত্তা অভিযান নয়; বরং এটি পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, স্বার্থের রাজনীতি এবং ভিন্নমত দমন করার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠছে।

কয়েক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তিরহ উপত্যকায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) তথাকথিত উপস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানুয়ারির শেষ নাগাদ এলাকা খালি করার জন্য হুমকিমূলক বার্তা পেতে শুরু করে। ফলে হাজার হাজার মানুষ তীব্র শীতের মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে তুষারপাত শুরু হয়, রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায় এবং যানবাহন আটকে পড়ে। নির্ভরযোগ্য ভিডিও রিপোর্ট অনুযায়ী—তীব্র শীত, ক্ষুধা এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে বেশ কিছু নিরপরাধ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

এই ট্র্যাজেডি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও এই ঘটনা রিপোর্ট করেছে। সারা বিশ্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি এই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে যে, সন্ত্রাসবাদের নামে একটি পুরো জনপদকে এভাবে ‘যৌথ শাস্তি’ (Collective Punishment) দেওয়া কোন ধরনের পেশাদার সেনাবাহিনীর কাজ হতে পারে?

বিশ্বজুড়ে সমালোচনা বাড়তে দেখে সেনাবাহিনী তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে (ইউ-টার্ন নেয়) এবং দাবি করে যে, এলাকাবাসীকে এলাকা ছাড়ার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কিন্তু সমস্যা হলো—সেনাবাহিনীর পূর্ববর্তী বিবৃতি, রেকর্ডকৃত ডিজিআইএসপিআর (DGISPR)-এর প্রেস কনফারেন্স, মিডিয়া রিপোর্ট এবং সরকারি নথি সেনাবাহিনীর এই বর্তমান দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে, যেখানে অভিযানের স্পষ্ট ঘোষণা ছিল।

এই পর্যায়ে পাকিস্তানের সচেতন মহলসহ খাইবার পাখতুনখোয়া প্রাদেশিক সরকার, বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি এই অভিযানের বিরোধিতা করেছেন। প্রাদেশিক সরকারের অবস্থান কেবল মানবিকই নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নেওয়া।

সোহেল আফ্রিদির মতে, ২০০৭ সাল থেকে সেনাবাহিনী ডজন ডজন সামরিক অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু না এসেছে শান্তি, না শেষ হয়েছে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ। এখন তিরহ উপত্যকায় ঘোষিত সামরিক অভিযানের ফলে পাকিস্তানকে আবারও একই নীতি ও একই ফলাফলের সম্মুখীন হতে হবে। উপরন্তু, তীব্র শীতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহীন করার ফলে একটি ভয়াবহ মানবিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সেনাবাহিনী এই ভিন্নমতকে তাদের ‘অহংকারে’র লড়াই বানিয়ে নিয়েছে। যখন প্রাদেশিক সরকার সেনাবাহিনীর অসংলগ্ন অবস্থানের ওপর যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছে এবং তাদের নিজ বক্তব্য থেকে সরে আসার অভিযোগ এনেছে, তখন সেনাবাহিনীপন্থী শক্তিশালী মহলগুলো খাইবার পাখতুনখোয়া সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সেনাবাহিনীপন্থী মিডিয়া, ফেডারেল প্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট প্রোপাগান্ডা গোষ্ঠীগুলো একসুরে বলতে শুরু করেছে যে, “প্রাদেশিক সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে (অর্থাৎ সেনাবাহিনীকে) কলঙ্কিত করছে।”

এরই মধ্যে হঠাৎ করে ইসলামাবাদের একটি আদালতের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইমের অভিযোগে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এটি কেবল কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়… সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এটি সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা যার মাধ্যমে সেনাবাহিনী তাদের স্বার্থ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিতর্কিত বাণিজ্যিক প্রকল্পের পথে আসা প্রতিটি বাধাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নীতিতে চলছে। এতে পাকিস্তানের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর নিজস্ব সুনাম ও গুরুত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে সেনাবাহিনী তাদের এই ‘কালো ভুল’কে এই বলে ‘সাদা’ করার চেষ্টা করে যে, “তারা যা কিছু করছে তা জনগণের স্বার্থেই করছে।”

অন্যদিকে, তিরহ উপত্যকার মানুষ শীত ও তুষারপাতের মধ্যে যে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা পাকিস্তানে গাজার মতো এক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নতুন নয় এবং বিভিন্ন মহল থেকে আগেও এমন কথা উঠেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সামরিক অভিযান কেবল নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এর নেপথ্যে অর্থনৈতিক ও খনিজ সম্পদের স্বার্থ কাজ করে। বলা হচ্ছে যে, তিরহ উপত্যকা খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দিয়ে জনগণের আড়ালে সেই সম্পদ উত্তোলনের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রাদেশিক সরকার, যারা এই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে, তারা স্বাভাবিকভাবেই এই অভিযানের বিরোধিতা করছে। ফলে পাকিস্তানের সচেতন মহলের কাছে সোহেল আফ্রিদিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা আসলে একটি স্পষ্ট বার্তা: “যে কেউ সামরিক নীতি, স্বার্থ, বাণিজ্য, খনিজ সম্পদ বা তাদের বয়ানের পথে দাঁড়াবে, তাকে আদালত, মামলা এবং শক্তির মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।”

পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর এই ভূমিকার বিষয়টি এখন আর কেবল তিরহ উপত্যকা বা একজন মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বিশ্বজুড়ে একটি জোরালো প্রশ্নে পরিণত হয়েছে যে—’পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারগুলো কি এতটাই ক্ষমতাহীন যে মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্যও তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে?’

তিরহ উপত্যকার বরফঢাকা পথে আটকে পড়া শিশু, গৃহহীন পরিবার এবং এখন একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা—সবই একই গল্পের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়। এমন এক গল্প… যেখানে সামরিক শক্তি সত্যের চেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ এবং মানবিক জীবনের চেয়ে সামরিক স্বার্থকে বেশি মূল্যবান মনে করা হয়।

Exit mobile version